

জিএম মুছা :
বুদ্ধদেব বসু বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশে এর দশকের নতুন কাব্যধারর রীতির সূচনা কারিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত, একজন খ্যাতনামা বাঙালি সাহিত্যিক ও কবি ,একাধারে তিনি কবি প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার সমালোচক এবং একজন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, অতি অল্প বয়স থেকে তিনি কবিতা রচনা সহ ‘প্রগতি’ও ‘কল্লোল’ নামের দুটি পত্রিকার লেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঐ সময় যে কয়জন তরুণ বাঙালি কবি/ লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় তার প্রভাব ও বলায় থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। তাছাড়া বুদ্ধদেব বসু ইংরেজি ভাষায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ রচনা করে ইংল্যান্ড -আমেরিকায় অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

তিনি ১৯০৮ সালের ৩০ শে নভেম্বর কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তার পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা বিক্রমপুরের মালখানা গ্রামে, পিতাঃ ভূদেব বসু পেশায় একজন আইনজীবী তিনি ঢাকা বারের সম্মানিত সদস্য ও প্রখ্যাত আইনজীবী ছিলেন, মাতাঃ বিনায়ক কুমারী বসু একজন সুগৃহিনী ছিলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বুদ্ধদেব বসুর জন্মের মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে তার মাতা, বিনায়ক কুমারী মাত্র ১৬ বছর বয়সে ধনুষ্টংকার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে শোকে দুঃখে স্বামী ভূদেব বসু নিজের পেশা, সংসার, আত্মীয়-স্বজন একমাত্র ছোট্ট অনাথ শিশু বুদ্ধদেব বসুর মায়া মমতা ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করে গৃহত্যাগী হন।
শিশু বুদ্ধদেব বসু তখন তার পুলিশ অফিসার মাতামহ, চিন্তা হরণ ও মাতামহি, স্বর্ণলতার নিকট লালিত পালিত হতে থাকে, তার শৈশব কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় ঢাকা কুমিল্লা এবং নোয়াখালীতে কেটেছে।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯২১ সালে বুদ্ধদেব ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা শহরে দশ বছর যাবত সেখানেই লেখাপড়া করেন, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ১৯২৩ সালে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯২৫ সালে ঐস্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগ সহ পঞ্চম স্থান অধিকার করেন, তৎকালীন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) থেকে আই, এ প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সঙ্গে ইংরেজি বিভাগ থেকে ইংরেজিতে ১৯৩০ সালে প্রথম শ্রেণীতে বিএ অনার্স ও ১৯৩১ সালের প্রথম শ্রেণীতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন, বুদ্ধদেব বসু ছাত্র জীবনে অত্যন্ত প্রখর মেধা সম্পন্ন ছিলেন,
শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনের প্রবেশ মুহুর্তে প্রতিভা রানি সোমের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, বিবাহের পর প্রতিভারানি সোম, স্বামীর বংশগত পদবী প্রতিভা বসু নাম ধারণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে বুদ্ধদেব বসুর কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে তার কর্মময় জীবন শুরু করেন, এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নানা কাজ কর্মের মাধ্যমে নিজেকে ব্যাপকৃত রেখেছিলেন, জীবন জীবিকা অর্জনের জন্য তার মূল পেশা ছিল শিক্ষাগত পেশা, জীবনের শুরুতে স্থানীয় কলেজে লেকচারার পদে জন্য আবেদন করে দুই দুইবার অকৃত হলেও ইংরেজি সাহিত্যে তার অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে, পরিণত বয়সে বুদ্ধদেব বসু, ইউরোপ আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষা শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে দেশ-বিদেশে প্রচুর খ্যাতি অর্জন ও পরিচিতি লাভ করেন।
ওই বাংলা ভাষার তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনার আলোক রশ্মীর তীব্র গতি সঞ্চার করেন, কলকাতা রিপন কলেজে ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন, ঐ সময় তিনি ১৯৫১ সাল পর্যন্ত টেস্টম্যান পত্রিকার সাংবাদিকতা করে যথেষ্ট সুনাম সুখ্যাতি অর্জন করেন, এরপর ১৯৫২ সালে দিল্লি মহীশূরে ইউনেস্কোর প্রকল্প উপদেষ্টা পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।
তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করেন ও ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের পেন্সিলভিনিয়া কলেজ ফর উইমেন ও শিক্ষকতার করেন, পাশাপাশি তিনি উচ্চ মানের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে যথেষ্ট সুনাম সুখ্যাতি লাভ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা কালে তার বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে ঐ সময় ঢাকা পুরানা পল্টন থেকে(১৯২৭- ১৯২৯) সালে ‘প্রগতি’ নামক একটি সচিত্র মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বুদ্ধদেব ও সুজিত দত্তের যৌথ সম্পাদনায় বের হত, তাছাড়া ইতিপূর্বে কল্লোল গোষ্ঠীর সঙ্গে বুদ্ধদেবের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে বিধায় কলকাতায় বসবাস করা কালীন সময়ে তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্রের একান্ত সহযোগিতায় ১৯৩৫ সালে ত্রৈমাসিক কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন, ২৫ বছরের অধিক কাল সময় তিনি ঐ পত্রিকার ১০৪ টি সংখ্যার সম্পাদনা করে ত্রিশ দশকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কাব্য আন্দোলনের যুগপদ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন, শুধুমাত্র তৃতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা থেকে বুদ্ধদেব ও সমর সেন ষষ্ঠ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ছাড়া, বুদ্ধদেব একাই সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার ফলশ্রুতিতে তারই সদিচ্ছায় আধুনিক বাংলা কবিতা যথার্থ আধুনিক রুপ লাভ করে, এটি ছিল বুদ্ধদেব বসুর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। বাংলা ভাষাও কবিতার প্রসার শ্রীবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি কল্পে তার জনপ্রিতাকে অনেকখানি সমৃদ্ধি করে তুলেছিল।
১৯৩৮ সালে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ‘চতুরঙ্গ’ সম্পাদনা করেন বুদ্ধদেব বসু ১৯৪২ সালে ফ্যাসিবাদী বিরোধী শিল্পী ও লেখক সংঘের আন্দোলনে একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন, পঞ্চাশের দশক থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একজন সমর্থকও ছিলেন, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও লেখক বুদ্ধদেব বসুর গদ্য ও পদ্যের রচনাশৈলে নিজস্ব সকিয়তায় স্বতন্ত্র ও চিরভাস্বর হয়ে আছে।
রবীন্দ্র- উত্তর আধুনিক কাব্য ধারার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য, এমনকি গদ্য শিল্পী হিসাবে তার সৃজনশীলতা অনন্য প্রতিভা সমাধিক ও সমুজ্জল হয়ে আছে, তার সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনা পাশাপাশি সমালোচনা মূলক সাহিত্য রচনা আমরা তার মৌলিক ও শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দেখতে পাই। সমালোচনা মূলক সাহিত্যের সাফল্যসহ বুদ্ধদেব বসুর ইংরেজি কাব্য গঠনের কৌশল ছিল সুপ্রসিদ্ধ অনেকখানি পরিমার্জিত পরিশীলিত ও স্বতঃস্ফূর্ততা, বুদ্ধদেব বসুর গদ্যের বৈশিষ্ট্য তেমনি, তার কবিতা ছোট, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক, কাব্য নাটক, সম্পাদনা, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, ভ্রমণ কাহিনী ,শিশু সাহিত্য বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু ১৫৬ টি গ্রন্থ রচনা করেন।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার ক্ষেত্রে যে কয়জনের নাম উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে তিনিই অন্যতম প্রধান, তাকে কল্লোল যুগের প্রধান রূপকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বাংলা কবিতার আধুনিক চিন্তা চেতনা ও রূপ কাঠামো প্রবর্তনের তার গুরুত্ব অপরিসীম। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে তার পাণ্ডিত্য থাকার কারণে ইউরোপ এবং মার্কিন সাহিত্যের রীতিনীতি কলা কৌশল বাংলা সাহিত্যের প্রবর্তনে তার ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। কলকাতায় তার (কবিতা ভবন ) বাড়িটি একসময় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সব শাখায় বুদ্ধদেব বসুর সরল উপস্থিতি তা বলে দেয়, ত্রিশের দশক থেকে পরবর্তী কয়েক দশক সাহিত্য অঙ্গনে তার প্রভাব অনস্বীকার্য।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থঃ মর্ম বাণী, বন্দীর বন্দনা, পৃথিবীর পথে, দময়ন্তি ইত্যাদি, উপন্যাসের মধ্যে যেমনঃ সাড়া, সানন্দা ,লাল মেঘ, বাসর ঘর , গল্পগ্রন্থের মধ্যে যেমনঃ রজনী হলো উতালা, অভিনয়- অভিনয় নয়, রেখাচিত্র ইত্যাদি প্রবন্ধঃ হঠাৎ আলোর ঝলকানি, কালের পুতুল, স্বদেশ ও সংস্কৃতি , নাটকঃ কলকাতার ইলেক্টটা, প্রথম পার্থ, অনুবাদ গ্রন্থঃ কালিদাসের মেঘদুত, বদলেয়ার তার কবিতা, স্মৃতিকথাঃ আমার ছেলেবেলা, আমার যৌবন, সম্পাদনা গ্রন্থঃ আধুনিক বাংলা কবিতা উল্লেখযোগ্য।
বুদ্ধদেব বসু ১৯৬৯ সালে আকাডেমী, ১৯৭০ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন, ১৯৭৪ সালে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কারে তাকে ভূষিত করা হয়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই আধুনিক কবি বুদ্ধদেব বসু ১৯৭৪ সালে ১৮ মার্চ কলকাতায় হৃদয়ে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।।









