

মিজানুর রহমান রানা :
চট্টগ্রামের এক প্রাচীন গ্রাম—চরপাড়া। বহু শতাব্দী পেরিয়ে আসা এই গ্রামে আছে একটি পুরাণ দিঘী, যার নাম কালদিঘী। লোকমুখে শোনা যায়, প্রায় একশো বছর আগে এক কিশোরী—নাম ছিল তার রূপা—এই দিঘীতে পড়ে মারা যায়। কেউ বলে, সে আত্মহত্যা করেছিল, কেউ বলে তাকে কেউ ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর থেকেই দিঘীটি হয়ে ওঠে রহস্যময়।
গ্রামের মানুষ বলে, সন্ধ্যার পর কেউ যদি দিঘীর পাড়ে যায়, সে দেখতে পায় এক মেয়েকে সাদা জামা, ভেজা চুল, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে হাত বাড়িয়ে বলে, “আয়, কাছে আয়।”

যারা তার ডাকে সাড়া দেয়, তারা আর ফিরে আসে না। কেউ কেউ বলে, তারা রাতে মেয়েটির কণ্ঠ শুনেছে, কেউ বলে তার ছায়া দেখেছে। কিন্তু কেউই সাহস করে সত্যটা জানার চেষ্টা করেনি।
ইরফান ছিল একজন তরুণ সাংবাদিক, আর তামান্না একজন সমাজবিজ্ঞানী। তারা দুজনেই শহর থেকে এসেছিল গ্রামে, লোককথা নিয়ে গবেষণা করতে। কালদিঘীর গল্প শুনে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।
তারা ঠিক করে, পূর্ণিমার রাতে, যখন দিঘীর জল রূপালী হয়ে ওঠে, তখন তারা সেখানে যাবে।
পূর্ণিমার রাত, তখন প্রায় দশটা বাজে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দিঘীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ইরফান ও তামান্না। হঠাৎ বাতাস থেমে যায়। জল স্থির। আর তখনই তারা দেখতে পায় দিঘীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে। তার চোখে জল, মুখে হাসি, আর হাত বাড়িয়ে বলছে, “আয়, কাছে আয়।”
তামান্না কাঁপতে কাঁপতে বলে, “ওটা কি! রূপা?”
ইরফান ক্যামেরা তোলে, কিন্তু ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়ে না।
মেয়েটি আবার বলে, “তুমি তো আমাকে খুঁজতে এসেছো? আয়।”
তামান্না হঠাৎ যেন সম্মোহিত হয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। ইরফান চিৎকার করে, “তামান্না! থামো!”
কিন্তু সে থামে না। সে দিঘীর দিকে এগিয়ে যায়, আর হঠাৎই জলের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
ইরফান ছুটে যায়, কিন্তু দিঘীর জল তখন গভীর অন্ধকারে রূপ নেয়। সে কিছুই দেখতে পায় না।
তখনই তার পেছনে কণ্ঠ ভেসে আসে, “তুমি তো ওকে ভালোবাসো, আয়…”
ইরফান ঘুরে দাঁড়ায়। মেয়েটি তার সামনে। কিন্তু এবার তার চোখে রক্ত, মুখে বিকৃত হাসি।
“তুমি ওকে ফেরত চাও? তবে তোমাকেও দিতে হবে…”
ইরফান বুঝতে পারে, এই দিঘী শুধু একটি জলাশয় নয়, এটি হয়তো একটি আত্মার আবাস। রূপা শুধু একটি আত্মা নয়, সে এক অভিশপ্ত আত্মা, যে ভালোবাসা চায়, সঙ্গ চায়, আর তার ডাকে সাড়া দিলেই সে আত্মাকে বন্দী করে রাখে।
ইরফান দৌড়ে পালাতে চায়, কিন্তু পা যেন জমে যায়।
তখনই সে মনে করে, রূপার মৃত্যুর গল্পে বলা হয়েছিল, সে প্রেমে প্রতারিত হয়েছিল। হয়তো সে এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে।
ইরফান বলে, “তুমি যা চাও, আমি দেবো, শুধু তামান্নাকে ফেরত দাও।”
মেয়েটি হাসে, “তুমি সত্যিই ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ,” ইরফান কাঁপা গলায় বলে।
হঠাৎ দিঘীর জল আলো ছড়াতে থাকে। তামান্না ভেসে ওঠে, অজ্ঞান অবস্থায়।
মেয়েটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, তার মুখে এক শান্তির ছায়া।
ইরফান তামান্নাকে টেনে তোলে। তারা দুজনেই দিঘীর পাড়ে বসে থাকে, নিঃশব্দে।
তামান্না ধীরে ধীরে চোখ খুলে বলে, “আমি ওর চোখে এক অদ্ভুত দুঃখ দেখেছি, যেন সে শুধু ভালোবাসা চাইছিল.।”
ইরফান ও তামান্না ফিরে আসে শহরে। তারা গল্পটি লেখে, কিন্তু শেষ অংশটি কেউ বিশ্বাস করে না।
তারা জানে, কালদিঘী এখনো আছে, রূপা এখনো আছে, আর তার ডাক এখনো ভেসে আসে, “আয়… কাছে আয়…”
কিন্তু তারা জানে, ভালোবাসা কখনো কখনো অভিশাপ হয়ে ওঠে, যদি তা প্রতারণায় ভরে থাকে।
ইরফান বাস্তবতায় ফিরে আসে কিন্তু তামান্না ধীরে ধীরে চোখ খুলে বলে, “আমি ওর চোখে এক অদ্ভুত দুঃখ দেখেছি যেন সে শুধু ভালোবাসা চাইছিল।”
ইরফান তার হাত ধরে বলে, “তুমি এখন নিরাপদ। আমরা ফিরে যাবো।”
তারা শহরে ফিরে আসে। ইরফান গল্পটি লেখে, তামান্না তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে। কিন্তু কিছুদিন পর, তামান্নার আচরণ বদলে যেতে থাকে।
সে গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে দিঘীর দিকে তাকিয়ে থাকে, যদিও তারা এখন শহরে। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, মুখে এক বিকৃত হাসি।
ইরফান এক রাতে তাকে জিজ্ঞেস করে, “তামান্না, তুমি ঠিক আছো তো?”
তামান্না ধীরে ধীরে বলে, “তুমি তো বলেছিলে আমাকে ভালোবাসো, তাই না?”
ইরফান চমকে ওঠে, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কিন্তু তুমি এমন বলছো কেন?”
তামান্না তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তাহলে আয়, কাছে আয়…”
ইরফান বুঝতে পারে—তামান্না ফিরে এলেও, সে আর আগের তামান্না নেই। রূপা তার দেহে প্রবেশ করেছে।
তামান্না এখন রূপা। আর রূপা এখন শহরে।
কালদিঘী শুধু আত্মাকে বন্দী করে না, সে আত্মাকে মুক্ত করেও পাঠায়, নতুন শরীরে, নতুন শহরে।
একদিন হঠাৎ করেই ইরফান নিখোঁজ হয়। তামান্না অথবা রূপা নতুন শহরে, নতুন শিকার খুঁজছে। আর তার কণ্ঠ এখনো ভেসে আসে, “আয়, কাছে আয়।”
মঙ্গলবার, ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২০ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
মঙ্গলবার, ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২০ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ












