সম্পাদকীয়: এনসিপির আদর্শচ্যুতি ও তৃতীয় ধারার স্বপ্নভঙ্গ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন শক্তির উত্থান সবসময়ই জনমানসে এক ধরনের আশার সঞ্চার করে। বিশেষত যখন সেই শক্তি জন্ম নেয় আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলো থেকে, তখন জনগণের প্রত্যাশা বহুগুণে বেড়ে যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছিল এমনই এক দল, যারা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর রাজপথে তরুণদের স্বপ্নকে রাজনৈতিক রূপ দিতে এগিয়ে এসেছিল।

তাদের কণ্ঠে ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সাহসী ঘোষণা। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় এনসিপি যে পথে হাঁটছে, তা তাদের জন্মলগ্নের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অনেকের চোখে এটি দলের পতনের সূচনা।

তৃতীয় ধারার স্বপ্ন ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দ্বিমেরু কাঠামো—একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি—প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই দুই মেরুর বাইরে একটি বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা বহুবার দেখা দিয়েছে। এনসিপি সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ছিল। তারা দাবি করেছিল, ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়, বরং গুণগত পরিবর্তনই তাদের লক্ষ্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা তরুণদের আস্থা অর্জন করেছিল।

কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির যে দর্শন তারা প্রচার করেছিল, বাস্তবে তার প্রয়োগে তারা ব্যর্থ হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাতের ঘটনায় এনসিপির নীরবতা, দায়সারা বিবৃতি এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে গেছেন।

জামায়াতের সঙ্গে জোট: আদর্শের বিপরীতে কৌশল

এনসিপির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত—জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া—তাদের আদর্শচ্যুতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এটিকে ‘নির্বাচনি সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার যুক্তি, বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে এক থাকার জন্যই এই পদক্ষেপ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামায়াত একটি ধর্মভিত্তিক ও ডানঘরানার দল, যার সঙ্গে এনসিপির ঘোষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কোনো মিল নেই। এই জোটকে অনেকেই সুবিধাবাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। দলের অভ্যন্তরে ভাঙন, নারীনেত্রীদের পদত্যাগ, এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনের প্রকাশ্য বিরোধিতা প্রমাণ করে যে, তৃণমূলের আবেগ-অনুভূতি নেতৃত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সংকট ও নৈতিক পরাজয়

জোটে যাওয়ার ঘোষণার পর অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা লিখিতভাবে বিরোধিতা করেছেন। নারীনেত্রী তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীন পদত্যাগ করেছেন। এসব ঘটনা এনসিপির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নেতৃত্বের বিচ্ছিন্নতাকে স্পষ্ট করে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম কারিগর মাহফুজ আলমের বক্তব্য থেকে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি এনসিপির অংশ নন এবং জোট থেকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাবও পাননি। বরং তিনি বলেছেন, আদর্শিক অবস্থান বজায় রাখাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার এই অবস্থান এনসিপির নৈতিক পরাজয়কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: পিডিপির ব্যর্থতা ও এনসিপি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থান ও পতনের উদাহরণ নতুন নয়। ২০০৭ সালে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি) গড়ে ওঠে। তারা সুশাসন ও সংস্কারের বুলি আওড়ালেও জনগণের প্রাণের দাবির সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ ছিল না। নির্বাচনের আগেই তাদের জোট ভেঙে যায় এবং দলটি প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

এনসিপির বর্তমান অবস্থান যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, পিডিপি ছিল চাপিয়ে দেওয়া শক্তি, আর এনসিপি জন্ম নিয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে। ফলে এনসিপির ওপর নৈতিক দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। তাদের পদস্খলন কেবল দলীয় ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের বিশ্বাসের অমর্যাদা।

কৌশল বনাম আদর্শ

রাজনীতিতে কৌশল প্রয়োজন, কিন্তু সেই কৌশল যদি মূল আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তা হিতে বিপরীত হয়। এনসিপি আধিপত্যবাদবিরোধী ঐক্যের কথা বললেও, সেই ঐক্যের আড়ালে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জামায়াতের মতো সুসংগঠিত দলের সঙ্গে জোট না করেও এনসিপি হয়তো কিছু আসন পেতে পারত। কিন্তু বিনিময়ে তারা হারিয়েছে সেই স্বকীয়তা, যা তাদের ‘তৃতীয় ধারা’র প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারত।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও পতনের পূর্বাভাস

আখতার হোসেন বা নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সংস্কারের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, জনসমর্থন কেবল জোটের গণিতে আসে না। মাহফুজ আলমের মতো নেতারা যখন বলেন যে বিকল্প তরুণ শক্তির উত্থান অত্যাসন্ন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে এনসিপি আর সেই বিকল্প শক্তির প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে না। তারা এখন কেবল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের ছোট শরিকে পরিণত হতে চলেছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো দল যখন তার মৌলিক আদর্শ ও জন্মের প্রেক্ষাপট বিস্মৃত হয়, তখন সময়ের বিচারে তারা অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত হয়। এনসিপি সেই পথেই হাঁটছে।

এনসিপির জন্ম হয়েছিল রক্তঝরা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। তাদের কণ্ঠে ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় তারা যে পথে হাঁটছে, তা তাদের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জামায়াতের সঙ্গে জোট করে তারা কেবল রাজনৈতিক ভুলই করেনি, বরং তরুণদের হৃদয়ে তাদের যে সম্মানের স্থান ছিল, তা ধূলিসাৎ করেছে।

এনসিপির এই পদক্ষেপকে অনেকেই দলের শেষের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তৃতীয় ধারার স্বপ্নভঙ্গের এই ইতিহাস হয়তো আবারও প্রমাণ করবে যে, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো দল টিকে থাকতে পারে না। এনসিপির পতন তাই কেবল একটি দলের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের বিশ্বাসের লজ্জাজনক পরিসমাপ্তি।

সোমবার, ২৯ডিসেম্বর ২০২৫

 

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড

You might like

About the Author: priyoshomoy