

মিজানুর রহমান রানা :
দিন শেষে সূর্যটা ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে আকাশের মানসপটে মানুষের হৃদয়ে মুছতে থাকে, আর বলয়ের বিপরীতে আগমন ঘটতে থাকে। মানুষের চিন্তাধারাও ঠিক তেমনি। কখনও মুছে যায় আবারও কখনও ভেসে উঠে। মানুষ মাঝে মাঝে পরিশ্রান্ত হয়ে বিশ্রাম চায়, কেউ কেউ আবার দূরে কোথায়ও হারিয়ে যেতে পছন্দ করে। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। এতে মানুষের হাওয়া বদলে হৃদয় মন সঙ্কীর্ণতার বেড়াজাল থেকে অধরা বসন্তে উপনীত হয়।

আনিকা ও ইরফান। এরাও এমন হয়ে যে, তারাও দীর্ঘদিনের কাজের ক্লান্তি শেষে একটা ভ্রমণ পরিকল্পনা করে।
দুজনেই শহরের কোলাহল থেকে দূরে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক পাহাড়ি এলাকায় ছুটি কাটাতে যায়। তারা অনেক ঘুরেফিরে একটি হোটেল পছন্দ করে।
হোটেলটি ছিল পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে মেঘ এসে জানালায় ধাক্কা দেয়, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাইন গাছের গন্ধ। তাদের মনে হয় এ যেনো প্রকৃতির ভূস্বর্গ, এখানে বেশি কিছুদিন কাটাতে পারলে জীবনের নিরানন্দ ভাবটা ঘুছে যাবে।
সারাদিন তারা ঘুরেছে—ঝর্ণার ধারে, স্থানীয় গ্রামে, আর পাহাড়ি পথ ধরে। ক্লান্ত হয়ে রাতে হোটেলের কাঠের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। বাইরে তখনও মেঘ জমছিল, যেন প্রকৃতি কিছু বলতে চাইছে।
তাদের মনে হলো এটা যেনো মেঘ নয়, ঘণ বরষা। বেশ উপভোগ্য একটি স্থান। আবহাওয়ায়ও বেশ চমকপ্রদ। বাংলাদেশে এমটা সচরাচর চোখে পড়েনি।
আনিকা ইরফানের পাশে শুয়ে আছে, আর ভাবছে তাদের পরিচয়ের সেই রোমান্টিক কথাগুলো। ভাবতে ভাবতে তার হঠাৎ করেই হাসি পেয়ে যায়। সে হাসতে থাকে।
ইরফান আশ্চর্য হয়ে বলে, “নারীর মন বুঝা দায়। কখন যে হাসে, আর কখন যে কাঁদে তা বুঝা কঠিন।”
আনিকা হাসি থামিয়ে উত্তর দেয়, “ইরফান, তোমার মনে আছে সেই আশ্চর্য দিঘির কথা, যেখানে তুমি আর অনন্যা গিয়েছিলে। তারপর তাকে হারিয়ে ফেললে, সেও পরে ভূত হয়ে গিয়েছিলো। এটা বিশ্বাস করতেই আমার হাসি পাচ্ছে।’
ইরফান ভাবতে থাকে, যাকেই সে জীবনে গভীরভাবে ধরতে চায় তাকেই সে হারায়। এটা আনিকা বুঝবে না। ইরফানের জীবনে কত নারী এসেছে, কিন্তু কাউকেই সে ধরে রাখতে পারেনি। নিজের দোষে নয়, প্রকৃতির ইচ্ছায়। কতো কতো অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেছে তার জীবনে।
রাত প্রায় তিনটা। হঠাৎ এক বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ইরফানের। মাটি কাঁপছে। জানালার বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তারপরই শুরু হয় মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি—প্রচণ্ড, অপ্রতিরোধ্য।
হোটেলের কাঠের কাঠামো টিকতে পারেনি। এক মুহূর্তে সবকিছু ভেঙে পড়ে। আনিকা ও ইরফান ছিটকে পড়ে পাশের ঢালে। ভাগ্যক্রমে, তারা গাছের ঝোপে আটকে যায়—আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে যায়।
ভোরের আলো ফুটতেই তারা বুঝতে পারে, তারা পাহাড়ের নিচের দিকে অনেকটা নেমে গেছে। হোটেল ধ্বংস, মোবাইল নেই, আশেপাশে কেউ নেই। চারদিকে কুয়াশা আর ভেজা পাথর।
আনিকা আহত, হাঁটতে কষ্ট হয়। ইরফান তার কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে চলে। তারা জানে, পাহাড়ে বাঁচতে হলে নিচের গ্রামে পৌঁছাতে হবে।
বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু পথ ভেজা, পিচ্ছিল। তারা এক ঝর্ণার ধারে এসে থামে। ইরফান পাতা দিয়ে পানি এনে আনিকাকে দেয়। দুজনেই ক্লান্ত, কিন্তু হাল ছাড়ে না।
পথে তারা দেখে ভাঙা গাছ, ধসে পড়া পাথর, আর এক জায়গায় একটি পুরনো মন্দির। সেখানে তারা আশ্রয় নেয় কিছুক্ষণ। মন্দিরের ভেতরে একটি শিলালিপি—“প্রকৃতি ধ্বংস করে, আবার গড়ে তোলে।”
এই বাক্যটি তাদের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।
এই বিপর্যয়ের মাঝে, আনিকা ও ইরফান নিজেদের সম্পর্ককে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। শহরের ব্যস্ত জীবনে তারা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছিল—ভালোবাসার গভীরতা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা।
আনিকা বলে, “এই পাহাড় আমাদের ভেঙে দিয়েছে, আবার গড়েও তুলছে।”
ইরফান হাসে, “আমরা যদি প্রকৃতির অংশ হই, তাহলে আমাদেরও গড়ার ক্ষমতা আছে।”
তিন দিন পর, তারা এক পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছায়। স্থানীয়রা তাদের দেখে অবাক হয়। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল আসে। তারা জানায়, হোটেল ধ্বংসের খবর ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু কেউ জানত না তারা বেঁচে আছে।
আনিকা ও ইরফান ফিরে যায় শহরে, কিন্তু তাদের ভেতরে কিছু বদলে গেছে।
ফিরে এসে তারা একটি প্রকৃতি ও দুর্যোগ সচেতনতা বিষয়ক প্রজেক্ট শুরু করে। তারা পাহাড়ি অঞ্চলে টেকসই হোটেল নির্মাণ, স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ, এবং পর্যটকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করে।
তাদের অভিজ্ঞতা একটি বইয়ে রূপ নেয় “মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি”—যেখানে তারা লেখে, “প্রকৃতি আমাদের ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্যেই আমরা নিজেদের খুঁজে পেয়েছি।”
মঙ্গলবার, ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২০ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন












