

মিজানুর রহমান রানা :
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এক ছোট্ট গ্রাম—শিবনগর। ধানক্ষেত, কাঁঠাল গাছ, আর মাটির ঘরে ঘেরা এই গ্রাম যেন প্রকৃতির কোলে শুয়ে থাকা এক নিঃশব্দ কবিতা। এখানেই জন্ম ইরফানের। গ্রামের একমাত্র কলেজে অনার্স পড়ছে সে। স্বপ্ন দেখে একদিন গ্রামকে বদলে দেবে—অশিক্ষা, দারিদ্র্য আর কুসংস্কারের শিকল ভেঙে গড়ে তুলবে এক নতুন শিবনগর।

তামান্না, একই গ্রামের মেয়ে। ইরফানের ছোটবেলার বন্ধু, পরে প্রেমিকা। তামান্না ছিল অন্যরকম—চোখে ছিল আগুন, মুখে ছিল সাহস। সে চেয়েছিল মেয়েদের জন্য একটা পাঠশালা, যেখানে তারা শুধু বই পড়বে না, শিখবে নিজের অধিকার, নিজের স্বপ্ন।
তাদের প্রেম ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। গ্রামের মানুষ মুখে কিছু না বললেও চোখে চোখে রাখত। কারণ, তামান্না ছিল সেই মেয়েদের একজন, যারা বিয়ের আগে প্রেম করে না—এমনটাই বিশ্বাস ছিল সমাজের।
শিবনগরে এক ভয়াবহ সমস্যা ছিল—বাল্যবিবাহ। ১৫-১৬ বছরের মেয়েদের স্কুল থেকে তুলে এনে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। তামান্না এই প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সে নিজের ছোট বোনের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে দিয়েছিল, আর সেই থেকেই তার বিরুদ্ধে শুরু হয় সামাজিক প্রতিরোধ।
একদিন, তামান্না ইরফানকে ডেকে বলল, “ইরফান, আমি জানি আমাদের প্রেম হয়তো সমাজ মেনে নেবে না। কিন্তু আমি চাই, তুমি আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করো।”
“কি ইচ্ছা?”
“আমি চাই, একটা স্কুল হোক মেয়েদের জন্য। যেখানে তারা শুধু পড়বে না, শিখবে কিভাবে সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়।”
ইরফান চুপ করে ছিল। সে জানত, এই ইচ্ছা পূরণ করতে গেলে তাকে শুধু প্রেমিক নয়, হতে হবে যোদ্ধা।
তামান্নার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করে ফেলল। পাত্র—এক প্রবাসী, যার বয়স তামান্নার চেয়ে দ্বিগুণ। তামান্না প্রতিবাদ করল, কিন্তু তার কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল পরিবারের সম্মান আর সমাজের নিয়মে।
বিয়ের আগের রাতে, তামান্না ইরফানকে চিঠি লিখে গেল. “ইরফান, আমি জানি তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু তুমি পারবে আমার স্বপ্নটাকে বাঁচাতে। যদি কখনো আমাকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে আমার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করো। একটা স্কুল গড়ো, যেখানে মেয়েরা সাহস শিখবে, স্বপ্ন দেখতে শিখবে।”
পরদিন সকালে, তামান্নাকে পাওয়া গেল না। সে চলে গিয়েছিল নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে না করে, নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছিল।
তামান্নার মৃত্যু গ্রামে ঝড় তুলল। কেউ বলল, সে পাপ করেছে। কেউ বলল, সে সাহস দেখিয়েছে। কিন্তু ইরফান চুপ করে ছিল না। সে তামান্নার চিঠি হাতে নিয়ে গেল ইউনিয়ন পরিষদে, গেল এনজিও অফিসে, গেল কলেজের শিক্ষকদের কাছে।
তামান্নার নামে “তামান্না নারী শিক্ষা কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা হলো। প্রথমে মাত্র ৫ জন ছাত্রী, পরে ৫০, তারপর ২০০। মেয়েরা সেখানে শুধু পড়তে আসত না, শিখত আত্মরক্ষা, আইনের জ্ঞান, এবং নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরার কৌশল।
ইরফান নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুল চালাত। সে জানত, তামান্না নেই, কিন্তু তার ইচ্ছা আছে। আর সেই ইচ্ছা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
তামান্নার স্কুল ধীরে ধীরে বদলে দিল শিবনগরকে। বাল্যবিবাহ কমে গেল, মেয়েরা কলেজে ভর্তি হতে শুরু করল। কেউ কেউ শহরে গিয়ে চাকরি পেল, কেউ গ্রামে থেকেই শিক্ষক হলো।
একদিন, তামান্নার মা এসে ইরফানকে বলল, “তুমি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারো না, কিন্তু তুমি তার আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছো। আমি গর্বিত।”
ইরফান তাকিয়ে ছিল স্কুলের দেয়ালে ঝুলে থাকা তামান্নার ছবির দিকে। ছবির নিচে লেখা ছিল “স্বপ্ন দেখে যাও, যতদিন না সমাজ বদলায়।”
সে ভাবে, তামান্না হয়তো চলে গেছে, কিন্তু তার ইচ্ছা বেঁচে আছে শত শত মেয়ের চোখে, যারা আজ সাহস করে, স্বপ্ন দেখে।
ইরফান আজও তামান্নার স্কুলে যায়, প্রতিদিন নতুন মেয়েদের চোখে খুঁজে ফেরে সেই আগুন, সেই সাহস। কারণ, প্রেম শুধু হৃদয়ের বিষয় নয়—প্রেম হতে পারে সমাজ বদলের শক্তি।
রোববার, ০৩ আগস্ট ২০২৫ খ্রি. ১৮ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন











