আমি ও মৌমিতা

মিজানুর রহমান রানা : মৌমিতাকে প্রথম দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন। বিশাল ক্যাম্পাস, নতুন মুখ, অচেনা পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যে ওর চোখদুটো ছিল যেন এক আশ্রয়। গভীর, শান্ত, অথচ প্রশ্নে ভরা। আমি তখন সদ্য শহরে আসা এক গ্রাম্য ছেলে, বইয়ের পাতা ছাড়া জীবনের বাস্তবতা খুব একটা দেখা হয়নি। আর মৌমিতা ছিল শহরের মেয়ে, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, কিন্তু ভেতরে যেন এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল।

আমাদের পরিচয়টা হয়েছিল লাইব্রেরিতে। আমি একটা বই খুঁজছিলাম। বইটির নাম “মানুষের অস্তিত্ব”। আর ও হেসে বলেছিল, “তুমি কি সত্যিই পড়বে, না শুধু ভাব দেখাচ্ছ?”

আমি লজ্জা পেয়েছিলাম, কিন্তু ওর হাসিটা ছিল এমন, যেন আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে—নিজেকে খুঁজে বের করার জন্য।

আমাদের পরিচয়ের পর আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে থাকে। ক্লাসের ফাঁকে, ক্যাফেটেরিয়ার চা-আড্ডায়, কিংবা সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের নির্জন কোনায় আমরা কথা বলতাম। মৌমিতা ছিল চিন্তাশীল, সাহসী, আর আমি ছিলাম শ্রোতা। ওর কথায় ছিল সমাজ, দর্শন, প্রেম, বিদ্রোহ—সবকিছু। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম, মৌমিতা শুধু একজন মানুষ নয়, একটা ভাবনা, একটা আন্দোলন।

ও বলত, “তুমি যদি নিজেকে খুঁজে না পাও, তাহলে অন্য কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না।” আমি তখনও নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বে জর্জরিত—নিজের পরিচয়, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ—সবকিছু যেন ধোঁয়াশায় ঢাকা।

একদিন সন্ধ্যায়, ক্যাম্পাসের পেছনের বটগাছের নিচে বসে আমরা চুপচাপ ছিলাম। হঠাৎ মৌমিতা বলল, “তুমি কি কখনও ভালোবাসা নিয়ে ভেবেছো?” আমি বললাম, “ভেবেছি, কিন্তু ভয় পাই।” ও বলল, “ভয় পাওয়াটাই ভালোবাসার শুরু।”

সেই দিন থেকেই আমাদের সম্পর্কের রঙ বদলাতে শুরু করল। আমরা একে অপরের ভেতরের অন্ধকার, আলো, ভয়, আশা—সবকিছু ভাগ করে নিতে শুরু করলাম। মৌমিতা আমার জীবনের আয়না হয়ে উঠল, যেখানে আমি নিজেকে দেখতে শিখলাম।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৌমিতা বদলাতে শুরু করল। ওর চিন্তায় একধরনের তীব্রতা আসতে লাগল। সমাজের অন্যায়, নারীর অধিকার, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু নিয়ে ওর মধ্যে এক অস্থিরতা জন্ম নিল। আমি বুঝতাম, ওর ভেতরে এক যুদ্ধ চলছে, কিন্তু আমি সেই যুদ্ধে অংশ নিতে পারছিলাম না।

একদিন ও বলল, “তুমি আমার পাশে থাকো, কিন্তু আমার লড়াইয়ে নেই।” আমি চুপ করে ছিলাম। আমি ওকে ভালোবাসতাম, কিন্তু ওর মতো করে নয়। আমি চাইতাম শান্তি, ও চাইত যুদ্ধ।

আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে লাগল। মৌমিতা বেশি সময় কাটাতো আন্দোলনের মিটিংয়ে, আমি লাইব্রেরিতে। ওর চোখে আমি হয়ে উঠলাম এক ‘নিরাপদ আশ্রয়’, কিন্তু ওর বিপ্লবের সঙ্গী নই। আমি বুঝতাম, ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, এটা পথচলারও বিষয়। আর আমাদের পথ আলাদা হতে শুরু করেছে।

একদিন ও বলল, “তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো, তাহলে আমার সঙ্গে লড়াই করো।”

আমি তাকে বললাম, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি তোমার মতো নই।”

ও চুপ করে ছিল, তারপর বলল, “তাহলে হয়তো আমাদের ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে একটি চূড়ান্ত বিপ্লব, যা ১৬ বছর ধরে চলছে। কিন্তু তোমার আর আমার ভালোবাসা সেটি থামিয়ে দেবে, তাই আমাদেরকে অবশ্যই দেশের জন্য সত্যিটা বেছে নিতে হবে।”

সেই দিনই আমাদের শেষ দেখা। মৌমিতা চলে গেল বিপ্লবে যোগ দিতে। দেশের জন্য কিছু করতে।

আর আমি থেকে গেলাম—একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে, বইয়ের মধ্যে, স্মৃতির মধ্যে। ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে।

ওর চলে যাওয়ার পর আমি অনেকবার ভেবেছি, আমরা কি ভুল করেছিলাম? নাকি সময় আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল? মৌমিতা আমার জীবনে এক অধ্যায়, যা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি পাতায় ওর ছাপ রয়ে গেছে।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এক সাহিত্য সম্মেলনে ওকে আবার দেখি। ওর চোখে সেই আগুন, কিন্তু মুখে একধরনের শান্তি। আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি।

ও বলে, “তুমি এখনো দর্শন পড়াও?”

আমি বলি, “হ্যাঁ, এখনো অস্তিত্ব খুঁজি।”

ও হাসে, “তুমি এখনো ভয় পাও?”

আমি বলি, “ভয় পাই, কিন্তু এখন ভয়কে বুঝি।”

আমরা জানি, আমরা আবার এক হব না। কিন্তু আমাদের গল্পটা শেষ নয়। এটা একটা চলমান অধ্যায়, যেখানে আমি ও মৌমিতা—দুজনেই নিজেদের পথ খুঁজে নিচ্ছি।

আমি জানি, আমরা সবাই জীবনে এমন কাউকে পাই, যে আমাদের বদলে দেয়, আমাদের আয়না দেখায়। মৌমিতা আমার সেই আয়না, সেই প্রশ্ন, সেই আলো।

ভালোবাসা সবসময় একসঙ্গে থাকার নাম নয়, কখনও কখনও এটা একজনকে নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করার নাম।

যদি আবারও কখনও মৌমিতার দেখা পাই, হয়তো সে হবে অন্যরকম, আর আমি আমার মতোই থেকে যাবো, জীবনের এক কঠিন অধ্যায়ে। আর কাউকে এভাবে ভাবতে পারবো কিনা জানি না, তবে আমার মনে হয় জীবন তো একটাই, এই জনমে হয়তো এমন আরও কোনো মৌমিতার দেখা পাবো, হয়তো সে বিপ্লবী হবে না, ঘর সাজাবে, আমাকে সাজাবে আর আমার জীবনটা রঙের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দিবে।

শুক্রবার, ০১ আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy