সম্পাদকীয়: ‘জেন-জিরা’ ও ১৯৭২ সালের সংবিধান বিতর্ক

জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের সাম্প্রতিক মন্তব্য যে ‘জেন-জিরা আর ১৯৭২ সালের সংবিধান চায় না’—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বক্তব্য শুধু একটি প্রজন্মের হতাশা নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

১৯৭২ সালের সংবিধান: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণীত হয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন, যেখানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে মূল স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয়েছিল। সংবিধানটি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে এবং জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

জেন-জিরা: নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি

জেনারেশন জেড বা ‘জেন-জিরা’ হলো সেই প্রজন্ম যারা স্বাধীনতার তিন দশক পর জন্ম নিয়েছে। তাদের দাবি, তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জন্ম নিয়েও প্রকৃত রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোটাধিকার, নিরাপত্তা, এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তারা হতাশ। মাসউদের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, এই প্রজন্ম মনে করে ১৯৭২ সালের সংবিধান তাদের বর্তমান বাস্তবতা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব

মাসউদ সংসদে বলেছেন, জেন-জিরা জানতে চায় কেন তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু একটি প্রজন্মের প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আস্থার সংকট। যদি তরুণ প্রজন্ম মনে করে তাদের অধিকার নিশ্চিত হয়নি, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।

নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতা

মাসউদ আরও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা পতাকা, মানচিত্র ও সীমান্ত পেয়েছি, কিন্তু নিরাপদ বাংলাদেশ পাইনি। নদীভাঙন, রাজনৈতিক সহিংসতা, এবং সামাজিক বৈষম্য তরুণদের হতাশ করেছে। এই বাস্তবতা তাদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে—সংবিধান কি তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছে?

সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

প্রশ্ন উঠছে, সংবিধান কি সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি রাখে? ইতিহাসের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, তবে প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধানকে হালনাগাদ করা জরুরি। তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজে অধিকার, এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান—এসব বিষয় সংবিধানে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

আবদুল হান্নান মাসউদের বক্তব্য হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও সংবিধান নিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, সময়োপযোগী সংস্কার ও তরুণদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথ।

প্রকাশিত : সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy