

মিজানুর রহমান রানা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরটা বিকেলের আলোয় ঝলমল করছিল। তুষার আহমেদ ক্যামেরা হাতে ঘুরছিল, উদ্দেশ্য একটি প্রতিবাদী চিত্রনাট্য তৈরি করা, যেখানে শহরের চোর, ছিনতাইকারী ও লুটেরাদের মুখোশ খুলে ফেলা যাবে।

হঠাৎই তার ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে এক দৃশ্য। লাল শাড়ি পরা এক তরুণী, চুল খোলা, চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। কিন্তু কেমন যেনো অদ্ভুত শূন্যতা। চারদিকে তাকাচ্ছে যেনো কেউ দেখে ফেলবে।
তুষার থমকে যায়।
শাড়ির রঙটা যেন ক্যামেরার ফ্রেম ভেদ করে তার চোখে গেঁথে যায়। লাল, কিন্তু উগ্র নয়। যেন রক্ত নয়, প্রতিবাদের প্রতীক। তরুণী তুষারের ক্যামেরার লেন্সের এরিয়া থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়।
তুষারের ক্যামেরা তাক করা দেখে তরুণীটি এরপর তাকিয়ে থাকে ক্যামেরার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তুষার মনে করে, সে হাসছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ করেই কোথায় যেনো মিলিয়ে যায়।
তুষার ক্যামেরায় ছবিটা দেখে। জুম করে। মেয়েটার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত চেনা ভাব।
“এই মেয়েটাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি,” তুষার নিজের মনে মনে বলে।
রাতের বেলা, ছবিটা সে আবার দেখে। লাল শাড়ির ভাঁজে যেন কিছু লুকানো আছে। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে এক ছায়ামূর্তি। মুখ দেখা যায় না, কিন্তু চোখে সানগ্লাস, হাতে ওয়াকিটকি। তুষার বুঝতে পারে, এই ছবি শুধু একটি মুহূর্ত নয়, এটি একটি অজানা সূত্র। যাকে কাজে লাগিয়ে সে পেশায় সফল হয়ে যেতে পারে।
পরদিন সে টিএসসিতে ফিরে যায়। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। এক বৃদ্ধ চা-ওয়ালা হঠাৎ করে তুষারকে প্রশ্ন করে , “আপনি কি রূপাকে খুঁজছেন?”
তুষার চমকে ওঠে। “রূপা?”
পান চিবানো দাঁত কেলিয়ে চা-ওয়ালা বলে, “হ্যাঁ, লাল শাড়ি পরা মেয়েটা। মাঝে মইদ্যে আসে। কিন্তু গত সপ্তায় একদল লোক তারে খুঁজছিল। হেরপর থাইক্যা আর আহে না।”
তুষার বুঝতে পারে, সে শুধু একটি ছবি তুলেনি, সে একটি ভিন্ন সংকেতের দরজা খুলে ফেলেছে। এটা এমন একটি সংকেত, যার শেষ কোথায়, তা জানা নেই এখন।
তুষারের আগ্রহ বাড়তে থাকে। অনুসন্ধানী মন নিয়ে সেদিন রাতেই রূপার ছবিটা আবার খুলে বসে। লাল শাড়ির ভাঁজে, চোখের ভাষায়, আর পেছনের ছায়ামূর্তিতে যেন কোনো একটা সংকেত লুকিয়ে আছে।
সে ছবিটা কালো-সাদা করে, কনট্রাস্ট বাড়ায়। পেছনের ছায়ামূর্তির হাতে ধরা ওয়াকিটকির গায়ে ছোট্ট একটা স্টিকার—“R-23”।
তুষার গুগরে সার্চ করে, কিছুই পায় না। কিন্তু তার সাংবাদিক বন্ধু রাফিকে ফোন করে বিষয়টা জানতে চায়। রাফি বলে, “R-23? এটা তো একটা কোড। একসময় রাষ্ট্রীয় নজরদারির ফাইলগুলোতে এমন কোড ব্যবহার হতো।”
কথাগুলো শুনে তুষার সাময়িক চুপ করে যায়। পরদিন সে যায় সেই চা-ওয়ালার কাছে।
“রূপা কি এখানে নিয়মিত আসতো?”
চা-ওয়ালা মাথা নাড়ে। “না, মাঝে মইদ্যে আসতো। একদিন এক ছেলেকে বলছিল, ‘আমরা যদি চুপ থাকি, তাহলে ইতিহাসও চুপ থাকবে।’”
তুষার বুঝতে পারে, রূপা শুধু একজন সাধারণ তরুণী নয়। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো আর্কাইভে যায়। রূপা নামের কয়েকজনের তথ্য খুঁজে পায়। একটিতে ছবি নেই, কিন্তু ঠিকানা আছে, মগবাজারের এক পুরনো বাড়ি।
তুষার সেখানে যায়। দরজায় ধাক্কা দেয়। এক বৃদ্ধা দরজা খুলেন। তাকে রূপা সম্পর্কে প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, “তুমি রূপার বন্ধু?”
তুষার মাথা নাড়ে।
বৃদ্ধা বলেন, “রূপা আমার ভাগ্নি। সে এখন কোথায়, আমি জানি না। কিন্তু তুমি যদি সত্যিই তাকে খুঁজতে চাও, তাহলে এইটা রাখো।”
তিনি একটি পুরনো ডায়েরি এগিয়ে দেন। ডায়েরির পাতায় লেখা : “আমি জানি, তারা আমাকে খুঁজবে। আমি জানি, আমি একা। কিন্তু আমি জানি, সত্যটা আমার কাছে আছে। যদি আমি হারিয়ে যাই, কেউ একজন হয়তো খুঁজবে। হয়তো তুষার।”
তুষার স্তব্ধ হয়ে যায়। সে ডায়েরির পেছনের পাতায় একটি ম্যাপ পায়, ঢাকার একটি পুরনো গুদামঘরের লোকেশন।
সেদিন রাতেই সে সেখানে যায়। গুদামঘর অন্ধকার, ধূলিময়। এক কোণে একটি পুরনো কম্পিউটার। চালু করলে দেখা যায়, একটি ফোল্ডার—“R-23”।
তুষার ফোল্ডার খুলে দেখে—ভিডিও, ছবি, অডিও রেকর্ডিং। সবকিছুই একটি গোপন রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের প্রমাণ, যেখানে নিরীহ মানুষদের উপর নজরদারি চালানো হতো, তাদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
রূপা সেই প্রকল্পের তথ্য ফাঁস করতে চেয়েছিল। তাই হয়তো তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছে নজরদারির মাধ্যমে।
তুষার বুঝতে পারে, রূপা হারিয়ে যায়নি। তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎই কম্পিউটার স্ক্রিনে একটি পপ-আপ আসে, “তুমি যদি এগোতে চাও, প্রস্তুত থাকো।”
তুষার জানে, সে এখন শুধু একজন অনুসন্ধানকারী নয়, সে একজন সাক্ষী। একজন যাকে হয়তো রূপার মতোই হারিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সে থামবে না।
তুষার সেই রাতেই “R-23” ফোল্ডারের সব তথ্য কপি করে নিজের ল্যাপটপে রাখে।
ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কিছু মানুষকে গোপনে অনুসরণ করা হচ্ছে, তাদের ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে, এমনকি কিছু প্রতিবাদী কণ্ঠকে “দুর্ঘটনার” মাধ্যমে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একটি ভিডিওতে রূপা নিজেই কথা বলছে, “আমি জানি, তারা আমার পেছনে আছে। কিন্তু আমি ভয় পাই না। যদি আমি হারিয়ে যাই, তুষার, তুমি এগিয়ে যেও।”
তুষার বুঝতে পারে, রূপা তাকে আগেই বেছে নিয়েছিল। পরদিন সে রাফিকে সব জানায়। রাফি ভয় পায়।
“তুই এসব নিয়ে ঘাঁটিস না, তুষার। এটা শুধু সাংবাদিকতা না, এটা জীবন-মৃত্যুর খেলা। ওরা যে কোনো মুহূর্তে তোকে মেরে ফেলতে পারে, অথা গুম করে ফেলবে।”
তুষার চুপ করে যায়। সে রূপার ডায়েরির শেষ পাতায় চোখ রাখে। সেখানে একটি ঠিকানা, একটি পুরনো ছাপাখানা।
তুষার সেখানে যায়। ছাপাখানার মালিক বলে, “রূপা এখানে এসেছিল। কিছু ছাপাতে চেয়েছিল। কিন্তু ফাইলটা সে রেখে যায়নি।”
তুষার দেয়ালে চোখ রাখে। সেখানে একটি পোস্টার, লাল শাড়ি পরা এক মেয়ের ছবি, নিচে লেখা: “তাকে খুঁজে পাও, সত্যকে খুঁজে পাও।”
তুষার বুঝতে পারে, রূপা শুধু তথ্য ফাঁস করতে চায়নি, সে চেয়েছিল একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে।
সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে চুপ থাকবে না। তুষার একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে—“RedSariTruth.com”।
সেখানে সে রূপার ছবি, ভিডিও, এবং “R-23” ফাইলের কিছু অংশ প্রকাশ করে। রাতের বেলা তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে কল আসে, “তুমি যা করছো, সেটা বন্ধ করো। নইলে তুমি রূপার মতো হারিয়ে যাবে।”
তুষার উত্তর দেয় না। সে জানে, ভয় পেলে রূপা হারিয়ে যাবে সত্যিই। কিন্তু যদি সে এগোয়, তাহলে রূপা ফিরে আসবে প্রতীক হয়ে, প্রতিবাদের রঙ হয়ে।
তুষার জানে, সে এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধে নেমেছে। তার ওয়েবসাইটে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢুকছে। কেউ বলছে, “আমরা রূপাকে চিনি।” কেউ বলছে, “আমরা এমন অনেক রূপাকে হারিয়েছি।”
তুষার বুঝতে পারে, রূপা একা নয়। একদিন সকালে, সে তার দরজার নিচে একটি খাম পায়।
ভেতরে একটি USB ড্রাইভ, আর একটি ছোট্ট চিরকুট, “শেষটা তোমার হাতে। আমি রূপা নই, আমি লাল শাড়ি।”
তুষার USB চালু করে। একটি ভিডিও, রূপা একটি অন্ধকার ঘরে বসে আছে।
“তারা আমাকে সরিয়ে দিয়েছে। আমি কোথায়, সেটা বলার দরকার নেই। কিন্তু আমি আছি। আমি রক্ত নই, আমি প্রতিবাদ। আমি হারিয়ে যাইনি, আমি ছড়িয়ে পড়েছি।”
ভিডিওর শেষে রূপা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুষার, তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজে পাও, তাহলে আমাকে খুঁজে পাবে মানুষের চোখে, মানুষের কণ্ঠে, মানুষের সাহসে।”
তুষার চুপ করে বসে থাকে। তার চোখে জল আসে না, কিন্তু বুকের ভেতর একটা আগুন জ্বলে ওঠে।
সে সিদ্ধান্ত নেয়, রূপার গল্প শুধু ওয়েবসাইটে থাকবে না, তা ছড়িয়ে দিতে হবে। তুষার একটি প্রদর্শনী আয়োজন করে “লাল শাড়ির গল্প”।
ছবিগুলোতে রূপা নেই, কিন্তু তার ছায়া আছে। প্রতিটি ছবির নিচে QR কোড, যা দর্শকদের নিয়ে যায় সেই USB ভিডিওতে।
প্রদর্শনীতে একদিন এক তরুণী আসে লাল শাড়ি পরে, চোখে কালো কাজল, মুখে এক অদ্ভুত হাসি। তুষার তাকিয়ে থাকে। তারপর প্রশ্ন করে, ‘‘তুমি কি রূপা?”
তরুণী হেসে উত্তর দেয়, “আমি রূপা নই। কিন্তু আমি তার গল্প জানি।”
তুষার হাসে। “তাই তো চাই। রূপা একজন নয়, রূপা একটা প্রতীক।”
প্রদর্শনী শেষে, তুষার একটি দেয়ালে লিখে রাখে, “যারা হারিয়ে যায়, তারাই আলো হয়ে থাকে।”
রাতের বেলা, তুষার তার ক্যামেরা হাতে নিয়ে শহরের পথে হাঁটে। একটি দেয়ালে সে দেখে, কেউ লিখে গেছে, “লাল শাড়ি ফিরে আসবে।”
তুষার জানে, রূপা হয়তো আর কখনও ফিরবে না। কিন্তু তার গল্প, তার সাহস, তার শাড়ির রঙ, সবই রয়ে গেছে। একটি গল্প শেষ হয় না, তা ছড়িয়ে পড়ে। রূপার লাল শাড়ি এখন শুধু একটি পোশাক নয়, এটি একটি বিপ্লব।
তুষার রাতে স্বপ্ন দেখে, লাল শাড়ি পরিহিতা রূপা হঠাৎ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তুষার প্রশ্ন করে, “তুমি কোথায় লুকিয়ে আছো রূপা।”
রূপার মুখে রহস্যময় হাসি। সে বলে, “আমাকে পেতে হলে তোমাকে কিছু হারাতে হবে।”
“কী সেটা?”
“তোমার আত্মা।”
“আমি তো আমার আত্মাকে কবেই হারিয়ে ফেলেছি রূপা। তুমিই তো আমার আত্মা। কিন্তু তুমি নেই, হারিয়ে ফেলেছি।”
রূপা খটখট করে হাসে। তারপর তুষারের মুখে লাল শাড়িটার একটা আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দেয়। মিষ্টি করে একটি চুমু দিয়ে বলে, “কাল সকালে টিএসসিতে এসো সেখানে আমার লাশটা পড়ে আছে একটা জঙ্গলের পাাশে।”
ঘুম থেকে উঠে নির্বাক হয়ে যায় তুষার। বিষয়টা সত্যি নাকি মিথ্যা? ঘড়ির দিকে তাকায়, রাত পৌণে তিনটা। এখনই যেতে মন চায় সেখানে কিন্তু এতো রাত! সত্যটা জানার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা তার জন্য তিনশ’ নয় বছরের মতো হচ্ছে।
মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৭ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন












