বৃষ্টিতে ভিজে সীমান্তে ১০ জন, পতাকা বৈঠকেও সমাধান নেই

মোঃ এনামুল হক, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ
পঞ্চগড়ের সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জন মানুষ ৫৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতায় তারা এখনো ভারতের অভ্যন্তরে শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থান করছেন। একাধিক কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও রবিবার ( ৭জুন) দুপুরের পর পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।

সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকায় গত শুক্রবার ভোর থেকে ওই ১০ জন একটি কৃষিজমিতে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে তারা অবস্থান করছেন সেখানে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। খোলা আকাশের নিচে কোনো ধরনের আশ্রয় ছাড়াই তাদের দিন-রাত কটাতে হচ্ছে।

। মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও নারী ও শিশুদের একই স্থানে অবস্থান করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়া থাকায় তাদের শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ওই ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেয়। বিজিবির অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে তারা সীমান্তের শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরেই অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।

ঘটনার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকগুলো থেকে কোনো কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসেনি।

নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডারের সঙ্গে সরাসরি স্পট মিটিং করেছেন এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে ওই ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু বিএসএফ দাবি করেছে, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তাদের গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমরা বিএসএফকে জানিয়েছি, যেহেতু ওই ব্যক্তিরা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন, সেহেতু আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের (আইসিপি) মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো উচিত। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে শূন্যরেখার কাছে ফেলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই ব্যক্তিরা সারারাত বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে কাটিয়েছেন। খাবার ও আশ্রয়ের সংকটে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিষয়টি মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। আমরা বারবার বিএসএফকে তাদের ফেরত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণ করবে না। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের ফেরত পাঠাতে হবে।

আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সীমান্তে জোরপূর্বক পুশ-ইন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

এদিকে টানা ৫০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সীমান্তে আটকে থাকা নারী, পুরুষ ও শিশুদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কোনো সমাধান না হলে প্রতিকূল আবহাওয়া ও খাদ্যসংকট তাদের জন্য আরও বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সীমান্তজুড়ে এখনো উত্তেজনাপূর্ণ কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

প্রকাশিত : রোববার, ০৭ জুন ২০২৬ খ্রি

You might like

About the Author: priyoshomoy