ফেসবুক কীভাবে পড়ে মনের কথা?

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

আপনার সাথে কি কখনো এমন হয়েছে? সকালে বন্ধুর সাথে চা খেতে খেতে বললেন, কক্সবাজারে ঘুরতে গেলে মন্দ হতো না। ফোনে সার্চ করেননি, কোথাও লেখেননি। বিকেলেই ফেসবুক খুলে দেখলেন নিউজফিড জুড়ে কক্সবাজারের হোটেলের বিজ্ঞাপন, ট্রাভেল এজেন্সির অফার, বাসের টিকিটে ছাড়।

মনে হয়, ফেসবুক যেন আপনার মনের ভেতর উঁকি দিচ্ছে। আসলে সে মন পড়ছে না, সে আপনার আচরণ পড়ছে। আর আচরণ থেকেই মনের চেয়ে নিখুঁত ভবিষ্যৎবাণী করা যায়। এই ফিচারটি সেই অদৃশ্য মন পড়ার কৌশলের গল্প।

১. আপনি যা বলেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপনি যা করেন না
আমরা ভাবি ফেসবুক শুধু আমাদের লাইক, কমেন্ট, শেয়ার দেখে। সত্যি বলতে এগুলো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ফেসবুক সবচেয়ে বেশি নজর দেয় আপনি যা করেন না, তার ওপর।

ধরুন, আপনি নিউজফিড স্ক্রল করছেন। একটা বাইকের ছবি এলো। আপনি লাইক দিলেন না। কিন্তু ছবিটার ওপর আপনার আঙুলটা আধা সেকেন্ড বেশি থামল। আপনি জুম করে দেখলেন। ফেসবুকের ভাষায় এর নাম ‘dwell time’। আপনি থামলেন মানেই আপনার মস্তিষ্ক আগ্রহ দেখিয়েছে। লাইক না দিলেও ফেসবুক বুঝে গেল, আপনি বাইক পছন্দ করেন।

আপনি কোন পোস্টে কতক্ষণ তাকিয়ে আছেন, কোন ভিডিও তিন সেকেন্ড পর টেনে উপরে তুলে দিচ্ছেন, কোনটা সাউন্ড অন করে দেখছেন, কার প্রোফাইলে গিয়ে ছবি না দেখে চলে আসছেন, রাত কয়টায় অ্যাক্টিভ থাকেন, দ্রুত টাইপ করেন নাকি ধীরে, এমনকি ব্যাটারি লো থাকলে আপনি কী ধরনের পোস্ট এড়িয়ে যান – সবকিছুর একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়।

আপনার প্রতিটি নীরবতাও ফেসবুকের কাছে এক একটি তথ্য।

২. ফেসবুক শুধু ফেসবুক নয়
আপনি ফেসবুক অ্যাপ বন্ধ করে দিলেও ফেসবুক আপনার পিছু ছাড়ে না। এর সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম Meta Pixel এবং Facebook SDK।

বাংলাদেশের প্রায় সব বড় ই-কমার্স সাইট, নিউজ পোর্টাল, এমনকি চাকরির সাইটেও এই ছোট্ট কোডটি বসানো থাকে। আপনি দারাজে গিয়ে একটি হেডফোন দেখলেন, কিনলেন না। ওয়েবসাইটটি সাথে ফেসবুককে জানিয়ে দিল, এই আইডির ব্যক্তি হেডফোনে আগ্রহী। এরপর আপনি ফেসবুকে ফিরলেই সেই একই হেডফোনের বিজ্ঞাপন আপনার সামনে।

একইভাবে আপনার ফোনে থাকা Pathao, Bikroy, বা যে কোনো অ্যাপ যারা ফেসবুকের SDK ব্যবহার করে, তারা আপনার অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য ফেসবুককে দেয়। আপনি কোথায় গাড়ি ডাকছেন, কী সার্চ করছেন, সবকিছু মিলে এক বিশাল জিগস পাজল তৈরি হয়।

এই কারণেই মুখে বলা কক্সবাজারের কথাও ফেসবুক জেনে যায়। হয়তো আপনি বলেননি, কিন্তু আপনার বন্ধু গুগলে সার্চ করেছে, সে আপনার সাথে একই ওয়াইফাইয়ে যুক্ত, একই জায়গায় চেক-ইন করেছে, বা আপনাদের মেসেঞ্জারে কক্সবাজার শব্দটা এসেছে। ফেসবুক ব্যক্তিকে একা দেখে না, দেখে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে।

৩. আপনার বন্ধুরাই আপনার প্রোফাইল
ফেসবুকের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং বুদ্ধিদীপ্ত আবিষ্কার হলো শ্যাডো প্রোফাইল।

ধরুন, আপনি কখনো ফেসবুকে আপনার ফোন নম্বর দেননি। কিন্তু আপনার তিনজন বন্ধু তাদের ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট ফেসবুকে আপলোড করেছে। তিনজনের লিস্টেই আপনার নাম্বার একই নামে সেভ করা। ফেসবুক সহজেই বুঝে যাবে এই নাম্বারটি আপনার। আপনি ফেসবুকে না থাকলেও আপনার একটি অদৃশ্য প্রোফাইল তৈরি হয়ে গেছে।

ফেসবুক বিশ্বাস করে, “আপনি কে তা আপনার বন্ধুরা বলে দেবে।” আপনি কী ধরনের মানুষ, তা বোঝার জন্য ফেসবুক আপনার বন্ধুদের পছন্দ বিশ্লেষণ করে। আপনার ৮০ ভাগ বন্ধু যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ফুটবল ক্লাব বা পোশাকের ব্র্যান্ড পছন্দ করে, ফেসবুক ধরে নেবে আপনিও সেটাই পছন্দ করেন, এমনকি আপনি কখনো তা প্রকাশ না করলেও।

একে বলে Lookalike Audience। বিজ্ঞাপনদাতারা এই সুবিধা ব্যবহার করে। আপনি হয়তো সরাসরি বাবা হননি, কিন্তু আপনার বয়স, আপনার বন্ধুদের বয়স, আপনার সার্চ প্যাটার্ন দেখে ফেসবুক আন্দাজ করে ফেলতে পারে আপনি শিগগিরই বাবা হতে চলেছেন।

৪. মনের আবেগ মাপার মেশিন
২০১৭ সালে ফাঁস হওয়া একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে জানা যায়, ফেসবুক তরুণ ইউজারদের মধ্যে কখন তারা নিজেদের ‘insecure’, ‘worthless’ বা ‘stressed’ অনুভব করছে, তা শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে বলে দাবি করেছে।

কীভাবে? আমাদের লেখার ধরন বদলে যায় আবেগের সাথে। মন খারাপ থাকলে আমরা ছোট বাক্য লিখি, রাত জাগি, বেশি নেগেটিভ শব্দ ব্যবহার করি, স্যাড গান শুনি। ফেসবুকের AI এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো ধরে ফেলে।

আপনি যখন ব্রেকআপের পর রাত ২টায় ঘুমাচ্ছেন না, বারবার একই মানুষের প্রোফাইল দেখছেন, পুরনো ছবিতে লাইক দিচ্ছেন, তখন ফেসবুক বুঝে যায় আপনি আবেগগতভাবে দুর্বল। আর এই সময়টাই বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কারণ আবেগপ্রবণ মানুষ বেশি কেনাকাটা করে।

এটা শুধু বিজ্ঞাপন নয়। আপনার নিউজফিড কীভাবে সাজানো হবে, তাও নির্ভর করে আপনার আবেগের ওপর। আপনি যদি রাগান্বিত পোস্টে বেশি সময় দেন, ফেসবুক আপনাকে আরও রাগান্বিত পোস্ট দেখাবে, কারণ রাগ মানুষকে বেশি সময় ধরে আটকে রাখে।

৫. ভবিষ্যৎবাণী, জাদু নয়, গণিত
ফেসবুক ভবিষ্যৎ দেখে না, সম্ভাবনা হিসাব করে। আপনার ডেটা দিয়ে সে একটি মডেল বানায়।

একটি উদাহরণ দিই। ফেসবুকের কাছে ৩০০ কোটি মানুষের ডেটা আছে। সে জানে, যারা গত ৬ মাসে বাইকের ভিডিও দেখেছে, বাইক গ্রুপে জয়েন করেছে, এবং যাদের বন্ধুরা বাইক কিনেছে বলে পোস্ট দিয়েছে, তাদের মধ্যে ৭৮ ভাগ মানুষ পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাইক কেনার বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে।

আপনি যখন সেই প্যাটার্নের মধ্যে পড়ে যান, ফেসবুক আপনাকে বাইকের বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করে। আপনি ভাবেন, আরে আমি তো মনে মনে বাইক কেনার কথা ভাবছিলাম। আসলে ফেসবুক আপনার আগেই আপনার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা হিসাব করে ফেলেছে।

একে বলে Predictive Modeling। আপনার মন পড়া নয়, আপনার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের আচরণ থেকে শেখা একটি গাণিতিক অনুমান।

তাহলে উপায় কী? আমরা কি অসহায়?
না। পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

১. Off-Facebook Activity বন্ধ করুন: ফেসবুক সেটিংসে গিয়ে ‘Off-Facebook Activity’ অপশনে দেখুন কোন কোন ওয়েবসাইট আপনার তথ্য পাঠাচ্ছে। সেখান থেকে Clear History এবং Future Activity বন্ধ করে দিন।

২. লোকেশন হিস্ট্রি পর্যালোচনা করুন: ফেসবুক এবং ফোনের লোকেশন পারমিশন ‘Only while using’ করে রাখুন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপে লোকেশন বন্ধ রাখুন।

৩. বিজ্ঞাপন পছন্দ রিসেট করুন: Ad Preferences এ গিয়ে দেখুন ফেসবুক আপনাকে কী কী বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে করে। অবাক হবেন। অপ্রাসঙ্গিক টপিকগুলো রিমুভ করে দিন।

৪. সচেতন স্ক্রলিং: মনে রাখবেন, ফেসবুক বিনামূল্যে নয়। আপনি টাকা দিচ্ছেন না, আপনি নিজেই পণ্য। আপনার মনোযোগই তার আয়। তাই রাগ, হিংসা বা অতিরিক্ত আনন্দের পোস্টে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে একটু থামুন।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা হলো, ফেসবুক কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি দিয়ে মন পড়ে না। সে পড়ে আমাদের ডিজিটাল ছায়া। আমরা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ইন্টারনেটে যে ছায়া ফেলে যাচ্ছি, সেই ছায়াটাই আমাদের চেয়ে বেশি কথা বলে। ফেসবুক শুধু সেই ছায়া থেকে আমাদের প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।

প্রযুক্তি খারাপ নয়, কিন্তু তার ব্যবহার সম্পর্কে না জানাটা বিপজ্জনক। মনের কথা পড়া বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু কে আপনার মনের কথা পড়বে, সেটা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা এখনো আপনার হাতেই আছে।

অ প্রকাশিত : সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy