

মিজানুর রহমান রানা :
এক.
দিনের আলো যখন নিভে যায়, তখন রাতের অন্ধকারে তারাগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে। আর কিছু কিছু রাতের নিশাচর পাখি বেরিয়ে পড়ে খাদ্যের সন্ধানে। আজ শুধু রাতের অন্ধকারে পাখিরাই নয়, একজন অদ্ভুত মানুষও বাড়িটার তৃতীয় তলার বেলকনি থেকে চারদিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কামরায় প্রবেশ করে, তারপর তার কালো লম্বা কোট আর মাথায় হ্যাট পরে ধীরে ধীরে দরজা লক করে বাইরে বেরিয়ে পড়ে।

রাস্তায় তীব্র যানজট, অনন্যা ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ে আছে মালিবাগের কাছাকাছি একটা রাস্তায়। এ সময় তার ফোন বেজে উঠে, সে ব্যাগ থেকে ফোনটি বের করে দেখলো ইমতিয়াজ এর ফোন। রিসিভ করতেই ইমতিয়াজ বললো, ‘কোথায় তুমি, আমরা তো অফিসে বসে আছি।’
‘একটু অপেক্ষা করো, আমি আসছি।’ উত্তর দিলো অনন্যা। কিন্তু সে দেখলো তার গাড়ির সামনে দিয়ে কালো লম্বা কোট আর মাথায় হ্যাট পরে একটা অদ্ভুত লোক রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে দেখে অনন্যার কেমন যেনো মনে হলো। এমন লোক বাংলাদেশেও আসে? এ ধরনের লোকজন বেশিরভাগ আমেরিকার মিশিগান অঞ্চলেই দেখা যায়।
মালিবাগে সিআইডির হেডকোয়াটারের ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা । স্বস্তিকর ও আরামদায়ক।
অফিসে প্রবেশ করতেই ইরফান বললো, ‘অনন্যা তোমার জন্য বসে আছি আমরা, বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
অনন্যা দেখলো ইরফানকে ঘিরে তুষার আহমেদ, ইমতিয়াজ, রাশমিকা বসে আছে। সেও তাদের পাশে বসলো। এ সময় অফিস পিয়ন আলী আহসান এসে সবার সামনে গরম চা রাখলো। সবাই গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছে কিন্তু ইরফানের খেয়াল টিভির দিকে। ‘গতকাল রাতে একটি মেয়ে খুন হয়েছে, মেয়েটিকে বিভৎসভাবে খুন করা হয়েছে, এ পর্যন্ত খুনীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাস্থলে একটি চিঠি পেয়েছে, তবে সেই চিঠিটা বাংলায় লেখা না, চিঠিটা সম্পূর্ণ চায়না ভাষায় লেখা…।’
ইরফান বললো, ‘বিষয়টা খুবই ইন্টারেস্টিং বলে মনে হচ্ছে।’
সবাই ইরফানের দিকেই তাকিয়ে আছে। এ সময় রাশমিকা বললো, ‘স্যার, আমি গত ক’দিনের পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করেছি, আসলে এটা সিরিয়াল কিলিংয়ের বিষয় হতে পারে, গত এক সপ্তাহে সাতটি খুন হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। তবে প্রতিটি খুনের দৃশ্য আলাদা কিন্তু একটা বিষয় মিল থাকে।’
‘কী সেটা?’ প্রশ্ন করলো ইমতিয়াজ।
‘চায়না ভাষায় কিছু লেখা।’ উত্তর দিলো রাশমিকা।
‘তাই নাকি? অনন্যা অবাক হলো, তাহলে খুনি কি চায়না থেকে আমদানি হয়েছে নাকি?’
ইমতিয়াজ হাসলো, এ সময় ইরফান বললো, ‘এটা হাসির বিষয় নয়, ভাবার বিষয়। খুনী আমাদেরকে জন্য কি সূত্র রেখে যাচ্ছে তা চায়না ভাষা থেকে বাংলায় ট্রান্সলেট করলেই বুঝা যাবে।’
‘ঠিক স্যার। একদম ঠিক।’ রাশমিকা উত্তর দিলো।
ইরফান ভাবছে। এ সময় রাশমিকা পত্রিকায় প্রকাশিত খুনের কাহিনীগুলো একের পর এক মেলে ধরে ইরফানের সামনে। ইরফান এগুলো দেখে হতভম্ভ হয়ে যায়।
ঠিক সেই সময়েই ফোন করে মি. আজিম। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘ইরফান এই সিরিয়াল কিলারকে অবশ্যই তোমাদেরকে থামিয়ে দিতে হবে। তা-না হলে রাষ্ট্র ও জনগণের উপর এক ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসবে।’
ইরফান সবার দিকে তাকায়, তারপর মি. আজিমকে উত্তর দেয়, ‘এই খুনীকে আমরা শীঘ্রই ধরবো এবং তাকে গ্রেফতার করে দেশের কিশোরীদেরকে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবো।’
ভোর ৫টা। রেললাইনের পাশে পুলিশের হলুদ টেপ। ইরফান হাঁটু গেড়ে বসে। তার সামনে ক্রাইম সিন।
তুষার বললো, ‘স্যার, এটা নিয়ে তিন নম্বর কেস। মেয়েটার শরীরে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নাই।’
ইরফান ধীরে ধীরে উত্তর দিলো, ‘খুনি কিছু রেখে যায়নি, তুষার অথবা এমন কিছু রেখে গেছে যা আমরা এখনো দেখতেই পাচ্ছি না।’
অনন্যা ও রাশমিকা দেখলো কিশোরী মেয়েটার বয়স ১৪-১৫ হবে। তার শরীরটার নিচের অংশটা উদোম করা। স্পর্শকাতর অংশগুলো কেটে নেওয়া হয়েছে, রক্ত এখনও গড়িয়ে পড়ছে। সে ক্যামেরা দিয়ে কয়েকটি অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলে নিলো। মেয়েটার চোখগুলো খোলা, ভয়ার্ত, যেনো মৃত্যুর আগে হিংস্র দানবকে দেখেছে, সেভাবেই তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে।
অফিসে এসে ইরফান ভিকটিমলজি দিয়ে শুরু করে। তিনটা কেসের মধ্যে কমন ফ্যাক্টর খোঁজে- সময়, লোকেশন, ভিকটিমের শেষ ২৪ ঘণ্টা কোথায় ছিলো, কার সাথে ছিলো এসব বিষয় জানার চেষ্টা করে।
মেয়েটার নাম আদুরী, তার বাবা-মা গুলশানে থাকে, তাদের একটি মাত্রই মেয়ে, বড় ছেলে জার্মানীতে থাকে। মেয়েটা সানফ্লাওয়ার স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তো।
পরদিন সেই স্কুলে পুরো টীম নিয়ে যায় ইরফান। আদুরীর বান্ধবীদের খুঁজে বের করে, তাদের কাছে জানতে পারে গতকাল ছুটির পর গেটের সামনে একজন কালো লম্বা কোট পরা লোকের সাথে আদুরীকে কথা বলতে দেখেছে তারা। এরপরের আর কিছুই জানে না।
এ সময় ইরফানের দূরে দাঁড়ানো একটি মেয়ের দিকে চোখ পড়ে, মেয়েটি যথেষ্ট সুন্দরী। মনে হয় কলেজ ছাত্রী হবে। সে তার কাছে গেলো, তারপর প্রশ্ন করলো, ‘কী নাম তোমার?’
‘আমার নাম সম্পা? কিন্তু কেন?’ মেয়েটি জানতে চাইলো।
‘তুমি কোন কলেজে পড়ো?’
‘ঢাকা ভার্সিটিতে।’ মেয়েটির মুখে রহস্যময় হাসি।
এ সময় রাশমিকা ও অনন্যা কাছে এলো, পেছনে ইমতিয়াজ। সে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছো?’
‘আসলে আমি বাবার জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি গাড়ি নিয়ে আসবেন, আর আমাকে ভার্সিটিতে পৌছে দেবেন।’
কিছুক্ষণের মধ্যে কালো লম্বা একটি মার্সিডিস এলো, দরজা খুলতেই মেয়েটি বললো, ‘ওই যে আমার বাবা চলে এসেছেন। যাই, ঠিক আছে?’
এ সময় গাড়ি থেকে তার বাবা নামলেন, ইরফানের চোখ তার দিকে পড়তেই সে ইমতিয়াজকে ফিসফিস করে বললো, ‘এতো আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া আলী নেওয়াজ।’
‘তাহলে এই কেসগুলোর সাথে কি আলী নেওয়াজের কোনো সম্পর্ক আছে?’ ইমতিয়াজ প্রশ্ন করলো।
সম্ভবত কথাটা আলী নেওয়াজ শুনতে পেয়েছেন, তিনি কাছে এসে ইরফানকে বললেন, ‘মি. ইরফান কেমন আছো?’
‘আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি, তবে আপনি সাবধানে থাকবেন, সময় মতো হয়তো এ খুনগুলোর বিষয়ে আপনাকে ডাকতে পারি, তদন্তের জন্য।’
মি. আলী নেওয়াজ হাসলেন, তারপর বললেন, ‘আমার হাত অনেক মানুষের রক্তে রঞ্জিত, তবে কোনো কিশোরী বা শিশুর ক্ষতি আমি কখনোই করি না, বুঝতে পারছেন মি. ইরফান?’ (চলবে)
প্রকাশিত : শনি বার, ২৩ মে ২০২৬ খ্রি.
















