কুমিল্লায় শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছনা ও ছিনতাই: বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চাই

সম্পাদকীয়

প্রিয় সময়ে ‘কুমিল্লায় শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই অভিযুক্তের দুই বছরের কারাদÐ’ শিরোনামে সংবাদটি আমাদের সকলের নজর করেছে এবং আমরা হতাশ হয়েছি এ প্রজন্মের একশ্রেণীর ছেলেদের নিয়ে। সম্প্রতি কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের সমাজব্যবস্থার আরো একটি কদর্য দিক উন্মোচন করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থী বাসে শ্লীলতাহানি ও ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে গণপরিবহণে, নারীরা কতটা অনিরাপদ-এ ঘটনা তারই প্রমাণ।

ভোরবেলা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী একটি বাসে যখন একজন ছাত্রী তার গন্তব্যে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তা’ সভ্য সমাজের জন্যে চরম লজ্জাজনক। বাসে কোনো যাত্রী না থাকার সুযোগে অভিযুক্তরা তার হাত-পা বেঁধে ফেলে, গলার সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে যৌন হয়রানি করে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। কল্পনা করুন, একজন তরুণী শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন বর্বরতার শিকার হতে হয়েছে! ঘটনার আকস্মিকতায় এবং ভয়াবহতায় আমরা সবাই স্তব্ধ।

এই ঘটনায় দ্রæত অভিযুক্তদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই বছরের কারাদÐ প্রদান করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা কেন ঘটছে? কেন একজন নারী শিক্ষার্থীকে বাসে একা পেলে তাকে নির্যাতন করা হবে? এর মূলে রয়েছে বিচারহীনতার এক দীর্ঘমেয়াদী সংস্কৃতি। অপরাধীরা জানে যে, তারা অপরাধ করেও সহজে পার পেয়ে যাবে। এর ফলে তাদের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পায়। তাই কেবল দু’জনের সাজা দিয়েই এ সমস্যার সমাধান হবে না। যারা পলাতক আছে, তাদের দ্রæত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে, বাসের মালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্তটিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।

গণপরিবহণ আজ নারীদের জন্যে এক অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। শ্লীলতাহানি, ছিনতাই ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন প্রায়শই শোনা যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রতিটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, চালক ও সহকারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং তাদের চরিত্র যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। নারী যাত্রীদের জন্যে বাসে আলাদা সিট বরাদ্দ করা এবং প্রয়োজনে নারী চালক ও সহকারী নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সাথে, কোনো বাসে যাত্রী না থাকলে সেই বাসকে দূরপাল্লার রুটে চলাচল করার অনুমতি না দেয়ার ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।

ঘটনার পরপরই প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রæত ব্যবস্থা নিয়ে অভিযুক্তদের আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। কিন্তু এরপর পুলিশ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বাকবিতÐা হয়েছে, তা হতাশাজনক। জনতা যখন অপরাধীকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চায়, তখন পুলিশের আরও দ্রæত এবং সহযোগিতামূলক আচরণ করা উচিত। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সময়োচিত পদক্ষেপ অবশ্য প্রশংসার দাবি রাখে, কারণ তাদের হস্তক্ষেপে দ্রæত বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এই ধরনের ঘটনায় আরও সংবেদনশীল এবং সক্রিয় হতে হবে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। তারা কেবল প্রতিবাদ করেই থেমে থাকেনি, বরং অপরাধীদের দ্রæত বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে চাপ দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন জনগণের সোচ্চার থাকা কতটা জরুরি।

এই ধরনের ঘটনা রোধে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, নারীদের সম্মান করা এবং কোনো অন্যায় দেখলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ভালো-মন্দের শিক্ষা দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য নারী অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতকে ফুটিয়ে তুলেছে। আমরা একটি আধুনিক, সভ্য সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রত্যেকটি মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, নির্ভয়ে এবং নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সমাজের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যতদিন না আমরা এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাচ্ছি, ততদিন এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই, আসুন আমরা সবাই মিলে এ বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে ভ‚মিকা রাখি।

শনিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৫

You might like