যুক্তির ফাঁদে : ক্ষুদীরাম দাস

ছোট গল্প

:
এক
কলকাতা শহরের প্রাচীন এক বনেদি পরিবারের সন্তান অনিরুদ্ধ চৌধুরী। পেশায় সে গণিতের অধ্যাপক এবং দর্শনের নামজাদা গবেষক। বুদ্ধির প্রখরতা এবং যুক্তির তীক্ষèতায় তাকে পরাস্ত করা কঠিন। তবে সেই প্রখরতার সাথে সাথেই তার মনের ভেতর বাসা বেঁধেছিলো এক পরম অহংকার। অনিরুদ্ধ বিশ্বাস করতো, জগতের প্রতিটা ঘটনা, মানুষের আবেগ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটা গতিপথ কেবলমাত্র শুষ্ক যুক্তি আর অঙ্কের নিয়মে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যা’ কিছু যুক্তির সমীকরণে মেলে না, তার কোনো অস্তিত্বই নেইÑএটাই ছিলো তার মূল দর্শন।

অনিরুদ্ধের স্ত্রী সুচিত্রা ছিলো ঠিক তার বিপরীত। সে শান্ত, ভক্তিমতী এবং বিশ্বাসী। সুচিত্রা বিশ্বাস করতো, এ জগৎ কেবল কাঠখোট্টা যুক্তিতে চলে না; যুক্তির ওপারেও এমন কিছু অনুভূতির রহস্য আছে, যা’ কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।

প্রতিমাসে অনিরুদ্ধ নিজের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ তুলে দিতো সুচিত্রার হাতে। ঘরের সংসার চালানোর জন্যে সুচিত্রা সেই টাকার হিসাব রাখতো নিখুঁতভাবে। তবে দু’জনের মধ্যে প্রায়ই তর্ক বাঁধতো একটা বিষয় নিয়ে- অনিরুদ্ধের এ প্রচণ্ড অহংকার এবং প্রতিটা মানবিক অনুভূতিকে অংক আর যুক্তির ছাঁচে ফেলার অনমনীয় স্বভাব।

একদিন সন্ধ্যায় পড়ার ঘরে বসে অনিরুদ্ধ একটা জটিল নিবন্ধ লিখছিলো। সুচিত্রা দু’টি কাপে চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সে হাসলো। সেই মৃদু হাসির মধ্যদিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব ফুটে উঠলো।

অনিরুদ্ধ চশমাটা নাকের ওপর তুলে শুধালো, “কী ব্যাপার সুচিত্রা? একা একা হাসছো যে?”

সুচিত্রা মৃদুস্বরে বললো, “ভাবছিলাম, তুমি যতো বড় পণ্ডিতই হও না কেন, মানুষের মনকে তো আর কোনো সমীকরণে বাঁধতে পারোনি। প্রতিটা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার যে অনুভূতি, তা’ কি কোনো অঙ্ক দিয়ে মাপা যায়?”

অনিরুদ্ধ তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে উঠলো। সে বললো, “তুমি যাকে ভালোবাসা বলো সুচিত্রা, তা’ আসলে মস্তিষ্ক আর হরমোনের কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের সমস্ত সিদ্ধান্তই কোনো না কোনো লাভ-ক্ষতির অংক মেনে চলে। কোনো অদৃশ্য অনুভূতি বলে কিছু নেই। যতো দিন যাচ্ছে, মানুষ ততোই যুক্তিনির্ভর হচ্ছে। কাণ্ডজ্ঞান যার আছে, সে বোঝে যে এ জগৎ শুধুই কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে চালিত।”

সুচিত্রা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে জানতো, অনিরুদ্ধের সাথে কথা কাটাকাটি করে কোনো লাভ নেই। অনিরুদ্ধ নিজের যুক্তির জালে এতোটাই আটকে গেছে যে, তার বাইরের কোনো আলোই সে দেখতে পায় না।

দুই
কয়েকদিন পর, অনিরুদ্ধের বাড়িতে এলেন এক প্রবীণ পন্ডিতÑনীলকণ্ঠ শাস্ত্রী। তিনি অনিরুদ্ধের বাবার পুরোনো বন্ধু ছিলেন। শাস্ত্রাদিতে তাঁর অগাধ পণ্ডিত্য, কিন্তু স্বভাবটি অত্যন্ত নম্র ও শান্ত।

সেদিন বিকেলে বসার ঘরে তিনটি ইটের গাঁথুনি দেওয়া পুরোনো দেয়ালের পাশে সবাই বসেছিলো। সুচিত্রা তাঁদের জন্যে নাস্তা আর চা তৈরি করছিল। অনিরুদ্ধ কথা প্রসঙ্গে নীলকণ্ঠ বাবুকে বললো, “কাকাবাবু, আপনি এতো বই পড়েছেন, এতো বেদ-উপনিষদ চর্চা করেছেন। তবুও কি আপনি মনে করেন যে অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে জগৎ পরিচালনা করা সম্ভব? বিজ্ঞান আর যুক্তি যেখানে প্রতিদিন নতুন সত্য উন্মোচন করছে, সেখানে মানুষের পরমেশ্বর বা কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর ভরসা রাখাটা শুধুই দুর্বলতা নয় কি?”

নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী একটু মুচকি হাসলেন। তারপর ধীরকণ্ঠে বললেন, “অনিরুদ্ধ, যুক্তি হলো মানুষের বুদ্ধির একটি প্রদীপ। কিন্তু সেই প্রদীপ দিয়ে তুমি ঘরের ভেতরটা দেখতে পারো, ঘরের বাইরের বিশাল আকাশটা নয়। তুমি যখন যুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে নিজের অহংকার গড়ে তোলো, তখন সেই যুক্তিই তোমার চারপাশে একটা দেয়াল তুলে দেয়। একেই বলে যুক্তির ফাঁদ। তুমি ভাবো তুমি মুক্ত, কিন্তু আসলে তুমি নিজেরই তৈরি যুক্তির খাঁচায় বন্দী।”

অনিরুদ্ধ যুক্তির খাতিরে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে তীব্র গলায় বললো, “কাকাবাবু, আমি কোনো ফাঁদে আটকে নেই। আমি প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলি। যদি আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে যুক্তির বাইরেও এমন কিছু আছে যা’ মানুষের জীবনকে পরিচালনা করে, তবেই আমি তা’ মানবো। নতুবা এগুলো শুধুই কল্পনাবিলাস।”

সুচিত্রা ঘর থেকে শুনছিলো তাদের কথা। সে মনে মনে ভাবছিলো, অনিরুদ্ধের এ অনমনীয় অহংকার হয়তো কোনোদিন তাকে বড় কোনো বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী শান্তভাবে বললেন, “সময়ই তোমাকে প্রমাণ দেবে অনিরুদ্ধ। যুক্তি মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, কিন্তু হৃদয় মানুষকে বাঁচতে শেখায়। যখন জীবনে বড় কোনো সংকট নেমে আসে, তখন মানুষের তৈরি এই শুকনো অঙ্ক আর যুক্তি ধসে পড়ে। তখন কেবল বিশ্বাসের ওপর ভর করেই মানুষকে উঠে দাঁড়াতে হয়।”

তিন
নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী চলে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই অনিরুদ্ধের শান্ত জীবনে একটি অদৃশ্য ঝড় বইতে শুরু করলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বড় পদ খালি হয়েছিল। অনিরুদ্ধ নিশ্চিত ছিলো যে তার যোগ্যতা, গবেষণাপত্র এবং মেধার সমীকরণে সেই পদটি কেবল তারই প্রাপ্য। সে তার সহকর্মীদের বলতো, “আমি অংক কষে দেখেছি, আমার যে যোগ্যতা, তাতে এ পদ অন্য কেউ পেতে পারেই না। যদি কেউ পায়, তবে তা’ হবে যুক্তির নিয়ম লঙ্ঘন করা।”

কিন্তু পদোন্নতির তালিকা যেদিন টাঙানো হলো, অনিরুদ্ধ স্তম্ভিত হয়ে দেখলো তার জুনিয়র এক অধ্যাপক সেই পদটি পেয়েছে, যে রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছিলো।

অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে এলো চরম বিষণ্নতা আর ক্ষোভ নিয়ে। তার গড়া যুক্তির প্রথম দেয়ালটা যেন কেঁপে উঠলো। ঘরের কোণে চুপচাপ বসে সে ভাবতে লাগলোÑকোথায় ভুল হলো? তার সমীকরণ তো ভুল হবার কথা ছিলো না!

সুচিত্রা তার কাছে এসে শান্তভাবে বসলো। সে বললো, “তুমি এতো ভাবছো কেন? জগৎ সবসময় তোমার অঙ্কের নিয়মে চলবে না। মানুষের কুটিলতা, হিংসা আর অন্যায়ের কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র থাকে না।”

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বললো, “না সুচিত্রা, এটা হতে পারে না! আমি আবার হিসাব করবো। কোথাও না কোথাও একটা ভুল নিশ্চয়ই হয়েছে। আমি এ অন্যায় মেনে নেবো না, আমি লড়বো!”

কিন্তু সংকট কেবল সেখানেই থেমে থাকলো না। কয়েকদিন পর অনিরুদ্ধের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্যোগটি নেমে এলো।

সুচিত্রা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ বোধ করছিলো। ডাক্তার দেখানোর পর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেয়া হলো। পরীক্ষার রিপোর্ট যেদিন এলো, অনিরুদ্ধের হাত থেকে কাগজগুলো পড়ে গেলো। সুচিত্রার শরীরে এক মরণঘাতী রোগ বাসা বেঁধেছে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। মাত্র কুড়ি শতাংশ আশা আছে।

অনিরুদ্ধের মাথার ভেতর সব অঙ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো। সে টেবিলের ওপর রাখা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলো খুলে দিনরাত পড়া শুরু করলো। মৃত্যুর সম্ভাবনা ৮০%, বাঁচার সম্ভাবনা ২০%। এ যে পরিসংখ্যান, এ যে সম্ভাবনা তত্ত্বÑএগুলো তাকে মানসিকভাবে পিষে ফেলতে লাগলো।

সে নিজেকেই প্রশ্ন করতে লাগলো: ২০% সম্ভাবনা মানে তো মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশি! তাহলে চিকিৎসায় এতো টাকার শ্রাদ্ধ করে লাভ কী? কিন্তু পরক্ষণেই সুচিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠতো।

যে যুক্তি তাকে এতদিন শক্তি দিয়েছিলো, সেই যুক্তিই এখন তাকে ধাপে ধাপে এক ভয়ংকর যন্ত্রণার অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছিলো।

চার
সুচিত্রা হাসপাতালে ভর্তি হলো। প্রতিমাসে অনিরুদ্ধ যে টাকা জমিয়েছিলো, তা’ এখন জলের মতো খরচ হতে লাগলো। কিন্তু টাকার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ালো অনিরুদ্ধের মানসিক সংকট।

সে প্রতি মুহূর্তে ডাক্তারদের যুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে লাগলো।
“ডাক্তারবাবু, আপনার এই ওষুধের কার্যকারিতা কতোটা? আপনি কি গ্যারান্টি দিতে পারেন যে উনি বাঁচবেন?”
ডাক্তার উত্তর দিতেন, “বিজ্ঞান বা চিকিৎসা কোনো গ্যারান্টি দেয় না অধ্যাপক চৌধুরী। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, বাকিটা ওপরওয়ালার হাতে বা সুচিত্রার নিজের জীবনীশক্তির ওপর নির্ভর করছে।”

অনিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠতো, “ওপরওয়ালা বলতে কিছু নেই! জীবনীশক্তিও একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া! আমাকে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিন!”

ডাক্তার শান্তভাবে বলতেন, “সবকিছু পরিসংখ্যান দিয়ে হয় না। রোগীদের মনের জোর আর আশাই অনেক সময় অলৌকিক পরিবর্তন আনে।”

অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে এসে একা ঘরে পায়চারি করতো। সে দেখলো, তার যুক্তি তাকে বলছে যে সুচিত্রার বাঁচার আশা নেই বললেই চলে। সমীকরণ অনুযায়ী হার মানাই যৌক্তিক। কিন্তু তার হৃদয় চিৎকার করে বলছিলো যে সে সুচিত্রাকে হারাতে পারবে না।

এই দু’য়ের টানাটেনে অনিরুদ্ধের ঘুম হারাম হয়ে গেলো। সে না পারছিলো সম্পূর্ণ আশা ছাড়তে, না পারছিলো যুক্তির উর্ধ্বে গিয়ে সুচিত্রাকে ভালোবেসে একটু সান্ত্বনা দিতে। যখনই সে সুচিত্রার পাশে গিয়ে বসতো, তার চোখের সামনে ভেসে উঠতো মৃত্যুর পরিসংখ্যানের সেই শীতল অঙ্ক।

সুচিত্রা অনিরুদ্ধের হাত ধরে বলতো, “তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেন? যা’ হবার তা’ই হবে। তুমি কেবল আমার পাশে একটু শান্ত হয়ে বসো। তোমার এই শুকনো চিন্তার হিসাব বন্ধ করো।”

অনিরুদ্ধ কোনো উত্তর দিতে পারতো না। সে কেবল অপলক চোখে সুচিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকতো।

এক রোববার বিকেলে, হাসপাতালের বারান্দায় বসে অনিরুদ্ধ দেখতে পেলো এক অদ্ভুত দৃশ্য। একটি ছোট ঘরের সামনে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে প্রার্থনা করছে। সেখানে একজন অতি সাধারণ মানুষ, যার সন্তানের চিকিৎসাও সংকটাপন্ন, সে কিন্তু ভেঙে পড়েনি। তার চোখে এক অপূর্ব আশার আলো। সে বিশ্বাস করে, সব ঠিক হয়ে যাবে।

অনিরুদ্ধ মনে মনে ভাবলোÑএ তো চরম মূর্খতা! যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তা’ নিয়ে মানুষ কীভাবে এতোটা আশাবাদী হতে পারে? কিন্তু পরক্ষণেই সে উপলব্ধি করলো, এই ‘মূর্খ’ মানুষটি যতোটা শান্তিতে আছে, অনিরুদ্ধ তার সমস্ত জ্ঞান আর যুক্তি নিয়েও তার একশ ভাগের একভাগ শান্তিতে নেই।

তার অর্জিত জ্ঞান আর অহংকার তাকে কোনো শান্তি দিচ্ছে না; বরং প্রতিটা মুহূর্তে এক তিলে তিলে মারার ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

পাঁচ
অস্ত্রোপচারের দিন ঘনিয়ে এলো। সকালে অনিরুদ্ধ সুচিত্রার কেবিনে গেল। সুচিত্রার মুখটা ফ্যাকাসে, কিন্তু তার চোখে-মুখে এক পরম শান্তি।

সুচিত্রা বললো, “আজ আমার অপারেশন। তুমি কি এখনো ভয় পাচ্ছো?”

অনিরুদ্ধ নিচু স্বরে বললো, “আমি ভয় পাচ্ছি না সুচিত্রা, আমি হিসাব মেলাতে পারছি না। আমার ব্রেইন বলছে সম্ভাবনা মাত্র পাঁচভাগের একভাগ। এ এতোটাই কম যে…”

সুচিত্রা অনিরুদ্ধের মুখ চেপে ধরলো। সে মৃদু হেসে বললো, “তোমার এই অঙ্কের হিসেব বন্ধ করো তো! জীবনের আসল সৌন্দর্য তো ওই অনিশ্চয়তার মধ্যেই। যদি সবকিছু আগে থেকেই অঙ্কে মিলে যেতো, তবে মানুষের ভালোবাসা, প্রার্থনা আর বিশ্বাসের কোনো মূল্যই থাকতো না। তুমি আজ তোমার এই অহংকারটা ছেড়ে দাও অনিরুদ্ধ। যুক্তিকে একটু দূরে সরিয়ে রেখে হৃদয়ের ভাষাটা শোনো।”

অনিরুদ্ধ কিছু বলতে পারলো না। সুচিত্রাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তখন অনিরুদ্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো।

সময় কাটতে লাগলো। এক ঘণ্টা, দু’ ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা…।

হাসপাতালের সেই দীর্ঘ করিডোরে অনিরুদ্ধ একা পায়চারি করতে লাগলো। তার মাথার ভেতর সমীকরণগুলো সব উলটপালট হয়ে যাচ্ছিলো। যে যুক্তির ওপর ভর করে সে এতদিন জীবনকে মেপে এসেছে, সেই যুক্তি এখন তাকে বলছেÑসব শেষ হতে চলেছে। কিন্তু তার ভেতরের আত্মাপুরুষ চিৎকার করে বলছিলোÑনা, সুচিত্রা ফিরে আসবে!

এ প্রথম অনিরুদ্ধের মনে হলো, তার বুদ্ধির অহংকার কতোটা তুচ্ছ! সে উপলব্ধি করলো, জীবনের অনেক সত্যই যুক্তির সীমানার বাইরে বাস করে। মৃত্যু বা জীবনের লড়াইয়ে মানুষের শুষ্ক যুক্তি কেবল ভয় আর হতাশা এনে দেয়, কিন্তু বিশ্বাস এনে দেয় বেঁচে থাকার সাহস।

হঠাৎই অনিরুদ্ধের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লো। যে মানুষটি জীবনে কখনো আবেগের কাছে মাথা নোয়ায়নি, সে আজ নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো। সে করিডোরের এক কোণে হাঁটু গেড়ে বসলো। তার অহংকারের দেয়াল ধসে পড়লো।

সে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলতে লাগলো, “আমি হচ্ছি সেই মূর্খ, যে ভেবেছিলো পুরো ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের বুদ্ধির ছাঁচে বেঁধে ফেলবে। আজ আমি মানছি, আমার যুক্তি পরাজিত। আজ আমি কেবল ভালোবাসার শক্তিতে বিশ্বাস করতে চাই। হে ঈশ্বর, বা যে অসীম শক্তি এই সৃষ্টিকে পরিচালনা করছে, সুচিত্রাকে তুমি ফিরিয়ে দাও।”

এটি কোনো অন্ধ বিশ্বাস ছিলো না; এটি ছিলো যুক্তির অহংকার থেকে মুক্তি পাওয়ার এক আকুল আর্জি।

ছয়
ওটি-র লাল আলোটা নিভে গেলো।

ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে এক চিলতে হাসি।

অনিরুদ্ধ দ্রুত এগিয়ে গেলো। কাঁপানো গলায় শুধালো, “ডাক্তারবাবু… সুচিত্রা কেমন আছে?”

ডাক্তার তার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “অপারেশন সফল হয়েছে অধ্যাপক চৌধুরী! সত্যি বলতে কী, কন্ডিশন খুবই আশঙ্কাজনক ছিলো। আমরা আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু সুচিত্রাদেবীর শারীরিক সাড়া এবং তাঁর ভেতরের প্রবল মানসিক ইচ্ছা দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছি। এটা সত্যিই এক চমৎকার ঘটনা! উনি এখন বিপদ মুক্ত।”

অনিরুদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখের জল আবারো বাঁধ ভাঙলো। কিন্তু এবার সেই জল দুঃখের নয়, পরম শান্তির।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেই ২০% সম্ভাবনাকে হারিয়ে সুচিত্রা ফিরে এসেছে। এটা কি কেবলই কাকতালীয়? নাকি মানুষের ইচ্ছা শক্তি আর প্রার্থনার এমন কোনো শক্তি আছে যা’ যুক্তির ছকে মাপা যায় না?

কয়েকদিন পর সুচিত্রা যখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে, নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী আবার এলেন তাদের বাড়িতে।

সুচিত্রা তখন ঘরের বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলো। অনিরুদ্ধ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলো। নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী অনিরুদ্ধের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রণাম করলো। তার চালচলন, কথাবার্তায় এখন আর সেই পুরোনো অহংকারের দাপট নেই। সে যেন এক নতুন মানুষ।

নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী মৃদু হেসে বললেন, “কী অনিরুদ্ধ, এখন তোমার অঙ্ক কী বলছে? তোমার সমীকরণ কি সুচিত্রার ফিরে আসার ব্যাখ্যা দিতে পারছে?”

অনিরুদ্ধ মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বললো, “না কাকাবাবু। আমি যে যুক্তির ফাঁদে আটকে গিয়েছিলাম, তা’ আমার জীবনকে বিষাক্ত করে তুলেছিলো। আমি ভেবেছিলাম আমার বুদ্ধি দিয়ে আমি জগতকে জয় করতে পারবো। কিন্তু আজ আমি বুঝেছি, যুক্তি হলো জীবনের কেবল একটা অংশ, পুরো জীবন নয়।”

সে আরো বললো, “মানুষ যতোদিন নিজের বুদ্ধির অহংকারে অন্ধ থাকে, ততোদিন সে সত্যকে দেখতে পায় না। যুক্তির ওপারেও যে ভালোবাসার, বিশ্বাসের এবং পরম শক্তির এক বিশাল জগৎ রয়েছে, তা’ আমি এবার সুচিত্রার অসুস্থতার মধ্যদিয়ে উপলব্ধি করেছি। আমি আমার অহংকার ত্যাগ করেছি।”

নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী অনিরুদ্ধের পিঠে হাত রেখে বললেন, “সুখে থাকো অনিরুদ্ধ। যে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অহংকার পরিত্যাগ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত পণ্ডিত। যুক্তি আমাদের পথ দেখায় ঠিকই, কিন্তু সেই পথে হাঁটার শক্তি দেয় কেবল আমাদের হৃদয় আর বিশ্বাস।”

রোদ এসে পড়লো অনিরুদ্ধের মুখে। সে জানালার দিকে তাকালো। সুচিত্রা ঘর থেকে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল।

আজ অনিরুদ্ধের কাছে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো সংশয় নেই, এবং কোনো গাণিতিক হিসাব মেলানোর তাড়াও নেই। আজ সে কেবল জীবনের এ পরম সত্য আর ভালোবাসাকে অনুভব করতে পারছে, যা’ কোনো যুক্তির ফাঁদে বন্দি নয়।

প্রকাশিত :  ‍মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy