

ছবি : প্রতীকী
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, জিল্লুর রহমান
তাড়াশ, ১ মে ২০২৬:

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের মাগুরা বিনোদ গ্রামে ২৫ হাজার টাকার কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় জান্নাতি বেগম নামে এক গৃহবধূকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সাংসারিক অভাব অনটন মেটাতে টিএমএস-এর তাড়াশ শাখা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—‘কিস্তি নেওয়া কি এখন বিষ খাওয়ার সমান?’
*ঘটনার বিবরণ: অভাব থেকে আটক
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা বিনোদ গ্রামের বাসিন্দা জান্নাতি বেগম প্রায় দেড় বছর আগে সংসারের টানাপোড়েন মেটাতে টিএমএস তাড়াশ শাখা থেকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষুদ্রঋণ নেন। সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের শর্ত ছিল। প্রথম দিকে নিয়মিত কিস্তি দিলেও গত কয়েক মাস ধরে অসুস্থতা ও স্বামীর কর্মহীনতার কারণে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। ফলে ২৫ হাজার টাকা বকেয়া পড়ে যায়।
টিএমএস তাড়াশ শাখার ম্যানেজার জানান, “আমরা বারবার তাগাদা দিয়েছি। মাঠকর্মীরা বাসায় গিয়েছেন। কোনো সাড়া না পেয়ে নিয়ম অনুযায়ী আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি।” এরপর শাখা কর্তৃপক্ষ তাড়াশ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাড়াশ থানা পুলিশ মাগুরা বিনোদ গ্রামে অভিযান চালিয়ে জান্নাতি বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “টিএমএস কর্তৃপক্ষের দায়ের করা প্রতারণার অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।”
পরিবারের দাবি: ‘ইচ্ছা করে কেউ খেলাপি হয় না’
জান্নাতির স্বামী রফিকুল ইসলাম জানান, “আমি দিনমজুর। ৫ মাস ধরে কোমরের ব্যথায় কাজ করতে পারি না। ঘরে দুইটা ছোট বাচ্চা। জান্নাতি অন্যের বাড়িতে কাজ করে কিস্তি দিত। এখন সেও অসুস্থ। পেটে ভাত নাই, কিস্তি দিব কেমনে? ম্যানেজার স্যাররে বলছিলাম কিছুদিন সময় দেন। উনি মামলা কইরা দিলেন।”
তিনি আরও বলেন, “৫০ হাজারের মধ্যে আমরা ২৫ হাজার টাকার বেশি শোধ করছি। সুদসহ আরও কত নিবে জানি না। এখন পুলিশ দিয়ে ধরায়া নিল। আমরা কি চোর-ডাকাত?”
এলাকাবাসীর ক্ষোভ: ‘এনজিও এখন আতঙ্কের নাম’
ঘটনার পর মাগুরা বিনোদ গ্রামে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানান, টিএমএসসহ বিভিন্ন এনজিওর কিস্তির চাপে এলাকার অনেক পরিবারই এখন দিশেহারা।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, “কিস্তি মানুষ নেয় বিপদে পড়ে, একটু সচ্ছল হওয়ার আশায়। কিন্তু যেভাবে পুলিশ দিয়ে হয়রানি শুরু হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে কিস্তি নেওয়া মানে বিষ খাওয়া। অভাবীদের জন্য এ কেমন বিচার?”
মাগুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন, “আমরা চাই এনজিওগুলো মানবিক হোক। ২৫ হাজার টাকার জন্য একজন মাকে এভাবে থানা-পুলিশ করতে হবে? গ্রাম্য সালিশে বসে সময় দেওয়া যেত। এতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।”
টিএমএস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে টিএমএস তাড়াশ শাখার ম্যানেজার মো. কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন – PKSF-এর নিয়মে চলে। একজন সদস্য ৩ মাসের বেশি খেলাপি থাকলে এবং মাঠপর্যায়ে সমাধান না হলে আমরা আইনি নোটিশ দিতে বাধ্য হই। জান্নাতি বেগমকে আমরা ৪ বার নোটিশ দিয়েছি। তিনি কোনো সাড়া দেননি। তাই বাধ্য হয়ে মামলা করেছি। এটা কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চাই না কেউ হয়রানির শিকার হোক। উনি যদি থানায় এসে সমঝোতা করেন, কিস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে আমরা মামলা তুলে নেব।”
আইন কী বলছে? ক্ষুদ্রঋণে গ্রেফতার কতটা যৌক্তিক
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, “মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬ অনুযায়ী এনজিওগুলো সরাসরি ফৌজদারি মামলা করতে পারে না। চেক ডিজঅনার হলে এনআই অ্যাক্ট-এ মামলা হয়। কিন্তু শুধু কিস্তি বকেয়ার জন্য পুলিশ দিয়ে আটক করাটা প্রশ্নবিদ্ধ। উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণের টাকা আদায়ের জন্য দেওয়ানি মামলা করতে হবে। ফৌজদারি মামলা দিয়ে হয়রানি করা যাবে না।”
মানবাধিকার কর্মী নাসরিন সুলতানা বলেন, “দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়। ২৫ হাজার টাকার জন্য একজন নারীকে এভাবে গ্রেফতার সামাজিক সুরক্ষার ধারণার পরিপন্থী। এনজিওগুলোর উচিত ‘দায়মুক্তি ও পুনঃতফসিল’ নীতিতে যাওয়া।”
তাড়াশে ক্ষুদ্রঋণের চিত্র: স্বস্তি না অস্বস্তি?
তাড়াশ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্যমতে, উপজেলায় ১৭টির বেশি এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় ৪০ হাজার পরিবার কোনো না কোনোভাবে এনজিওর সাথে যুক্ত। করোনা-পরবর্তী সময়ে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অনেক পরিবারই কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে।
স্থানীয় উন্নয়নকর্মী রাশেদা খাতুন জানান, “ঋণের সুদের হার, সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ এবং আয়বর্ধক কাজের অভাব—এই তিন কারণে গ্রামীণ নারীরা বেশি বিপদে পড়ছেন। ঋণ দেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই আর আদায়ের সময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—দুটোই দরকার।”
সমাধান কোন পথে?
জান্নাতি বেগম বর্তমানে তাড়াশ থানা হেফাজতে আছেন। পুলিশ জানিয়েছে, উভয় পক্ষ সমঝোতা করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণের বাস্তবতা। একদিকে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার, অন্যদিকে পরিশোধের চাপে দিশেহারা প্রান্তিক মানুষ।
সচেতন মহলের দাবি, সরকার, এমআরএ এবং এনজিওগুলোকে বসে একটা ‘মানবিক আদায় নীতিমালা’ করা জরুরি। যাতে ‘কিস্তি’ কারও জন্য ‘বিষ’ হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ দিনশেষে, অভাবী মানুষগুলোই দেশের মূল শক্তি। তাদের আস্থা হারালে উন্নয়নের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যাবে।
প্রকাশিত : শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬ খ্রি.
















