

মিজানুর রহমান রানা :
রাত নামলেই অনন্যার ঘরে কিছু একটা বদলে যেত। দিনের আলোয় যে ঘরটা ছিলো শান্ত, পরিচ্ছন্ন, আর নিরাপদ। সন্ধ্যার পর সেটা হয়ে উঠত অচেনা, অস্বস্তিকর। দেয়ালের রং যেন গাঢ় হয়ে যেত, বাতাস ভারী হয়ে উঠত, আর ঘড়ির কাঁটা ১১টা ছুঁতেই যেন সময় থমকে যেত।

প্রথমে সে ভেবেছিল, এটা নিছক কল্পনা। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো একাকীত্ব। কিন্তু প্রতিদিন একই সময়, একই অনুভূতি। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রতিবিম্বে কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ত। চোখের পেছনে যেন আরেক জোড়া চোখ, যেগুলো তাকিয়ে আছে, কিন্তু অনন্যার নয়।
ইমতিয়াজ ছিলো যুক্তিবাদী। ভূত-প্রেত, আত্মা এসব তার কাছে গল্পের উপাদান মাত্র। কিন্তু অনন্যার চোখে ভয় ছিলো সত্যিকারের। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এক রাত অনন্যার ঘরে কাটাবে। “সবই কল্পনা,” সে বলেছিল। “আমি থাকলে কিছুই হবে না।”
রাত ১১টা ১৭ মিনিটে, ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যায়। জানালার পর্দা নাড়তে থাকে, অথচ বাইরে বাতাস নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইমতিয়াজ দেখে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি, যার চোখে ছিলো শূন্যতা, আর মুখে এক বিকৃত হাসি।
ইমতিয়াজ ভয় পায়নি। সে ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু মুহূর্তেই ঘরটা অন্ধকারে ডুবে যায়। পরদিন সকালে, ইমতিয়াজ অনন্যাকে নিয়ে স্থানীয় পুরনো রেকর্ড ঘাঁটতে শুরু করে। তারা জানতে পারে, অনন্যার ঘরটি আগে ছিলো এক বৃদ্ধা নারীর। তার নাম ছিলো রওশন আরা। তিনি ছিলেন একা, মানসিকভাবে অসুস্থ, এবং তার মৃত্যু হয়েছিলো রহস্যজনকভাবে, ঘরের আয়নার সামনে।
রওশন আরার মৃত্যুর পর ঘরটি বহু বছর খালি ছিল। কেউ সেখানে থাকতে চাইত না। অনন্যার পরিবার যখন ঘরটি কিনে, তখন এসব ইতিহাস কেউ জানায়নি।
ইমতিয়াজ আয়নাটি পরীক্ষা করে। আয়নার পেছনে খুঁজে পায় একটি পুরনো চিঠি, রওশন আরার লেখা। সেখানে লেখা ছিলো: “আমি জানি, সে আমার ভেতরে ঢুকে গেছে। আয়নার ভেতরে। আমি আর আমি নেই। সে আমার চোখ দিয়ে দেখে, আমার মুখ দিয়ে হাসে। কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু সে আছে। সে আমার অস্তিত্ব খেয়ে ফেলেছে।”
ইমতিয়াজ বুঝতে পারে, ছায়ামূর্তিটি কোনো সাধারণ ভূত নয়। এটি এক ধরনের অস্তিত্ব-গ্রাসকারী সত্তা, যা আয়নার মাধ্যমে মানুষের আত্মা দখল করে।
ইমতিয়াজ সিদ্ধান্ত নেয়, আয়নাটি ধ্বংস করতে হবে। সে রাতে আবার অনন্যার ঘরে আসে। ঠিক ১১টা ১৭ মিনিটে, ছায়ামূর্তিটি আবার দেখা দেয়। এবার তার চোখে ছিলো রক্তের মতো লাল আভা। ইমতিয়াজ আয়নাটি ভাঙতে যায়, কিন্তু ছায়ামূর্তিটি তার দিকে ছুটে আসে।
এক বিকট চিৎকারে ঘরটা কেঁপে ওঠে। আয়নাটি ভেঙে যায়। ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। অনন্যা অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
পরদিন, অনন্যা জেগে ওঠে। কিন্তু ঘরটা স্বাভাবিক। আয়না নেই। ইমতিয়াজ নেই।
অনন্যা খুঁজতে থাকে, কিন্তু ইমতিয়াজের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। তার ফোন, ব্যাগ, সবই ঘরে আছে। পুলিশ রিপোর্ট নেয়, কিন্তু কোনো সূত্র মেলে না।
একদিন, অনন্যা আবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়, একটি নতুন আয়না, যেটা সে কিনেছে। সেখানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। কিন্তু চোখের পেছনে যেন কিছু একটা নড়ে ওঠে।
এ সময় সে ইমতিয়াজের মতোই কাউকে দেখতে পায়। এটা দেখে অনন্যা হতভম্ভ হয়ে যায়। সে ভাবে, ইমতিয়াজ কি সত্যিই ছায়ামূর্তিকে ধ্বংস করতে পেরেছিল? নাকি সে নিজেই হয়ে গেছে সেই অস্তিত্বের অংশ?
অনন্যা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে। তার চোখ স্থির, নিঃশ্বাস ভারী। আয়নার ভেতরে যে মুখটা সে দেখতে পাচ্ছে, সেটা তার নিজের, তবু নয়। চোখের পেছনে যেন আরেক জোড়া চোখ। আর সেই চোখগুলো ছিল ইমতিয়াজের মতো।
সে পেছনে তাকায়। ঘরে কেউ নেই। আবার আয়নার দিকে তাকায়। এবার স্পষ্টভাবে দেখে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ইমতিয়াজ। কিন্তু তার মুখে সেই বিকৃত হাসি, যেটা সে দেখেছিল সেই রাতে ছায়ামূর্তির মুখে।
“ইমতিয়াজ?” অনন্যা ফিসফিস করে বলে।
প্রতিবিম্বের ইমতিয়াজ কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। তার চোখে কোনো অনুভূতি নেই। যেন সে শুধু দেখছে, কিন্তু দেখার পেছনে কোনো চিন্তা নেই।
অনন্যা আয়নার দিকে হাত বাড়ায়। আয়নার কাচ ঠান্ডা, কিন্তু তার আঙুলে যেন একটা স্পন্দন অনুভব করে। হঠাৎ আয়নার কাচে ফাটল ধরে। কিন্তু সেটা ভেঙে পড়ে না, বরং ফাটলের ভেতর দিয়ে যেন একটা অন্ধকার প্রবাহিত হয়।
অনন্যা বুঝতে পারে, ইমতিয়াজ হয়তো সত্যিই ছায়ামূর্তিকে ধ্বংস করতে পারেনি। হয়তো সে নিজেই হয়ে গেছে সেই অস্তিত্বের অংশ। অথবা, হয়তো ছায়ামূর্তিটি ইমতিয়াজের রূপ ধারণ করেছে, তার স্মৃতি, তার ভালোবাসা, তার যুক্তিবাদ, সবকিছু ব্যবহার করে অনন্যাকে টেনে নিতে চায়।
সে আয়নার সামনে বসে পড়ে। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। “তুমি যদি ইমতিয়াজ হও, তাহলে প্রমাণ দাও,” সে বলে।
প্রতিবিম্বে ইমতিয়াজের মুখে এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা আসে। তারপর আবার সেই বিকৃত হাসি।
অনন্যা সিদ্ধান্ত নেয়, এবার সে পালাবে না। সে আয়নাটি তুলে নিয়ে পুরনো সেই ঘরে যায়, যেখানে রওশন আরা মারা গিয়েছিলেন। ঘরটি এখন বন্ধ, ধূলিময়, আর নিঃসঙ্গ।
সে আয়নাটি দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়, ঠিক যেখানে রওশন আরার আয়না ছিল। তারপর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “আমার অস্তিত্ব আমি নিজেই সংরক্ষণ করবো। তুমি যদি ইমতিয়াজ হও, তাহলে ফিরে এসো। আর যদি না হও, তাহলে আমি তোমাকে এখানেই আটকে রাখবো।”
আয়নার ভেতরে ছায়ামূর্তিটি চিৎকার করে ওঠে। ঘরটা কেঁপে ওঠে। বাতাস ঘূর্ণি হয়ে ওঠে। কিন্তু আয়নার কাচ অটল থাকে। ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তিটি আয়নার ভেতরে মিলিয়ে যায়।
অনন্যা আয়নাটি কাপড়ে মুড়ে রেখে দেয়। সে জানে, এটা শেষ নয়। কিন্তু সে এখন জানে, ভয়কে মোকাবিলা করতে হয়। পালিয়ে নয়, দাঁড়িয়ে।
অনন্যা আয়নার রহস্যকে জয় করার পর, তার জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। সে এখন রাতে ঘুমালে, স্বপ্নে এক অচেনা জায়গায় চলে যায়, এক ধূসর উপত্যকা, যেখানে আলো নেই, কিন্তু অন্ধকারও নয়। সেখানে বাতাসে ভেসে বেড়ায় স্মৃতি, ছায়া, আর এক অদ্ভুত সত্তা।
একদিন সেই স্বপ্নে, সে দেখতে পায় একজন দাঁড়িয়ে আছে দূরে। তার মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু চোখের ভাষা চেনা।
“ইমতিয়াজ?” অনন্যা ফিসফিস করে।
সত্তাটি এগিয়ে আসে। তার শরীর যেন আলো আর ছায়ার মিশ্রণে গঠিত। সে বলে না কিছু, কিন্তু অনন্যা অনুভব করে এই সত্তা ইমতিয়াজেরই রূপান্তর। সে ছায়ার ভেতর হারিয়ে যায়নি, বরং ছায়াকে নিজের ভেতরে ধারণ করে এক নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
এই ইমতিয়াজ আর মানুষ নয়, আবার পুরোপুরি অতিপ্রাকৃতও নয়। সে এখন এক রক্ষক, যে ছায়ার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু তার মূল্য দিয়েছে নিজের মানবিক অস্তিত্ব।
সে অনন্যাকে জানায়, “আমি ফিরে এসেছি, কিন্তু আমি আর আগের মতো নই। আমি এখন ছায়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আলো আর অন্ধকার একসাথে বেঁচে থাকে।”
অনন্যা বুঝে যায়, ইমতিয়াজের ফিরে আসা এক আশীর্বাদ, কিন্তু এক বিপদও। কারণ ছায়া এখন তার ভেতরে আছে।
যদি কখনো ইমতিয়াজ দুর্বল হয়, সেই ছায়া আবার বেরিয়ে আসতে পারে। তাই অনন্যা সিদ্ধান্ত নেয়, সে ইমতিয়াজের পাশে থাকবে, এক রক্ষক আর এক স্মারক হয়ে।
অনন্যা ভাবে, ইমতিয়াজ কি ছায়াকে চিরতরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে? নাকি একদিন সেই ছায়া আবার তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে অনন্যাকে টেনে নেবে?
বুধবার, ১৩ আগস্ট ২০২৫
২৮ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
২৮ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ












