কুয়োর নিচে কেউ আছে!

মিজানুর রহমান রানা :

চন্দ্রপুর। পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট এক গ্রাম। সময় এখানে যেন থেমে আছে যেনো। গ্রামের মানুষজন সরল, কিন্তু অতীতের কিছু ঘটনা তাদের চোখে ভয় ছড়িয়ে রেখেছে।

একদিন, হঠাৎ এক বহিরাগত এসে হাজির হয়। তার নাম ইরফান। ঢাকা থেকে এসেছে, লোককথা নিয়ে গবেষণা করতে। সে গ্রামের এক পুরনো জমিদারবাড়িতে ওঠে, যার পেছনে আছে একটি পুরনো কুয়ো—যেটা নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।

ইরফান কৌতূহলী।

তার সাথে আছে সাংবাদিক তুষার আহমেদ। সে জানতে চায়, “এই কুয়োটা নিয়ে এত ভয় কেন?”
কিন্তু সবাই চুপ। শুধু একজন তমা, গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা—তার চোখে কৌতূহল আর সতর্কতা।

তমা প্রথমে ইরফানকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু ইরফানের জিজ্ঞাসা, তার সাহস, আর চোখের গভীরতা তাকে টানে।

একদিন, ইরফান তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি জানো, এই কুয়োটা নিয়ে কী গল্প আছে?”

তমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “আমার দাদী বলতেন, এই কুয়োর নিচে কেউ আছে। রাতের বেলা নাম ধরে ডাকতো, যারা সেই ডাক শুনে কাছে যেত, তারা আর ফিরতো না।”

ইরফান হাসে, “লোককথা তো! আমি খুঁজে বের করবো সত্যি কী।” তুষার আহমেদও চিন্তায় মগ্ন। সে ভাবছে আসলেই কি তাই, এ বিজ্ঞানের যুগে মানুষ এগুলোও কি বিশ্বাস করে?

সে তমাকে প্রশ্ন করে, “এগুলো কি আসলেই সত্যি, নাকি কোনো লোকগাঁথা?”

তমা বলে, “সত্যি খুঁজতে গিয়ে অনেকেই হারিয়ে গেছে। আর আপনারাও হয়তো এই সত্যিতে হারিয়ে যেতে পারেন।”

তুষার প্রশ্ন করে, “আপনি কি আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছেন? আমি একজন সাংবাদিক। জীবনে অনেক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়েছে, লিখেছি পত্রিকার পাতায়। সত্য উদ্ঘাটন করেছি। আসলেই যদি এখানে অদ্ভুত কিছু থেকে থাকে, তাহলে সত্যিটাই বলুন। মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না।”

ইরফান ও তুষার আহমেদ দু’জন মিলে কুয়োর চারপাশে ক্যামেরা বসায়। রাতের বেলা শব্দ রেকর্ড করে। প্রথম কয়েকদিন কিছুই পাওয়া যায় না।

তারপর এক রাতে, ক্যামেরায় ধরা পড়ে একটি ছায়া। কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে, তারপর হঠাৎ অদৃশ্য।

পরদিন সকালে, গ্রামের একজন বৃদ্ধ নিখোঁজ। এরপর শুরু হয় একের পর এক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কিত। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।

ইরফান আর তুষার আরও গভীরে খোঁজে। তারা পুরনো নথি ঘেঁটে জানতে পারে, এই কুয়ো একসময় ছিল তান্ত্রিকদের আখড়া। তারা বিশ্বাস করতো, কুয়োর নিচে আছে অন্তঃশব্দ, যা এক শক্তি, মানুষের ভয়কে টেনে নেয়।

তমা এক রাতে ইরফানকে বলে, “আমি একবার সেই কুয়োর পাশে গিয়েছিলাম। আমি শুনেছিলাম আমার ছোট ভাইয়ের গলা, যে বছর পাঁচেক আগে হারিয়ে গেছে। আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুই পাইনি।  তখন থেকেই আমি জানি, কুয়োর নিচে কেউ আছে। কিন্তু সে মানুষ নয়।”

ইরফান চুপ করে থাকে। তার চোখে ভয়, কিন্তু সেই ভয়কে জয় করার আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু তুষার এসবে ভয় পায় না, এর চেয়ে ঢের দেখেছে সে। সে ভাবছে, কীভাবে এই রহস্যের সীমানায় পৌঁছা যায়, যা আসলেই সত্য বা মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

ইরফান সিদ্ধান্ত নেয়, সে তুষারকে নিয়ে কুয়োর নিচে নামবে।

তমা বাধা দেয়, “তুমি যা করছো, সেটা বিপজ্জনক।”

ইরফান বলে, “আমি জানি, কিন্তু আমি থামবো না।”

অনেক জোরাজুরিতে এক রাতে তমা তাকে সাহায্য করে—দড়ি, আলো, রেকর্ডার।

ইরফান ও তুষার নিচে নামে। কুয়োর নিচে তারা দেখে একটি প্রাচীন গুহা। সেই গুহার দেয়ালে আঁকা অদ্ভুত সব চিত্র, মানুষের মুখ, ছায়া, আর এক অদ্ভুত প্রতীক।

হঠাৎ, তুষারের রেকর্ডারে ভেসে আসে তমার গলা, “ইরফান… ফিরে এসো…।”

কিন্তু তমা তো উপরে ছিল! ভাবছে তুষার, এ কেমন করে হয়!

ইরফান তুষারকে নিয়ে ওই গুহার গভীরে আরও এগোয়। তারা জায়গায় সে দেখে, একটি পাথরের বেদি, আর তার উপর রাখা একটি অদ্ভুত আয়না।

তারা আয়নায় তাকায় কিন্তু নিজেদেরকে দেখে না। বরং দেখে তাদের ভয়, তার স্মৃতি, তার অপরাধবোধ।

এ সময় হঠাৎ করে ওই আয়নার ভেতর থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর, “তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, কে আমি?”

ইরফান চিৎকার করে উঠে, “তুমি কে বলো আমাদেরকে?”

কণ্ঠস্বর বলে, “আমি সেই ভয়, যা মানুষ লুকিয়ে রাখে। আমি সেই স্মৃতি, যা মানুষ ভুলতে চায়। আমি সেই ডাক, যা মানুষ শুনে ফেলে।”

তুষার প্রশ্ন করে, “তুমি আসলে কিছুই নও। তুমি আমাদের মনের কল্পনা মাত্র। আমরা যা ভাবি, চিন্তা করি তুমি তার ফসল। আমরা তোমাকে ভয় পাই না।”

তমা উপরে দাঁড়িয়ে, দড়ি ধরে রাখে। হঠাৎ সে অনুভব করে, দড়ি টানছে কেউ—কিন্তু সেটা ইরফান বা তুষার কেউ নয়।

সে চিৎকার করে, “ইরফান! তুষার তুমি কি শুনতে পাচ্ছো?”

কোনো উত্তর নেই।  তমা সাহস করে, নিজেই নিচে নামে।

গুহায় সে ইরফানকে খুঁজে পায় কিন্তু সাথে তুষার আহমেদ নেই।
শুধু ইরফান আয়নার সামনে বসে আছে, চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। তমা তাকে জড়িয়ে ধরে, “তুমি ফিরে এসো! আমি এখানে আছি!”

ইরফান ধীরে ধীরে চোখ মেলে। সে বলে, “আমি দেখেছ, আমার ভেতরের অন্ধকার। কিন্তু তুমি, তুমি আলো। আর তুষার কোথায়? তাকে দেখছি না যে!”

তমা ইরফানকে নিয়ে উপরে ওঠে। গ্রামের মানুষজন অবাক। কুয়োর চারপাশে তারা জড়ো হয়।

ইরফান বলে, “এই কুয়ো শুধু ভয় নয়, এটা আমাদের ভেতরের প্রতিচ্ছবি। যদি আমরা সাহস করি, তাহলে আমরা মুক্ত হতে পারি।”

তমা প্রশ্ন করে, “তাহলে তুষার কোথায়?”

ইরফান কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু তমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাত হয়, তমা ইরফানকে নিয়ে তাদের বাড়িতে উঠে। ইরফানকে খেতে দেয়। কিন্তু ইরফান ভাবছে হঠাৎ করে তুষার নিখোঁজ হয়ে গেলো কেন?

এসব বিষয় প্রচার হয়ে যায়। তুষার নিখোঁজ। গ্রামের মানুষজনকে ধীরে ধীরে কুয়োর ভয় আরও বেশি করে পেয়ে বসে। তুষারকে সবাই মিলে খোঁজে, কিন্তু এক সপ্তাহ খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সবাই মনে করে তুষার অন্যদের মতোই নিখোঁজ হয়ে গেছে, আর ফিরে আসবে না।

তুষার আহমেদ নিখোঁজ। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কিত। কেউ কেউ বলে, “সে অন্তঃশব্দের শিকার।”

কেউ আবার বলে, “সে হয়তো সত্যি খুঁজে পেয়েছে, আর ফিরে আসবে না।”

ইরফান চুপ। তমা তার পাশে থাকে, কিন্তু ইরফান যেন অন্য জগতে চলে গেছে। সে বারবার আয়নার কথা ভাবে, আর তুষারের শেষ কথাগুলো : “তুমি কিছুই নও… তুমি আমাদের কল্পনা…।”

অষ্টম দিন। এক সকালে, গ্রামের বাজারে হঠাৎ একজনকে দেখা যায়, মলিন পোশাক, ধুলোয় ভরা মুখ, কিন্তু চোখে অদ্ভুত স্থিরতা। সে তুষার আহমেদ।

গ্রামের মানুষজন ছুটে যায়,  কেউ জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোথায় ছিলে?”
তুষার শুধু বলে, “আমি ছিলাম আয়নার পেছনে।”

ইরফান খবরটা পেয়ে যায়। সে দ্রুত তমাকে নিয়ে তুষার আহমেদের কাছে যায়। তুষারকে দেখে অবাক। সে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কীভাবে ফিরে এলে?”

তুষার বলে, “আমি গুহার ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলাম না, আমি গিয়েছিলাম নিজের ভেতরে। আয়নার পেছনে ছিল আমার স্মৃতি, আমার ভয়, আমার অপরাধবোধ। আমি দেখেছি, আমি যা লুকিয়ে রেখেছিলাম।”

তমা বলে, “তুমি কি এখন মুক্ত?”

তুষার হাসে, “মুক্তি আসে না, শুধু উপলব্ধি আসে। আমি এখন জানি, আমরা যা ভয় পাই, তা আমাদেরই সৃষ্টি।”

ইরফান, তমা, আর তুষার মিলে সিদ্ধান্ত নেয় : এই কুয়ো আর গুহা নিয়ে তারা লিখবে।
একটি বই, একটি তথ্যচিত্র, যেখানে থাকবে মানুষের ভেতরের অন্ধকারের গল্প।

তুষার বলে, “এই কুয়ো শুধু এক রহস্য নয়, এটা এক আয়না : যেখানে মানুষ নিজেকে দেখে।”

তার তার পত্রিকায় বিশাল এক সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদে গ্রামের মানুষজন ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে ওঠে। কুয়োর চারপাশে গড়ে ওঠে এক ছোট্ট স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে লেখা থাকে: “ভয়কে জয় করো, কারণ সে তোমারই ছায়া।”

হঠাৎ করেই সেই গুহায় বিজলী চমকায়। ধোঁয়া উঠে। আর গোঁ গোঁ আওয়াজের শব্দ শোনা যেতে থাকে। মানুষজন ইরফান ও তুষারের কাছে আসে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে চায় কেন এমনটা হয়?

তুষার হাসে। তারপর বলে, “আপনারা আগ্নেয়গিরির লাভা দেখেছেন? যখন লাভাগুলো বের হয় আসে তখন কি ধোঁয়া উঠে না? আওয়াজ হয় না? এখানে এই গুহায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস জমে আছে। মাঝে মাঝে গ্যাসের আবরণ বেশি হয়ে গেলে এ ধরনের কাণ্ড হয়। আর মানুষ ভাবে এটা কোনো অলৌকিক বিষয়। আর যারা ওই গুহায় হারিয়ে যায়, তারাও মূলত গ্যাসের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এরপর তার দেহটা নিঃশেষ হয়ে যায়। মানুষ ভয়ে আর সেখানে গিয়ে সত্যতা যাছাই করতে পারে না। শুধু শুধু ভয়ে দূরে সরে যায়। আমি ওই গুহায় ছিলাম আমি গ্যাসের বিষয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম, তাই আমার সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিলো বলে আমি ক’দিন সেখানে থেকে সব বিষয় পরিষ্কার ধারণা নিয়ে এসেছি। আপনারা ভয় পাবেন না। অলৌকিক বলতে কিছুই নেই সেখানে।

সেই রাতে তুষার স্বপ্নে দেখে : একজন মায়াবতী তার সামনে হাজির। সাদা শাড়ি পরা। সে বলছে, “তুষার তুুমি ভুল ছিলে। আমি সেখানে ছিলাম। আমার নাম তমা। তোমরা আমাকে মানুষ ভেবেছিলে, আসলে আমি মানুষ ছিলাম না।”

পরদিন তুষার স্বপ্নের কথা ইরফানকে জানায়। তারা সেই গ্রামে গিয়ে তমাকে আর খুঁজে পায়নি।

গ্রামের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, “তমা নামে কাউকে তারা চিনতো না। কেউ এই নামে সেখানে কোনোদিন ছিলোও না।”

তারা আবারও গভীর রাতে কুয়ার উপরে গিয়ে বসে। এ সময় তারা তমার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। গুণ গুণ করে গান গাইছে।

ইরফান ডাক দেয়, “তমা।”

তমা উত্তর দেয় না। এ সময় তমার অট্টহাসি শোনা যায়। ইরফান নিচে নামতে চায়, কিন্তু তুষার বাধা দেয়। ইরফান তুষারের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু তুষার বলে, এই পৃথিবীতে অনেক কাণ্ডকারখানা ঘটে যায়, আমরা অনেক কিছুরই শেষটা জানতে পারি না। সত্য মিথ্যার খেলা বেশ জটিল, এটা অনেক সময় প্রকাশ পায় আবার অনেক সময় গোলক ধাঁধার চক্করে পড়ে বিলীন হয়ে যায়।”

বৃহস্পতিবার, ০৭ আগস্ট ২০২৫ খ্রি. ২৩ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

বৃহস্পতিবার, ০৭ আগস্ট ২০২৫ খ্রি. ২৩ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

You might like

About the Author: priyoshomoy