

মিজানুর রহমান রানা :
চাঁদপুরের তরুণ প্রজন্মের পড়াশোনার গতিপথ বদলে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে সরকারি চাকরি আর গতানুগতিক ডিগ্রিই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে এখন চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ, মতলব, কচুয়া, ফরিদগঞ্জ ও শাহরাস্তির তরুণরা ঝুঁকছেন তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক স্কিল, গ্রাফিক্স ডিজাইন, অ্যানিমেশন ও আর্ট ডিজাইনের দিকে। জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC), শহর সমাজসেবা দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র এবং সরকারের ‘শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ প্রকল্পের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে চাঁদপুরে আইটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণে আবেদন বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ।

তরুণরা কী পড়ছে বেশি?
চাঁদপুর জেলার ৬টি সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ১২টি বেসরকারি আইটি ইনস্টিটিউটের সাথে কথা বলে ৬টি প্রধান ট্রেন্ড পাওয়া গেছে:
১. ডিজিটাল মার্কেটিং ও ফ্রিল্যান্সিং:
সবচেয়ে বেশি চাহিদা এখানেই। চাঁদপুরের তরুণদের মধ্যে প্রায় ৪০% শিক্ষার্থী এখন ডিজিটাল মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, এসইও এবং ফেসবুক-ইউটিউব মনিটাইজেশন শিখছে। কারণ, এইচএসসি পাস করেই ঘরে বসে আয়ের সুযোগ। সরকারি প্রকল্পে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, বেসিক ইংরেজি, সফট স্কিলের পাশাপাশি স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শেখানো হচ্ছে, যেখানে দৈনিক ২০০ টাকা ভাতাও দেওয়া হচ্ছে।
২. গ্রাফিক্স ডিজাইন, UI/UX ও আর্ট ডিজাইন:
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রেন্ড। চাঁদপুর সরকারি কলেজ, পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজ ও চাঁদপুর পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে Canva, Photoshop, Illustrator, Figma দিয়ে লোগো ডিজাইন, টি-শার্ট ডিজাইন, ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি তৈরির হিড়িক পড়েছে। অনেক তরুণ এখন নিজেকে ‘ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, Fiverr, Upwork ও Behance-এ প্রোফাইল খুলছে।
৩. ভিডিও এডিটিং, মোশন গ্রাফিক্স ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন:
চাঁদপুরের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় এখন ইউটিউবার, ফেসবুক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। CapCut, Adobe Premiere Pro, After Effects, DaVinci Resolve শিখে ভিডিও এডিটিংকে পেশা বানাচ্ছে তরুণরা। স্থানীয় ওয়াজ মাহফিল, বিয়ে, নৌকা বাইচ থেকে শুরু করে নাটকের ট্রেইলার এডিটিং করেও মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা আয় করছে অনেকে।
৪. ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, প্রোগ্রামিং ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট:
চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (প্রস্তাবিত) এবং চাঁদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রভাবে প্রোগ্রামিংয়ে আগ্রহ বাড়ছে। HTML, CSS, JavaScript, Python, Flutter দিয়ে ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে ঝুঁকছে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। চাঁদপুর শহরের রহমতপুর ও মিশন রোড এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৫টির বেশি কোডিং শেখার ছোট স্টার্টআপ।
৫. আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডেটা ও সাইবার সিকিউরিটি:
এটি একেবারে নতুন ঢেউ। ২০২৫ সালের পর থেকে চাঁদপুরের তরুণরা ChatGPT, Midjourney, Leonardo AI দিয়ে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, AI ইমেজ জেনারেশন, অটোমেশন শিখছে। পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটি ও ইথিক্যাল হ্যাকিংয়েও আগ্রহ বাড়ছে।
৬. বিজ্ঞান, রোবোটিক্স ও মেরিন টেকনোলজি:
চাঁদপুরে ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (IMT) থাকায় মেরিন, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ বেশি। এছাড়া জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞান মেলা, রোবোটিক্স ক্লাব ও STEM প্রজেক্টে অংশগ্রহণ বেড়েছে।
কেন এই পরিবর্তন?
১. চাকরির বাজারের বাস্তবতা: সরকারি চাকরির সীমিত পদ ও বেসরকারি খাতে দক্ষতার চাহিদা তরুণদের স্কিল-ভিত্তিক পড়াশোনায় ঠেলছে।
২. ইন্টারনেট সহজলভ্যতা: চাঁদপুর জেলায় এখন ৯৫% এলাকায় 4G কভারেজ। একটি স্মার্টফোনই এখন ক্লাসরুম।
৩. রোল মডেল: চাঁদপুরের অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সার এখন মাসে লাখ টাকা আয় করছেন, তাদের ফেসবুক পোস্টই অন্যদের অনুপ্রেরণা।
৪. সরকারি সহায়তা: যুব উন্নয়ন, TTC, BITAC, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বিনামূল্যে কোর্সগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।
পেশার মান উন্নয়নে তরুণরা কী করতে পারে? – ৮ দফা রোডম্যাপ
শুধু কোর্স করলেই হবে না, পেশার মান উন্নয়নে দরকার স্মার্ট পরিকল্পনা। চাঁদপুরের তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষকদের সাথে কথা বলে এই রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে:
১. একটি স্কিলে মাস্টার হন, দশটাতে নয়: নতুনরা ভুল করে একসাথে গ্রাফিক্স, ভিডিও, ডিজিটাল মার্কেটিং সব শিখতে যায়। এর বদলে ৬ মাস একটি বিষয়ে গভীরভাবে শিখুন। যেমন – আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইনার হতে চান, তাহলে শুধু লোগো ও ব্র্যান্ড গাইডলাইনে সেরা হোন।
২. ইংরেজি ও কমিউনিকেশন স্কিল বাধ্যতামূলক: ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে ৮০% কাজ হারায় দুর্বল ইংরেজির জন্য। প্রতিদিন ৩০ মিনিট ইংরেজি স্পিকিং ও ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন প্র্যাকটিস করুন। সরকারি কোর্সেও এখন বেসিক ইংরেজি ও সফট স্কিল শেখানো হচ্ছে।
৩. পোর্টফোলিওকে সিভির চেয়ে গুরুত্ব দিন: চাঁদপুরের তরুণদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পোর্টফোলিও নেই। Behance, Dribbble, GitHub, YouTube বা নিজের ওয়েবসাইটে কাজ সাজিয়ে রাখুন। একটি শক্তিশালী পোর্টফোলিও ১০টি সার্টিফিকেটের চেয়ে দামি।
৪. লোকাল থেকে গ্লোবাল: শুরুতেই ডলারের পেছনে না ছুটে চাঁদপুর শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কোচিং সেন্টার, মাছের আড়তের জন্য কাজ করুন। লোকাল কাজ আপনাকে অভিজ্ঞতা ও রেফারেন্স দুটোই দেবে।
৫. AI-কে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহকারী বানান: ডিজাইনার হলে Midjourney দিয়ে আইডিয়া নিন, ডেভেলপার হলে GitHub Copilot দিয়ে কোড দ্রুত করুন, মার্কেটার হলে ChatGPT দিয়ে কন্টেন্ট প্ল্যান করুন। যে AI ব্যবহার শিখবে না, সে পিছিয়ে পড়বে।
৬. নেটওয়ার্কিং ও মেন্টরশিপ: চাঁদপুরে এখন প্রায় ৮-১০টি অ্যাকটিভ ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটি আছে। তাদের মিটআপে যান। একজন সিনিয়রের অধীনে ৩ মাস বিনা পারিশ্রমিকে ইন্টার্ন করুন।
৭. আর্থিক সাক্ষরতা ও পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং: আয় করা শিখলেই হবে না, টাকা ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। পাশাপাশি LinkedIn ও Facebook-এ নিজের কাজ নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করুন। চাঁদপুরের তরুণদের মধ্যে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব প্রকট।
৮. সরকারি সুযোগ কাজে লাগান: যুব উন্নয়ন কেন্দ্র, TTC চাঁদপুর, BITAC চাঁদপুরে প্রায় সারা বছর বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ চলে। এছাড়া ‘৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ’ প্রকল্পে ১৮-৩৫ বছর বয়সী এইচএসসি পাস যে কেউ আবেদন করতে পারে। এই সুযোগগুলো মিস করবেন না।
শেষ কথা
চাঁদপুরের তরুণরা এখন আর শুধু চাকরি খোঁজে না, চাকরি তৈরি করার স্বপ্ন দেখে। তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও আর্ট ডিজাইনের এই ত্রিমুখী শিক্ষা যদি সঠিক গাইডলাইনে এগোয়, তাহলে আগামী ৫ বছরে চাঁদপুর থেকে অন্তত ১০ হাজার বৈশ্বিক মানের ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা বের হবে। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিকতা, সঠিক স্কিল নির্বাচন এবং শেখার মানসিকতা।
চাঁদপুরের ইলিশ যেমন বিশ্বজোড়া, তেমনি চাঁদপুরের তরুণদের স্কিলও বিশ্বজোড়া হতে পারে – যদি আজই শুরু হয়।
প্রকাশিত : সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

















