দুলাল কৃষ্ণ ঘোষকে নিয়ে স্মৃতিচারণ

সজীব খান :
কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, ব্যবহার, আদর্শ ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। সময়ের পরিক্রমায় তাঁরা আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁদের স্মৃতি, কর্ম ও আদর্শ থেকে যায়। হামানকর্দ্দি পল্লীমঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক দুলাল কৃষ্ণ ঘোষ ছিলেন তেমনই একজন আলোকিত মানুষ।

শিক্ষকতা পেশায় তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল ও আদর্শনিষ্ঠ একজন মানুষ। তাঁর চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের নয়, তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনের জন্যও এক অপূরণীয় শূন্যতা।

দীর্ঘ সংবাদকর্মী জীবনে চাঁদপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষক ও গুণী মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু দুলাল কৃষ্ণ ঘোষ ছিলেন তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রমী একজন। তাঁর সঙ্গে দেখা হলেই মুখে থাকত প্রাণখোলা হাসি। সহজ-সরল ব্যবহার এবং আন্তরিক কথাবার্তায় তিনি খুব সহজেই মানুষের আপনজন হয়ে উঠতেন।

গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিও তাঁর ছিল বিশেষ আন্তরিকতা ও সম্মানবোধ। বিদ্যালয়ের যেকোনো অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক আয়োজন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলে তিনি নিজেই গণমাধ্যমকর্মীদের খবর দিতেন।

সংবাদকর্মীরা যাতে যথাযথভাবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরতে পারেন, সে বিষয়েও তিনি আন্তরিক ছিলেন। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে তাঁর কাছ থেকে যে সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছি, তা আমার সাংবাদিকতা জীবনের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

মানুষকে সম্মান দেওয়াটা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বয়স, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে তিনি মানুষকে মূল্যায়ন করতেন না; বরং প্রত্যেকের সঙ্গে আন্তরিকতা ও সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর আচরণে ছিল ভদ্রতা, বিনয় ও মানবিকতার ছাপ।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে দুলাল কৃষ্ণ ঘোষ ছিলেন একজন আদর্শের প্রতীক। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ম-শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি ছিলেন কঠোর, তবে সেই কঠোরতার পেছনে ছিল শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যয়।

বিশেষ করে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুশাসন পালনের ক্ষেত্রেও তিনি আন্তরিক নজর রাখতেন। বিদ্যালয়ে মুসলিম ছাত্রদের টুপি পরে বিদ্যালয়ে আসার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিতেন। মেয়ে শিক্ষার্থীদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়েও অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসনের প্রতি তাঁর যে সম্মান ও সহযোগিতার মানসিকতা ছিল, তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ছিল শুধু শিক্ষা গ্রহণের স্থান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষকতা ছিল তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা নয়, ছিল এক মহান দায়িত্ব। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি এই মহান পেশার প্রতি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ, সহকর্মীদের প্রতি সৌহার্দ্য এবং বিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে সবার কাছে শ্রদ্ধার মানুষে পরিণত করেছিল।

তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলো এখন স্মৃতির পাতায়। তাঁর প্রাণখোলা হাসি, আন্তরিক কথাবার্তা, গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি সম্মান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ বারবার মনে পড়ে। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গড়েছেন, তেমনি একজন মানুষ হিসেবেও রেখে গেছেন অনুকরণীয় কিছু দৃষ্টান্ত।

দুলাল কৃষ্ণ ঘোষকে নিয়ে হয়তো স্বল্প পরিসরে স্মৃতিচারণ করে তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের পুরোটা তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ একজন মানুষের জীবন ও কর্মের ব্যাপ্তি কয়েকটি শব্দে ধারণ করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়—হামানকর্দ্দি পল্লীমঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে তাঁর অবদান ও স্মৃতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধ আগামী প্রজন্মের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর হাসিমাখা মুখ, সুন্দর ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মানুষকে সম্মান করার অসাধারণ গুণ আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দুলাল কৃষ্ণ ঘোষের জীবন আমাদের শিখিয়ে যায়—একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবন ও সমাজকে আলোকিত করেন।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি প্রিয় শিক্ষক দুলাল কৃষ্ণ ঘোষকে। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

প্রকাশিত :  ‍রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy