সিরাজগঞ্জ তাড়াশে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির উপকারভোগীদের মাঝে সঞ্চয় ফেরত প্রদান

জিল্লুর রহমান :

সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ ইউনিয়নে সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ সম্পন্ন হয়েছে। ভিডব্লিউবি (ভিজিএফ ফর উইডো, ডেসটিটিউট অ্যান্ড বেসরকারি ভাতা প্রোগ্রাম) কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ফেরত প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করে তাড়াশ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং বাস্তবায়ন করে স্থানীয় উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন এনজিও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সঞ্চয় ফেরত প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন পরিবর্তন এনজিওর অফিসার মোছাঃ রোকসানা।

কর্মসূচির পটভূমি
বাংলাদেশ সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এর মধ্যে ভিডব্লিউবি কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, অসহায় ও দরিদ্র নারীদের মাসিক ভাতা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে তাদের সঞ্চয় করার সুযোগও তৈরি করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে তারা আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী হতে পারেন।

তাড়াশ ইউনিয়নে এই কর্মসূচির আওতায় শতাধিক নারী উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা নিয়মিতভাবে সামান্য অঙ্কের টাকা সঞ্চয় করতেন। দীর্ঘ সময়ের এই সঞ্চয় সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়, যা তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

অনুষ্ঠানের পরিবেশ
সঞ্চয় ফেরত প্রদানের অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় তাড়াশ ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে। সকাল থেকেই উপকারভোগী নারীরা সেখানে উপস্থিত হতে শুরু করেন। অনেকেই শাড়ি পরে, সন্তানদের সঙ্গে এসে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।

পরিবর্তন এনজিওর অফিসার মোছাঃ রোকসানা উপস্থিত নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “এই সঞ্চয় আপনাদেরই পরিশ্রমের ফল। আজকে আপনারা যে অর্থ ফেরত পাচ্ছেন, তা আপনাদের ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে। আশা করি, আপনারা এই অর্থ দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা, গৃহস্থালি কাজে কিংবা সন্তানের শিক্ষায় ব্যয় করবেন।”

তার বক্তব্যে নারীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে হাততালি দেন।

উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যায়—

– রহিমা বেগম, একজন বিধবা নারী, বলেন: “আমি প্রতি মাসে সামান্য করে টাকা জমিয়েছি। আজকে একসাথে এই টাকা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে বড় সম্পদ পেলাম। আমি এই টাকা দিয়ে হাঁস-মুরগি পালন শুরু করব।”

– সালমা খাতুন, স্বামী পরিত্যক্তা, বলেন:“আমার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। এই টাকা দিয়ে তাদের বই-খাতা কিনব। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের মতো অসহায় নারীদের জন্য আশীর্বাদ।”

– জাহানারা খাতুন, আরেকজন উপকারভোগী, বলেন: “আমরা আগে ভাবতাম, ছোট ছোট সঞ্চয় দিয়ে কী হবে? কিন্তু আজকে যখন একসাথে ফেরত পেলাম, তখন বুঝলাম এর মূল্য কত বড়।”

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ভূমিকা
তাড়াশ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি, সঞ্চয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং ফেরত প্রদানের সময় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়নই তাদের মূল লক্ষ্য।

পরিবর্তন এনজিওর অবদান
পরিবর্তন এনজিও দীর্ঘদিন ধরে তাড়াশ এলাকায় নারীর উন্নয়ন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে আসছে। তারা নারীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করে। এই সঞ্চয় ফেরত প্রদানের কার্যক্রমে এনজিওর অফিসার মোছাঃ রোকসানা নেতৃত্ব দেন। তার আন্তরিকতা ও দক্ষতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।

সামাজিক প্রভাব
এই সঞ্চয় ফেরত প্রদানের মাধ্যমে নারীরা শুধু অর্থই পাননি, বরং আত্মবিশ্বাসও অর্জন করেছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন যে ছোট ছোট সঞ্চয় ভবিষ্যতে বড় সহায়ক হতে পারে। অনেকেই পরিকল্পনা করছেন—

– ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করা
– গৃহস্থালি কাজে বিনিয়োগ করা
– সন্তানের শিক্ষায় ব্যয় করা
– চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সংরক্ষণ করা

এভাবে কর্মসূচি নারীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, ভবিষ্যতে আরও নারীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা, ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ ইউনিয়নে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় সঞ্চয় ফেরত প্রদান একটি মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগ। এটি নারীদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করেছে এবং তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তাড়াশ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও পরিবর্তন এনজিওর যৌথ প্রচেষ্টা নারীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।

এই ধরনের উদ্যোগ যদি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়, তবে গ্রামীণ নারীরা শুধু আর্থিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন।

প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy