

মিজানুর রহমান রানা :
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক এখনো পলাতক। অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। অথচ সরকারি-বেসরকারি দুই দফা পরীক্ষায় শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। পুলিশ বলছে, অভিযান চলছে। কিন্তু মামলা দায়েরের পরও আসামিকে ধরতে না পারা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

১. ভুক্তভোগী শিশুর সুরক্ষাই প্রথম অগ্রাধিকার
শিশুটির বয়স মাত্র ১১ বছর। তার বাবা নেই, মা সিলেটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। নানার বাড়িতে থেকে মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে সে যে ভয়াবহতার শিকার হলো, তার দায় রাষ্ট্র ও সমাজ এড়াতে পারে না। ইউএনও বেদবতী মিস্ত্রী শিশুটির বাড়িতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবার ও নগদ অর্থ দিয়েছেন, মানসিক কাউন্সেলিংয়ের আশ্বাস দিয়েছেন। এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও মানসিক পুনর্বাসন রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। শিশু আইন ২০১৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আলোকে তার সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
. বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে
পুলিশ সুপার বলেছেন, অভিযুক্ত পরিবার নিয়ে পালিয়েছে। রাত তিনটা পর্যন্ত অভিযান চলেছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়— মামলার আগেই আসামি কীভাবে পালানোর সুযোগ পেল? ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে আসামি প্রযুক্তিগত সুবিধা নিচ্ছে, যোগাযোগ রাখছে। দ্রুত গ্রেপ্তার না হলে আলামত নষ্ট, সাক্ষীকে প্রভাবিত করা ও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর ঝুঁকি বাড়ে। ইতিমধ্যে শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা নিশ্চিত করা চিকিৎসক সাইমা আক্তারকে হুমকি, সাইবার বুলিং ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একজন চিকিৎসক সত্য প্রকাশ করায় যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে ভবিষ্যতে অন্যরা মুখ খুলবে কেন? পুলিশকে শুধু মূল আসামি নয়, চিকিৎসককে হুমকিদাতাদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা জরুরি
অভিযুক্ত শিক্ষক নিজেই চার বছর আগে মহিলা কওমি মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। আবাসিক বা অনাবাসিক যেকোনো প্রতিষ্ঠানে শিশুরা যখন অভিভাবকহীন অবস্থায় থাকে, তখন তাদের নিরাপত্তার দায় প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর বর্তায়। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে কারও দায় কমে না। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই সব কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ বাক্স, নিয়মিত মনিটরিং এবং নারী শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও শিশু সুরক্ষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার।
৪. ‘বিচার শুর আগেই বিচার’ বন্ধ করতে হবে
আসামি ভিডিওতে বলেছেন, ‘অপরাধী খুঁজে বের করার আগেই যদি আমাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেন, তাহলে আসল অপরাধী পার পেয়ে যাবে।’ আইনের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত মাত্রই অপরাধী নন— এটা ঠিক। কিন্তু দুই দফা মেডিকেল পরীক্ষা, ভুক্তভোগীর জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য থাকার পরও পলাতক থেকে ভিডিও বার্তা দেওয়া তদন্তকে প্রভাবিত করার শামিল। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার শুরু হয়ে গেলে প্রকৃত তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। তাই পুলিশকে স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দিতে হবে। আদালতই বলবেন কে দোষী, কে নির্দোষ।
আমাদের দাবি
১. অভিযুক্ত শিক্ষককে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করা হোক।
২. চিকিৎসক সাইমা আক্তার ও তাঁর পরিবারকে পুলিশি সুরক্ষা দিয়ে হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও দণ্ডবিধিতে মামলা করা হোক।
৩. শিশুটির চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিক।
৪. দেশের সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন ও বাধ্যতামূলক মনিটরিং চালু করা হোক।
একটি ১১ বছরের শিশুর জীবন এভাবে নষ্ট হওয়ার পর রাষ্ট্র যদি দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ‘আইনের শাসন’ কথাটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। মদনের এই ঘটনা যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে— বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার শুরুটা এখান থেকেই হোক।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ খ্রি.















