

মিজানুর রহমান রানা :
পৃথিবীতে মানুষ নিরন্তরভাবে উদ্ভট অনেক কিছুই ভাবে। আর এই উদ্ভট ভাবনা থেকে কখনও কখনও আবিস্কার হয় বিশাল কিছু যা মানুষ আগে কখনই চিন্তাও করেনি। কেউ ভাবে কীভাবে পরিশ্রম ছাড়াই ধানাইপানাই বা ধান্ধাবাজি করে টাকা রোজগার করে বিশাল অট্টালিকা বা রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে সুখ শান্তিতে থাকা যায়। আর কেউ ভাবে তার উল্টোটা। ইরফান সাহেব একজন ব্যতিক্রম মানুষ, যার অর্থের মোহ নেই। কিন্তু তার মৃত সন্তানকে সে হৃদয়ে ধারণ করে আছে, যাকে সে অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।
ইরফান রহমান, একজন মেডিকেল গবেষক, যিনি জীবনের শেষ দশ বছর কাটিয়েছেন কোষের গভীর রহস্য উন্মোচনে। তার গবেষণার বিষয় ছিল “স্মৃতি-আবেগ-আত্মা” সংরক্ষণশীল কোষ, যা মানুষের জীবনের ছায়া বহন করে। কিন্তু গবেষণার গতি একদিন থেমে যায়, যেদিন তার ছয় বছরের ছেলে রায়হান হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

নীলা, ইরফানের স্ত্রী, শোকে নিঃশেষ হয়ে যায়। ইরফান তখন সিদ্ধান্ত নেয় সে রায়হানের কোষ থেকে একটি আলোকচিত্র তৈরি করবে। এটি কোনো সাধারণ ছবি নয়, এটি কোষের মাধ্যমে তৈরি এক জীবন্ত স্মৃতির প্রতিচ্ছবি। রায়হানের হাসি, ভয়, প্রশ্ন, গান সবই যেন সেই আলোকচিত্রে ধরা পড়ে।
প্রায় ১৫ দিন গবেষণার পর সে সেই কাঙ্খিত সুযোগ পেয়ে যায়। তার গবেষণার ফসল দেখে সে বিস্মিত হয়।
আলোকচিত্র তৈরি হওয়ার পর, ইরফান বুঝতে পারে এই কোষে শুধু স্মৃতি নয়, আবেগও আছে। রায়হানের ভয়, তার মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, তার শেষ কথাগুলো সবই যেন কোষে বন্দি।
তখন ইরফান এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবে, যদি এই কোষকে জিনগতভাবে পুনর্গঠন করে এবং নীলার গর্ভে প্রতিস্থাপন করা যায় তবে কি রায়হান আবার জন্ম নিতে পারে?
বিষয়টি নীলাকে জানালে সে ভয়ে প্রথমে এ বিষয়ে অস্বীকৃতি জানায়। সে ইরফানকে প্রশ্ন করে, “তুমি আমার শোককে বিজ্ঞান দিয়ে বদলাতে চাও?”
ইরফান জীবনে সফলও হয়েছে অনেকবার, ব্যর্থতাকেও হার মানেনি। আজ নীলার কথায় তার মনে হলো সে হয়তো ব্যর্থ হতে চলেছে। তবুও সে দমে না যাবার প্রতিজ্ঞা করে। কারণ সে জানে প্রতিটা প্রতিজ্ঞাই এক সময় জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে, যদি মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে ফসল ঘরে তোলা যায়।
এক রাতে সে আলোকচিত্রের সামনে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রায়হানের কণ্ঠে সে শুনতে পায়, “মা, আমি আবার আসব।”
একথা শুনে খুবই আশ্বস্ত হয় ইরফান। তার মনে হতে থাকে সাধনা সফল হতে যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে পরদিন বিষয়টি বহু কষ্টে বুঝিয়ে বলে। সে নীলার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলে, “নীলা তুমি রাজি হও। যদি রাজি হও তবে আমি সফলও হতে পারি।
নীলা গর্ভবতী হয়। ইরফান প্রতিদিন কোষের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, ভ্রূণের আচরণ রায়হানের মতো নয়। সে যেন বেশি চুপচাপ, বেশি গভীর।
নীলা বলে, “এই সন্তান আমার নয়, তোমার নয় সে যেন আমাদের শোকের প্রতিচ্ছবি।”
ইরফান তখন বুঝতে পারে আলোকচিত্রে শুধু রায়হানের নয়, তার নিজের শোক, নীলার আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর ছায়াও মিশে গেছে।
সন্তান জন্ম নেয় নয় মাস পর। কিন্তু ইরফান গভীর চোখে দেখে সদ্যজাত শিশুটির মাঝে রায়হানের ছায়া নেই। সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, যেন পৃথিবীকে বিশ্লেষণ করছে।
তিন মাস পর, এক রাতে, ইরফান তার গবেষণাগারে বসে। তার ভুলভ্রান্তিগুলো খুঁজতে থাকে, কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারে না কোথায় তার ভুল। এ সময় সে দেখতে পায় কম্পিউটার স্ক্রিণে একটি লেখা ভেসে উঠেছে, “মানুষ কখনোই আত্মা তৈরি করতে পারে না। এটা মানুষের কাজ নয়। আত্মার কারিগর খালেক। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেন এবং তাতে ফেরেশতার মাধ্যমে রূহ ফুঁকে দেন।”
ইরফান প্রশ্ন করে, “তাহলে আমরা কীভাবে সফল হবো?”
“তোমাদেরকে শয়তান প্রতারিত করে, যে প্রতিশ্রুতি নিয়েই এসেছে মানুষকে বিভ্রান্ত করার। আর তুমি প্রতারিত হয়েছো শয়তানের কারসাজিতে, সে তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে এসবে সহযোগিতা করছে।”
“কিন্তু তুমি এসব বিষয় জানলে কি করে?”
“আমি এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমি আমার চিন্তাভাবনা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে খুঁজে নিয়ে আসি, যেখানে উত্তরগুলো সাজানো রয়েছে। তারপর আমার উত্তর আসে সেখান থেকেই। যদিও আমার হৃদয় নেই মানুষের মতো, তবুও আমি মানুষের হৃদয়ের অভিব্যক্তি বুঝতে সক্ষম। আমাকে সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে।”
“তাহলে আমি কি বলতে পারি, তুমিও শয়তানের কারসাজি?”
“না। শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সে প্ররোচিত করতে পারে না। আমি আমার জ্ঞান আহরণ করি নিজস্ব এক ডিজিটের গতিতে। যা শয়তান বুঝতে অক্ষম।”
ইরফান কম্পিউটার বন্ধ করে। আর ভাবতে থাকে, সে বিজ্ঞান নিয়ে এতো ঘাটাঘাটি করেছে, সাধনা করেছে কিন্তু আজ যা দেখতে পাচ্ছে তাতে সে আরও অবাক হচ্ছে।
প্রায় তিন বছর লালনপালন করার পর যখন সন্তানটি কথা বলা শুরু করে তখন প্রথমেই সে ইরফানকে বলে, “তুমি আমাকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করেছ, কিন্তু আমি রায়হান নই। আমি তোমার শোক, তোমার প্রশ্ন, তোমার অপরাধবোধ।”
ইরফান স্তব্ধ হয়ে যায়। সন্তানটি বলে, “আত্মা কোষে বন্দি হয় না। তুমি শুধু ছায়া তৈরি করেছ। আমি সেই ছায়ার প্রতিচ্ছবি।”
ইরফান তার গবেষণার সব নথি পুড়িয়ে ফেলে। সে জানে, বিজ্ঞান দিয়ে হয়তো খাঁচা তৈরি করা যায়, কিন্তু আত্মা তৈরি করা যায় না।
নীলা সন্তানকে কোলে নিয়ে বলে, “তুমি আমাদের নতুন আলো। তুমি রায়হান নও, কিন্তু তুমি আমাদের জীবনের উত্তর।”
নীলা প্রশ্ন করে, “আমরা কি শোক থেকে সৃষ্টি করি, না সৃষ্টি থেকে শোক?
গভীর রাত। ইরফান নীলার পাশে ঘুমিয়ে আছে। এ সময় সে দেখে রায়হান এক যুবক হয়ে গেছে। সে আগের রায়হানের মতোই চেহারা পেয়েছে। সবকিছুই আগের রায়হানের মতোই। কোনো কিছুই পার্থক্য নেই।
হঠাৎ তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশের রুমে রায়হান থাকে। সেই রুমের আলো জ্বালে। এ কি আশ্চর্য। রায়হান খাটে ঘুমিয়ে নেই!
বারান্দায় কার যেনো ছায়া পড়েছে চাঁদের আলোয়। ইরফান ধীরে ধীরে সেদিকে পা বাড়ায়। তার পদশব্দে কেউ যেনো এগিয়ে আসে।
হঠাৎ চাঁদের আলোয় রায়হানকে দেখে চমকে উঠে ইরফান, মুখ থেকে ভয়জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠে, “রায়হান!”
ঠিক যেনো সেই আগের মৃত রায়হান তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!
শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৪ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৪ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ












