চাঁদপুর সদর হাসপাতালে কমিশনখোর দালাল ভরসা করে ঠকছে রোগীরা

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী-চাঁদপুর :
আড়াই শ’ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য কিছুতেই কমছে না; বরং তা আরও বেড়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকেই টার্গেট করা হয় রোগীদের। এরপর ওয়ার্ড পর্যন্ত পিছু নেয় এসব দালাল। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন দালালদের খপ্পরে। রোগী ভর্তি থেকে শুরু করে ওষুধ কিনতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে দালালদের ফাঁদে পড়ছেন রোগীর স্বজনরা।

জানা যায়, হাসপাতালের সামনে এবং ভেতরে ডিউটিরত ডাক্তারদের কক্ষের সামনে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনখোর দালালদের দৌরাত্ম্যে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে রোগীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দুই পাশের প্রবেশ পথ, জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে ঘোরাঘুরি করছে দালালরা। হাসপাতালের প্রায় সব কটি ইউনিটের সামনেই এসব দালালদের অবস্থান।

সাংবাদিক দেখে পালানোর চেষ্টা করে দালালচক্রের সদস্যরা। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে স্বীকার করে তারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কমিশনে কাজ করেন।

প্রতিদিনই হাসপাতালের আউটডোরে যেসব চিকিৎসক রোগী দেখেন, তাদের কক্ষের সামনে থাকে দালালদের উপস্থিতি। কোন রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য ডাক্তার দেখাতে আসলেই পড়ে যান দালালদের খপ্পরে। তারা রোগীর সাথে ছলে-বলে কৌশলে নানা আলাপচারিতায় সখ্যতা গড়ে তোলেন। তারপর চিকিৎসক যদি রোগ নির্ণয়নের জন্য পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন তখন তারা রোগীকে তাদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। বিনিময়ে তারা পেয়ে যান বিভিন্ন অংকের কমিশন।

চিকিৎসা সেবায় বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ

অভিযোগ রয়েছে, অনেক চিকিৎসকও এ অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন আশপাশের অন্তত ১০ টি ডায়াগনস্টিকের ১৫-২০ জন দালালকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এর মধ্যে নারী দালালের সংখ্যাই বেশি। এই নারীরা রোগী সেজে বহির্বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে পড়েন। এরপর চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লেখা শেষ করলেই রোগীর হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে নেন তাঁরা। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের সেসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রতিনিয়ত এসব রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করছে এসব নামসর্বস্ব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এই দালালরা তাদেরই কমিশন ও বেতনভুক্ত। স্থানীয় প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হয়ে কাজ করে। এর বাইরে রয়েছে রিক্সাচালক দালাল। তারা প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালের টিকেট কাউন্টারের সামনে রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। যদি কোন রোগী পরীক্ষার কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন ওই রিক্সাচালক দালালরা এগিয়ে গিয়ে তাদের পছন্দের জায়গায় নিয়ে যায়। বিনিময়ে তারাও পান কয়েক শ’ টাকার কমিশন। ন্যায্যমূল্যে ওষুধ কিনে দেওয়ার কথা বলে রোগীর স্বজনদের নিয়ে যাওয়া হয় নির্দিষ্ট ওষুধের দোকানে। সেখানে আদায় করা হয় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রতিনিয়ত রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে নামসর্বস্ব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।

এ চিত্র এখন চাঁদপুর সরকারি হাসপাতালে প্রতিনিয়ত দেখা মেলে।

অভিযোগও পাওয়া গেছে কোনো কোনো দালাল আবার গ্রাম থেকে আসা নিরক্ষর মানুষজনকে ভুলভাল বুঝিয়ে হাসপাতালের ভেতর পর্যন্ত আসতেই দেন না। বাইরে থেকেই রোগীদের নিয়ে যান বিভিন্ন ক্লিনিকে।

চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে গর্ভধারণজনিত সমস্যা নিয়ে আসা রোগীর স্বামী নাছির মিয়া বলেন, ‘এখানে আসার পর থেকেই দালালরা খুব বিরক্ত করছে। বারবার বলছে, হাসপাতালে ভালো ডাক্তার নাই, চিকিৎসাও নাই।’

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন থেকে আসা আরিফ মিয়া বলেন, ‘শরীর ব্যথার জন্য আব্বাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলাম। ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে প্রেসক্রিপশন করে দেয়ার পর থেকেই দালালরা খুব বিরক্ত করছে।’

শাহনাজ নামের একজন রোগী বলেন, ‘আমি এখানে হাতের ফ্র্যাকচার নিয়ে এসেছি। কিন্তু নার্স বলছে এখানে এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব না। সে একজন দালালকে দেখিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে আসতে বলছে।’

ছোট ভাইকে নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাবিব নামের একজন বলেন, ‘ছোট ভাইকে ডাক্তার দেখিয়ে রুমের বাইরে আসামাত্রই বিভিন্ন ক্লিনিকের দালালরা হাজির হতে থাকে। তারা একেকজন একেক রকমের অফারের কথা বলছে।’

আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও জেলা বিএমএর দুই বারের সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহমুদুন্নবী মাসুম বলেন, ‘এসব বহিরাগত দালালদের বিরুদ্ধে আমরা বহুবার ব্যবস্থা নিয়েছি। পুলিশ এসে ধরে নিলে কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর আবারো শুরু হয় দালালদের দৌরাত্ম। তবে এ বিষয়ে আমরা আবারো ব্যবস্থা নিবো। তবে দালাল পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে মাননীয় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন মহোদয়ের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। আশা করি, খুব শিগগিরই ভালো একটা রেজাল্ট পাওয়া যাবে।’ আমাদের হাসপাতালগুলোতে দালালদের একটি চক্র কাজ করছে এটা ব্যক্তিগতভাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এক্ষেত্রে হাসপাতাল প্রশাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকতে হবে সাধারণ রোগীদেরকে বিভিন্নভাবে সচেতন করা। তারপরেও দুঃখজনকভাবে সাধারণ রোগীরা এই দালালদের বিভিন্ন প্রলোভনে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যেমন দায় রয়েছে একইভাবে আমাদের সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি এর সঙ্গে হাসপাতালের কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনলে এদের সংখ্যা কমে আসবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, হাসপাতালে সার্বক্ষণিক পুলিশ অথবা আনসার সদস্য মোতায়েন ও ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করে নিয়মিত তদারকি করা হলে দালালদের তৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব হবে। দালালদের কারণে সরকার অধিক রাজস্ব হারাচ্ছে।

উল্লেখ্য, আড়াই শ’ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল জেলার ৩০লক্ষ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসার স্থল, প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে অসংখ্য রোগী। সরকারি এই হাসপাতালটিকে কেন্দ্র করে আশেপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসার নামে বাণিজ্যে মেতে উঠেছে তারা। চাঁদপুর সদর হাসপাতালের দালাল চক্রের হাত থেকে রেহাই পেতে প্রশাসনসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছেন ভুক্তভোগী রোগীরা।

You might like