

মিজানুর রহমান রানা :
দুই.
বিশাল বাড়ির বৈঠকখানায় আলী নেওয়াজ বসে আছে। সামনে একটা ডায়রি, সে ডায়রির পাতায় লিখলো ‘H’ কে থামাতে হবে। আমার সম্পাকে ছোঁয়ার আগে।’

এ সময় সম্পা আসলো। তাকে দেখেই আলী নেওয়াজ বললো, ‘কিরে মা কলেজে যাবার সময় হয়েছে?’
‘জি¦ বাবা, আমি যাচ্ছি, মাকে বলো আমি বাইরে নাশতা খেয়ে নেবো।’
‘বাইরে খাদ্য সব সময় খেয়ো না মা, ওতে প্রচুর তেল মশলা থাকে, তোমার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে।’
হাসলো সম্পা। সে বললো, ‘বাবা, তুমি রাগ করো না। আসলে আমার সময় হয় না বাসায় খাবার। সেই কারণেই তো..।
‘ঠিক আছে মা, তুমি এখন বড় হয়েছো, নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারো। সমস্যা নেই। যাও, ভালোমতো পড়াশোনা করবে কিন্তু।’
সম্পা বাবার কাছে এলো, তারপর বাবার কপালে চুমু দিয়ে বললো, ‘তোমার তো একটাই মেয়ে, সে যদি জিনিয়াস হতে না পারে, তাহলে কি হবে?’
হাসলো মি. আলী নেওয়াজ। সে জানে তার মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। সব ক্লাসেই ভালো রেজাল্ট করে, এবারও ব্যাতিক্রম হবে না।
বাড়ির বাইরে নামতেই সম্পা দেখতে পেলো কালো কোট পরে এটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে ক্রমে ক্রমে সম্পার কাছে এলো, তারপর বললো, ‘কোথায় যাবে, চলো তোমাকে আমার গাড়িতে করে পৌছে দিয়ে আসি।’
সম্পা বললো, ‘না, আমাদের গাড়ি আছে ওই যে আমাদের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসছে। ধন্যবাদ আপনাকে।’
মনে হলো লোকটা বেজার হয়েছে, এ সময় সম্পার ড্রাইভার হেকমত গাড়ি নিয়ে তার সামনে এসে থামলো, সম্পা লোকটির দিকে তাকাতে তাকাতে গাড়িতে উঠে বসলো।
কলেজে গিয়ে নামতেই সে আবার লোকটিকে কলেজের গেইটে দেখতে পেলো, লোকটি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সম্পা প্রশ্ন করলো, ‘আপনি আমার আগে এতো দ্রæত এখানে চলে এলেন কীভাবে?’
‘আমি বাতাসে ভর করে চলি।’ লোকটা অদ্ভুত ভাবে হাসলো।
এ সময় ড্রাইভার হেকমত এগিয়ে এলো, তারপর বললো, ‘সম্পা মা মনি আপনি কলেজে যান, আমি লোকটার সাথে কথা বলছি।’
সম্পা চলে গেলো কলেজে, কিন্তু হেকমত পেছন ফিরে তাকাতেই লোকটিকে আর দেখতে পেলো না, চারদিকে অনেক খুঁজলো কিন্তু লোকটি যেনো হাওয়া হয়ে গেছে।
১২টা। তিনতলা। কালো ডাস্টার কোট। দরজার লকটা খুলতে সময় লাগলো ৩ সেকেন্ড। ভেতরে নিশিতা- ঘুমে, নাকি মৃত? ভাবতে ভাবতে লোকটা ভেতরে প্রবেশ করলো। মাথায় গাম্বলার হ্যাট। হাতে একটা কালো লাঠি। সে ধীরে ধীরে দরজা খুললো, তারপর ভেতরে প্রবেশ করলো।
হঠাৎ করেই লাইট জ¦ালালো সে। ঘরে মৃদু আলো জ্বলে উঠলো। আলো জ্বালতেই নিশিতা জেগে উঠলো, তারপর বললো, ‘হিমু, তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’
লাঠিটা একপাশে রাখলো হিমু। তারপর মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে নিশিতাকে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি খেয়েছো?’
‘খেয়েছি।’ উত্তর দিলো নিশিতা। তারপর বললো, ‘টিভিতে আজকে দেখলাম অল্প বয়সী একটা মেয়েকে ভীষণ নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে, গত ক’দিনের পত্রিকায়ও দেখলাম এ পর্যন্ত সাতটি কিশোরী মেয়েকে একই কায়দায় জঘন্যভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে, তারপর খুনী খুন শেষে চায়না ভাষায় চিরকুট রেখে গেছে।’
হিমু কিছুই না বলে ডাইনিংয়ে গিয়ে বসলো, তারপর খেতে খেতে বললো, ‘নিশ্চয়ই এটা কোনো পৈশাচিক কাণ্ড, পিশাচ ছাড়া কি কেউ এভাবে নিষ্পাপ কিশোরীদেরকে জঘন্যভাবে মারতে পারে?’
নিশিতা হিমুর পাশে বসলো, তারপর বললো, ‘এ ধরনের কাজ কে করতে পারে?’
‘গোয়েন্দারা খুনীকে খুঁজছে, শীঘ্রই হয়তো খুনীর সন্ধান পেয়ে যাবে তারা।’
‘আমাদেরও একটা মেয়ে আছে, তাই ভয়ে থাকি। যাক বাবা খুনীটার সন্ধান পেলেই বাঁচি, রুমি স্কুলে গেলে ফেরা না পর্যন্ত টেনশনে থাকি।’
হিমুর সাথে নিশিতাও খাচ্ছে, এ সময় টিভিতে খুনের খবর দেখে হিমুর হাত কাঁপে। সে ফল কাটার ছুরিটা একটু জোরে ধরে। তার মুখচ্ছবি কঠিন হয়ে উঠে। নিশিতা তার দিকে তাকায়, সে ভাবতে থাকে- কেন?
সকাল দশটা। স্কুলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সজল। সে চারদিকে নজর রাখছে। এ সময় রুমিকে আসতে দেখলো সে। সজলকে দেখে রুমি এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারলো লোকটা গোয়েন্দা বিভাগের লোক হতে পারে। চারদিকে যা অবস্থা, সরকার সব স্কুলে স্পাই লাগিয়েছে, যাতে সিরিয়াল কিলারটাকে ধরা যায়। সে এ কথা ভাবতে ভাবতে স্কুলে প্রবেশ করলো।
সজল এ সময় রবিনকে দেখতে পেলো, এদিকেই আসছে। সজলের কাছাকাছি হতেই প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছে?’
‘এই তো স্কুলে আমার মামাতো বোন স্বপ্না আছে, সে স্কুলে আসছে কিনা তা দেখতে এসেছি।’
‘গুড। মেয়েদের দিকে খেয়াল রাখা ভালো, আর শোনো যে কোনো সময় কিছু জানতে পারলে আমাকে কল দিবে, বুঝতে পারছো?’
‘অবশ্যই।’ মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলো সজল।
তারপর সজল দেখতে পেলো একটু সামনে গিয়েই রবিন স্বপ্নার সাথে কথা বলছে। রবিনের কথা স্পষ্ট শুনতে পায় না সজল শুধু উভয়ের ঠোঁট নড়ছে এটাই দেখতে পেলো সে?
সম্পার সামনেই ঘটলো ঘটনাটা। হঠাৎ করেই ভার্সিটির সামনে একটা মেয়ের কানের দুল টান মেরে নিয়ে চলে যাচ্ছিলো একটা ছিনতাইকারী, কোথা থেকে উদয় হলো সেই কালো ডাস্টার কোট, মাথায় গাম্বলার হ্যাটওয়ালা লোকটা। ছিনতাইকারী পেছনে ছুটে হাতের কালো লাঠিটা দিয়ে ছিনতাইকারীর ঘাড়ে মারলো একটা, সাথে সাথেই পড়ে গিয়ে আবার উঠে কানের দুলটা ফেলে পালিয়ে বাঁচলো ছেলেটা।
দুলটা কুড়িয়ে নিয়ে মেয়েটার সামনে এসে লোকটা তার হাতে দিয়ে বললো, ‘চলে যাও, ভয় নেই।’
সম্পা অবাক। চোখের পলক না ফেলতেই সে দেখলো লোকটা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। প্রশ্ন করলো, ‘আঙ্কেল গতকাল আপনাকে এখানেই দেখেছিলাম, আজকেও এসেছেন? ভার্সিটিতে কেউ কি আছে আপনার? আপনি তো খুব সাহসী মানুষ।’
লোকটা এক পলক সম্পার দিকে তাকালো, তারপর রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো, ‘তুমি কি বাসায় যেতে পারবে? নাকি আমি তোমাকে পৌঁছে দিবো?’
‘না, আঙ্কেল আমার জন্য গাড়ি আসবে। টেনশনের কিছুই নেই তবে আপনাকে ধন্যবাদ মেয়েটাকে সহযোগিতা করার জন্য, মেয়েটির আমার ক্লাসমেট।’
লোকটা সম্পার আরো নিকটবর্তী হলো, তারপর বললো, ‘আমার নাম হিমু। তোমার মতো আমারও একটা মেয়ে আছে, শোনো মা- সাহস নিয়ে চলতে হবে, শক্তি ও সাহস তোমাকে জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে সহযোগিতা করবে। কখনোই ভয় পাবে না। ভয়কে জয় করতে শিখবে, কেমন?’
সম্পা পেছনে তাকালো। হিমু নেই। কিন্তু তার নোটখাতার ভেতর একটা চিরকুট। চায়না ভাষায় দুটো শব্দ: “下一个”。
খুব কাছেই ছিলো ইরফানের টীম। তারা একটা কালো গাড়ি থেকে দূরবীন দিয়ে সম্পার খাতাটায় লেখাটা দেখলো।
রাশমিকা সেটা দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। ‘স্যার… এর মানে ‘পরের জন’।’
ইরফান ফোন হাতে নিলো। স্ক্রিনে মিসড কল: ‘সম্পা’।
দূরে, আলী নেওয়াজের মার্সিডিসের কাঁচ নামলো। ভেতরে হিমু বসে, হাতে গ্যাম্বলার হ্যাট। সে সম্পার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো, ‘সময় হয়ে গেছে, মা।’ (চলবে)
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব
প্রকাশিত : শনি বার, ২৩ মে ২০২৬ খ্রি.
















