সম্পাদকীয়: সমালোচনা কি কখনো সন্ত্রাস হতে পারে?

সাংবাদিক আনিস আলমগীরের উত্থাপিত প্রশ্ন—“সমালোচনা কি কখনো সন্ত্রাস হতে পারে?”—আমাদের সমাজ, গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের জন্য এক গভীর চিন্তার বিষয়। সমালোচনা মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় অপরিহার্য। এটি ভুল ধরিয়ে দেয়, বিকল্প পথ দেখায়, এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু যখন সমালোচনা সীমা অতিক্রম করে, উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে ভয় সৃষ্টি করা, চরিত্রহনন করা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দেওয়া—তখনই তা সন্ত্রাসের রূপ নিতে পারে।

সমালোচনার প্রকৃতি
– গঠনমূলক সমালোচনা: ভুল ধরিয়ে দিয়ে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।
– ধ্বংসাত্মক সমালোচনা: উদ্দেশ্য হয় আঘাত করা, হেয় করা বা ভয় দেখানো।
– সাংবাদিকতার ভূমিকা: গণমাধ্যমের সমালোচনা সমাজকে সচেতন করে, তবে দায়িত্বশীলতা হারালে তা বিভ্রান্তি ছড়ায়।

সমালোচনা বনাম সন্ত্রাস
সন্ত্রাস মানে ভয় সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যদি সমালোচনা এমনভাবে করা হয় যে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, লেখক কলম ধরতে দ্বিধা করে, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান সত্য প্রকাশে পিছিয়ে যায়—তাহলে সেই সমালোচনা কার্যত সন্ত্রাসে রূপান্তরিত হয়।

উদাহরণস্বরূপ:
– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত ট্রলিং ও হুমকি।
– সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার।
– ভিন্নমতকে চেপে ধরতে সমালোচনার নামে ভয় দেখানো।

আনিস আলমগীরের দৃষ্টিভঙ্গি
আনিস আলমগীর বারবার বলেছেন, সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ। তবে তিনি সতর্ক করেছেন—যখন সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করে। তাঁর মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা। দায়িত্বহীন সমালোচনা সমাজে বিভাজন ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যা সন্ত্রাসেরই এক রূপ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
– যুক্তরাষ্ট্রে “cancel culture” নিয়ে বিতর্ক—কেউ কেউ মনে করেন এটি সমালোচনার শক্তি, আবার অনেকে বলেন এটি ভয় সৃষ্টির হাতিয়ার।
– দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন অপপ্রচার প্রমাণ করে, সমালোচনা কখনো কখনো সন্ত্রাসে রূপ নেয়।
– ইউরোপে রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে হামলা—এখানে সমালোচনার প্রতিক্রিয়া সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে।

সমাধানের পথ
নৈতিক সাংবাদিকতা: তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।
আইন ও নীতি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, তবে ঘৃণাত্মক প্রচার নিয়ন্ত্রণ।
সামাজিক সচেতনতা: পাঠক ও দর্শককে দায়িত্বশীল হতে হবে, যেন তারা বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
ডিজিটাল শৃঙ্খলা: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ট্রলিং ও অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা।

সমালোচনা কখনোই নিছক সন্ত্রাস নয়। তবে যখন তা ভয় সৃষ্টি করে, মতপ্রকাশকে স্তব্ধ করে, এবং সমাজে আতঙ্ক ছড়ায়—তখনই তা সন্ত্রাসে রূপ নেয়। আনিস আলমগীরের প্রশ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। সমালোচনা যদি সত্য, যুক্তি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। কিন্তু দায়িত্বহীন সমালোচনা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, আর সেই দুর্বলতাই সন্ত্রাসের জন্ম দেয়।

সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়েছিল মূলত ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করার কারণে। অভিযোগ ছিল তিনি টকশো ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়তা করছেন—যা সরকার “সন্ত্রাসী কার্যকলাপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল।

ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট
– তারিখ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকা।
– অভিযোগ: বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে মামলা।
– কারণ: টকশো ও সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য, যেখানে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ও ড. ইউনুসের নীতির সমালোচনা করেছিলেন।
– অতিরিক্ত অভিযোগ: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো ও তাদের পুনর্বাসনে সহায়তার ষড়যন্ত্র।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
– Committee to Protect Journalists (CPJ): অভিযোগগুলোকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছে এবং অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছে।
– Amnesty International: বলেছে, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের একটি উদাহরণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির লঙ্ঘন।

আদালতে আনিস আলমগীরের বক্তব্য
আদালতে তিনি বলেন: “আমি একজন সাংবাদিক। আমি ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করি। আমার কারও সঙ্গে কোনো যোগসূত্র নেই। যদি ড. ইউনুস চান, তিনি পুরো বাংলাদেশকে কারাগারে পরিণত করতে পারেন।”

এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর সমালোচনা ছিল সাংবাদিকতার দায়িত্বের অংশ, কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়।

বিশ্লেষণ
– সরকারের অবস্থান: সমালোচনাকে “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা” হিসেবে ব্যাখ্যা করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় মামলা।
– সমালোচকদের মত: এটি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের কৌশল, যাতে সাংবাদিকরা ভয় পেয়ে নীরব থাকে।
– প্রভাব: বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, অনেক সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণে চলে যান।

আনিস আলমগীরকে তিন মাস আটক রাখার মূল কারণ ছিল তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা, যা অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিকভাবে হুমকি হিসেবে দেখেছিল। আন্তর্জাতিক মহল একে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সমালোচনা যদি ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিকর করে তোলে, তখন তা “সন্ত্রাস” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে—যা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

 

প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy