

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন জলপাইগুড়িতে, যার শিকড় ছিল ফেনীর ফালগাজীতে। তিনি ব্যবসায়ী ইস্কান্দার মজুমদার ও তায়্যেবা মজুমদারের কন্যা। কৈশোর কাটে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং রাষ্ট্রপতি হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি দ্রুতই দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত হন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার সরকার গঠন করে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ চার দশকের। এই সময়ে তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার ক্ষমতায় থেকেও নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশ ঘটলেও দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও ওঠে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘটে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বিএনপি তাঁর মৃত্যুতে সাত দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করে।
তাঁর জীবনকে কয়েকটি অধ্যায়ে ভাগ করে দেখা যায়।
প্রথম অধ্যায় ছিল পারিবারিক জীবন ও রাজনৈতিক সূচনা। জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি প্রথমে ছিলেন গৃহিণী। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুতই জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
তৃতীয় অধ্যায় ছিল ক্ষমতায় থাকার সময়কাল। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্নীতির অভিযোগও প্রবল ছিল।
চতুর্থ অধ্যায় ছিল প্রতিরোধ ও কারাবাস। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে নানা মামলায় তাঁকে কারাবাস ভোগ করতে হয়।
পঞ্চম অধ্যায় ছিল অসুস্থতা ও রাজনৈতিক প্রান্তিকতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে পারেননি। তবুও তাঁর নাম ও উত্তরাধিকার বিএনপির রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ছিল।
তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনি ছিলেন একদিকে গণতন্ত্রের প্রতীক, অন্যদিকে বিতর্কিত ক্ষমতার খেলোয়াড়। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা হলো, গণতন্ত্রের পথে সংগ্রাম কখনো সহজ নয়।
তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকারপ্রধান, এবং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছে এক প্রবল ব্যক্তিত্বকে। তাঁর কর্মময় জীবন গণতন্ত্রের সংগ্রাম, সাফল্য ও বিতর্কের মিশ্রণ। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করবে একজন দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে, যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন।
মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫











