সমুদ্রের নীল তৃষ্ণা : ক্ষুদীরাম দাস

সমুদ্রের গর্জন যখন তীরের বালিয়াড়িতে আছড়ে পড়ে, তখন নোনা বাতাসের মধ্যদিয়ে এক ধরণের অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে। কক্সবাজারের এ অভিজাত হোটেলটির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলো আরিয়ান। তার সুঠাম দেহ আর তীক্ষè চেহারার দিকে যে কেউ একবার তাকালে দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হবে। কিন্তু আরিয়ানের মনের ভেতর এখন এক অজানা সঙ্কটে আচ্ছন্ন। সে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির খোঁজে যখন দিশেহারা, তখন তার জীবনে এসেছিলো এক অদ্ভুত সুযোগ। অথবা বলা ভালো, এক লোভনীয় ফাঁদ।

আরিয়ানের সাথে নীলার দেখা হয়েছিলো শহরের এক অভিজাত ক্লাবে। নীলা দেখতে এতোটাই সুন্দরী যে, তাকে প্রথম দেখায় অপার্থিব মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। নীলা বড়োলোক বাবার একমাত্র মেয়ে। অগাধ সম্পত্তি আর বিলাসবহুল জীবন তার দু’ পায়ের তলায়। নীলা আরিয়ানকে যখন প্রথম প্রস্তাব দিলো সমুদ্রের তীরে কয়েকদিন কাটিয়ে আসার জন্যে, আরিয়ান তখন ভাবতেও পারেনি এর পেছনে কী ধরণের পরিকল্পনা থাকতে পারে।

হোটেলে পৌঁছানোর পর আরিয়ান দেখলো নীলার আচরণ বেশ রহস্যময়। নীলা তাকে দামি পোশাক দিলো, পকেটে গুঁজে দিলো অনেক টাকার নোট। আরিয়ান কিছুটা ইতস্তত করে বলেছিলো, “এতো টাকা আমি কী করবো?”

নীলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি হাসলো। তারপর বললো, “এতোটা ভেবো না তো আরিয়ান! আমি যা’ দিচ্ছি তা’ শুধু তোমার সঙ্গ পাওয়ার জন্যে। এ শহরে আমার মতো মেয়েদের একাকীত্ব দূর করার জন্যে তোমাদের মতো সুন্দর যুবকদের খুব প্রয়োজন হয়।”

আরিয়ানের ভেতরটা তখন কেমন জানি করে উঠলো। সে কী তবে কেবলই একজন ভাড়াটে সঙ্গী? জৈবিক চাহিদা মেটানোর এক দামী খেলনা? প্রশ্নটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। কিন্তু টাকার অভাব আর নীলার রূপের মোহে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না। হোটেলের ডাইনিংয়ে বসে তারা যখন ডিনার করছিলো, তখন নীলা ডিশের ওপর কাঁটাচামচ দিয়ে আঁকিবুঁকি করছিলো। সে বলছিলো, “জানো আরিয়ান, এ যে দামী হোটেল, দামী গাড়িÑএগুলো আমার কাছে খুব তুচ্ছ। আমি আসলে চাই এমন কাউকে যে আমার সব হুকুম তামিল করবে। বিনিময়ে আমি তাকে প্রাচুর্যে ডুবিয়ে দেবো।”

আরিয়ান নীলার দিকে তাকাচ্ছিলো। নীলার চোখে এক ধরণের তীব্র অহঙ্কারের ছাপ স্পষ্ট। সে জানে তার টাকার অভাব নেই, তাই সে চাইলেই সৌন্দর্য কিনতে পারে। আরিয়ান ভাবলো, জগৎটা সত্যিই কতোটা বিচিত্র! এখানে আবেগ আর ভালোবাসার চেয়ে শারীরিক চাহিদা আর টাকার গুরুত্ব অনেক বেশি। রাতের বেলা সমুদ্রের গর্জন আরো তীব্র হলো। নীলা আরিয়ানকে নিজের কামরায় ডেকে পাঠালো। সেখানে পরিবেশটা ছিলো একদম ভিন্ন। আবছা আলো আর দামী পারফিউমের গন্ধে ঘরটা ম ম করছিলো। নীলা একটা সোফায় বসে ছিলো। আরিয়ান ঘরে ঢুকতেই সে মৃদু হাসলো।

“এসো আরিয়ান, এখানে বসো,” নীলা পাশে জায়গা করে দিলো। আরিয়ান বসলো। তার হৃৎপি- খুব দ্রুত নড়ছিলো। নীলা তার হাতটা ধরলো। নীলার হাত এতোটাই নরম যে আরিয়ানের মনে হলো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে।

নীলা ফিসফিস করে বললো, “তুমি কি ভীত? ভয় পাচ্ছো আমাকে?”

আরিয়ান উত্তর দিলো, “না, ভয় পাবো কেন? তবে সবকিছু এতো দ্রুত ঘটছে যে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।”

নীলা তখন তার খুব কাছে চলে এলো। তার নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া আরিয়ানের ঘাড়ে লাগছিলো। নীলা বললো, “আমি জানি তোমার টাকার সঙ্কট আছে। আমি জানি তোমার পরিবারের জন্যে তোমাকে অনেক লড়াই করতে হয়। আমি তোমার হয়ে সেই লড়াইটা লড়বো। বিনিময়ে তুমি শুধু আমাকে এ কয়েকটা দিন তোমার যৌবন আর সঙ্গ দেবে। রাজি?”

আরিয়ান চুপ করে রইলো। সে বুঝতে পারছিলো, সে এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে। এ ধনী ঘরের মেয়েরা সুন্দর যুবকদের কৌশলে এভাবেই নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্যে ব্যবহার করে। তারা জানে কোন ছলে কাকে বাগে আনতে হয়। পরদিন সকালে আরিয়ান একা বালিয়াড়িতে হাঁটতে গেলো। দেখলো তার মতো আরো দু’জন যুবক অন্য দু’জন ধনী মহিলার সাথে সমুদ্রের নীল জল উপভোগ করছে। সবার চোখেমুখে একই রকম ক্লান্তির ছাপ, যা’ টাকার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। আরিয়ান ভাবলো, সে কি এই চক্র থেকে বের হতে পারবে? নাকি সেও এই নোনা জলের গহ্বরে হারিয়ে যাবে?

হোটেলে ফিরে আসতেই সে দেখলো নীলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এক তাড়া টাকার নোট। সে হাসলো এবং আরিয়ানের পকেটে টাকাগুলো গুঁজতে গুঁজতে বললো, “কাল রাতটা বেশ ভালো ছিলো। আজ আমরা আরো দূরে কোথাও ঘুরতে যাবো। তৈরি হয়ে নাও।”

আরিয়ান কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু নীলা তার মুখে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলো। সে এক অদ্ভুত কা-জ্ঞানহীন মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। নীলা তাকে যেভাবে চালিত করছে, সে সেভাবেই চলছে। আরিয়ানের মনে হলো সে যেন এক পুতুল, যার সুতো নীলার আঙুলে বাঁধা।

বিকেলের দিকে তারা দু’জনে সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটছিলো। যতো রোদ নামছিলো, ততোই সমুদ্রের রঙ পরিবর্তন হচ্ছিলো। আরিয়ান দেখলো কাছেই একটা পুরনো গীর্জা। সে নীলাকে বললো, “চলো ওখান থেকে ঘুরে আসি।”

নীলা ভ্রু কুঁচকে বললো, “গীর্জা? ওসব ধর্মীয় জায়গায় গিয়ে কী হবে? তার চেয়ে চলো দামী কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে ড্রিঙ্ক করি।”

আরিয়ান বুঝলো, নীলার জীবনে আধ্যাত্মিকতা বা শুদ্ধ আবেগের কোনো স্থান নেই। তার জগত শুধু ভোগ আর বিলাসিতায় ঘেরা। সে কেবল নিজের জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর উপায় খোঁজে।

পরের কয়েকদিন এভাবেই চললো। দামী উপহার, দামী খাবার আর রাতের সেই গোপন সঙ্গ। আরিয়ান ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়লো এ জীবনে। কিন্তু তার মনের ভেতরের সেই মধ্যবিত্ত বিবেক মাঝে মাঝে জেগে উঠছিলো। সে ভাবছিলো, আজ এ সৌন্দর্য আছে বলে নীলা তাকে কাছে টেনেছে। কাল যখন বয়স বাড়বে, তখন কী হবে? তখন কি নীলা তাকে এভাবেই ছুড়ে ফেলে দেবে?

শেষের দিনটিতে নীলা তাকে চেক বইয়ের একটা পাতা দিলো। তাতে অঙ্কের ঘরটা ফাঁকা। নীলা বললো, “যতো খুশি লিখে নাও আরিয়ান। এটা তোমার গত কয়েকদিনের পারিশ্রমিক।”

আরিয়ান চেকটা হাতে নিয়ে দেখলো। তার চোখ ভিজে এলো। সে নিজেকে খুব ছোট মনে করতে লাগলো। সে কী এতোটাই সস্তা? সে কি কেবলই টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়া এক সুন্দর শরীর?

সে চেকটা ছিঁড়ে ফেললো। নীলা অবাক হয়ে তাকালো।

“কী হলো? টাকা কম হয়ে গেলো নাকি?” নীলা টিটকিরি দিয়ে হাসলো।

আরিয়ান শান্ত গলায় বললো, “টাকা তো অনেক দিয়েছো নীলা। কিন্তু আমার সম্মানটা তো আর ফিরে পাবো না। আমি হয়তো দরিদ্র, কিন্তু আমি পশু নই।”

নীলা উচ্চস্বরে হাসলো। “সম্মান? এই আধুনিক পৃথিবীতে সম্মানের চেয়ে টাকার দাম অনেক বেশি। তুমি যদি এটা না বুঝো, তবে তুমি বোকা। যাও, আবার সেই অভাবের জীবনে ফিরে যাও।”

আরিয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। সে দ্রুত হোটেল থেকে বেরিয়ে এলো। তার কানে তখনো সমুদ্রের গর্জন বাজছিলো। সে ভাবলো, কতো যুবক এভাবেই ধোঁকা খেয়ে বা টাকার লোভে নিজের জীবন নষ্ট করছে। এ ধনী ঘরের মেয়েদের কাছে প্রেম বলতে কিছু নেই, আছে শুধু লালসা মেটানোর কৌশল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান লক্ষ্য করলো শিশুরা খেলছে। তাদের সরল হাসির মধ্যদিয়ে সে যেন জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেলো। সে ঠিক করলো, সে লড়বো তার দারিদ্র্েযর সাথে নিজের পরিশ্রমে, কারো খেলনা হয়ে নয়। বিকেলের সূর্য তখন ডুবছে। আরিয়ান বাসে উঠলো। সে আর কখনো এ সমুদ্র তীরে ফিরে আসবে না। সে পেছনে ফেলে এলো এক বিভীষিকাময় বিলাসিতা আর এক কৃত্রিম ভালোবাসার গল্প। বাসের জানলা দিয়ে আসা বাতাসে সে মুক্তির স্বাদ পাচ্ছিলো। সে মনে মনে বললো, “আমি পারবো। আমি নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে বাঁচবো।”

শহরটা যখন ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে গেলো, আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে জানতো জীবনটা এতোটা সহজ নয়, কিন্তু অসম্মানের চেয়ে কঠোর পরিশ্রম অনেক ভালো। এ শিক্ষাটা সে এই কয়েকদিনে খুব ভালোভাবেই পেয়েছে। সমুদ্রের নীল তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে সে প্রায় নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলছিলো। এখন সে মুক্ত। সমুদ্রের নোনা জল হয়তো তার শরীরের ঘাম মুছে দিতে পারবে না, কিন্তু তার মনের কালিমা ধুয়ে ফেলার শক্তি তার নিজের ভেতরেই আছে।

গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু আরিয়ান জানে, এমন অনেক আরিয়ান এখনো ওই সব হোটেলের বদ্ধ ঘরে টাকার লোভে নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। এই অদ্ভুত অন্ধকার জগতের অবসান হওয়া প্রয়োজন। আরিয়ান সেই শপথ নিয়েই নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ালো। পথিমধ্যে সে দেখলো রোববার বিকেলের শান্ত পরিবেশ। গীর্জার ঘণ্টা বাজছে। সে একবার চোখ বুজলো। তার মনে হলো যীশু যেন তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে এক নতুন মানুষ হয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছালো।

এভাবেই এক সুন্দর যুবকের মোহভঙ্গ হলো আর এক ধনী তরুণীর লালসার গল্প সমাপ্ত হলো। জগতের এই নিষ্ঠুর সত্যগুলো হয়তো কখনো বদলাবে না, কিন্তু আরিয়ানের মতো কেউ কেউ হয়তো পথ খুঁজে পাবে আলোর দিকে।

প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like