অপেক্ষার ছায়া

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি 

লেখক: মিজানুর রহমান রানা

সেদিন পৃথিবীর আকাশটা ছিল অদ্ভুত ধূসর। যেন রঙ হারিয়ে ফেলা কোনো স্মৃতি। শহরের ব্যস্ত সড়কে হঠাৎই ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় ইরফান আর আবেগীর পরিচয়।

একটা বাস, একটা ছাতা, আর একটা মুহূর্ত সে সময় সবকিছু যেন থেমে গিয়েছিল।

ইরফান। যিনি একজন তরুণ পদার্থবিদ, যার চোখে ছিল ভবিষ্যতের আবিস্কারের খোঁজ। আর আবেগী, একজন চিত্রশিল্পী, যার তুলির আঁচড়ে জীবনের গভীরতা ফুটে উঠত।

দুর্ঘটনার পর, তারা দুজনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়। একই ওয়ার্ডে, পাশাপাশি বিছানায়।

প্রথম কথাটা বলে আবেগী ,“তুমি কি বিশ্বাস করো, দুর্ঘটনাও কখনো মানুষের সুন্দর নিয়তি হতে পারে?

ইরফান হেসে বলে, “আমি বিশ্বাস করি, সময়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে গল্প। হয়তো আমরা সেই গল্পের চরিত্র।”

তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে দ্রুত। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, তারা একদিন শহরের বাইরে বেড়াতে যায়।

আবেগীর হাতে ছিল একটি লাল ছাতা, যা খুব পুরনো, কিন্তু অদ্ভুত রহস্যময়।

আবেগী ইরফানকে বলে, “এই ছাতাটা আমার দাদীর। তিনি বলতেন, এটা শুধু বৃষ্টি নয়, সময়ও আটকায়।”

এ সময় হঠাৎ, আকাশ কালো হয়ে আসে। বজ্রপাত, বাতাস, আর এক অদ্ভুত কম্পন শুরু হয়ে যায়। লাল ছাতা হঠাৎই আলো ছড়াতে শুরু করে। ইরফান আর আবেগী ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়।

এক মুহূর্তে, চারপাশের দৃশ্য বদলে যায়। তারা আর শহরে নেই।

তারা এসে পৌঁছায় এক অদ্ভুত স্থানে। আকাশ ধূসর, কিন্তু তারার মতো ঝলমলে। মাটি নরম, বাতাসে শব্দ নেই।

ইরফান আশ্চর্য হয়। তারপর আবেগীকে বলে, “এটা পৃথিবী নয়। তাহলে আমরা এখন কোথায়? কি ঘটে গেলো মুহূর্তেই?”

আবেগী রহস্যময় কণ্ঠে উত্তর দেয়, “তবে কোথায়?”

এ সময় একটি তরল আলোর মতো প্রাণী তাদের সামনে আসে। তারা অনুভব করে এই প্রাণী কথা বলে না, অনুভূতি পাঠায়।

“স্বাগতম,” সেই কম্পন বলে। “তোমরা এসেছো। আমরা অপেক্ষা করছিলাম।”

এই গ্রহের নাম নাইভেরা। এখানে সময়ের গতি পৃথিবীর চেয়ে ভিন্ন। এক মিনিট এখানে পৃথিবীর এক বছর।

ইরফান যেনো স্বপ্ন দেখছে। সে আবেগীকে বলে, ‘আবেগী, বুঝলাম না বিষয়টা। আসলেই কি মানুষের এই ক্ষমতা আছে যে, এক লহমায় পৃথিবী ছেড়ে কোনো অচেনা গ্রহে চলে আসার? এটা কীভাবে সম্ভব?”

আবেগী কোনো উত্তর দেয় না, তার হাসির আড়ালে রহস্য। সে ইরফানকে বলে, “আমি ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম, যে আমাকে ভালোবাসবে তাকে আমি এই দুনিয়ায় পেতে চাই না। কারণ এই দুনিয়াটা স্বার্থ আর প্রতারণায় ভরা। যে কোনো মানুষ যে কোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে, অন্যের হয়ে যেতে পারে। তাই আমি চেয়েছি তোমাকে নিয়ে আমি এমন স্থানে যেতে চাই, যেখানে মানুষ বলতে শুধু তুমি আর আমি থাকবো। আমার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।

নাইভেরায় দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো। ইরফান ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে, এই গ্রহে পদার্থের গঠন ভিন্ন।

আবেগী আঁকে সেই দৃশ্যগুলো যা আলোক-প্রাণী, নীরব আকাশ, আর তাদের ভালোবাসা। তারা বুঝে যায়, এই গ্রহে তারা একে অপরকে নতুনভাবে চিনছে। ভাষা নয়, অনুভূতি দিয়ে। তারা গ্রহের চারদিকে ঘুরেফিরে চমৎকার পরিবেশ দেখে, সমূদ্রের পানিতে গোসল করে আর জঙ্গলের গাছগাছালির ফল ছিঁড়ে খায়। খাওয়ার কোনো অভাব নেই এই গ্রহে।

দু’জন এক সময় ভুলে যায়, তারা পৃথিবীর আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে বহুদূরের এক গ্রহে চলে এসেছে। একদিন, নাইভেরায় এক মহাজাগতিক ঝড় আসে। লাল ছাতা হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবেগী ছাতার দিকে এগিয়ে যায়, যেন কিছু তাকে টানছে। ইরফান তাকে থামাতে চায়, কিন্তু ছাতা তাদের আলাদা করে ফেলে। আবেগী চলে যায় অন্য এক সময়-স্তরে।

ইরফান থেকে যায় নাইভেরায়। ইরফান বুঝে যায়, আবেগী এখন এমন এক স্থানে, যেখানে সময় আরও দ্রুত। সে নাইভেরার প্রাণীদের সাহায্যে একটি যন্ত্র তৈরি করে, যার নাম ‘স্মৃতি-সংগ্রাহক’। এই যন্ত্র আবেগীর অনুভূতির কম্পন ধরতে পারে।

প্রতিদিন সে সেই যন্ত্রে বসে, চোখ বন্ধ করে, আবেগীর স্মৃতি খোঁজে। সে বলে, “আমি অপেক্ষা করবো। যতদিন লাগে।”

আবেগী পৌঁছায় এক নতুন গ্রহে, যার নাম ভেলোরা। এখানে সময় স্থির। পাহাড়, নদী, আলো যেনো সবকিছু যেন থেমে আছে। আবেগী প্রতিদিন একটি পাথরে ইরফানের নাম লিখে রাখে। ভেলোরার প্রাণীরা বলে, “যদি তুমি যথেষ্ট অপেক্ষা করো, সময় তোমার কাছে ফিরে আসবে।”

যুগ পেরিয়ে যায়। নাইভেরায় একা একা সময় কাটাতে কাটাতে ইরফান হতাশ হয়ে যায়। তার যন্ত্র একদিন সংকেত পায় আবেগীর অনুভূতির কম্পন।

সে বুঝে যায়, আবেগী এখনো তাকে ভালোবাসে। নাইভেরার প্রাণীরা তাকে সাহায্য করে একটি ‘সময়-সেতু’ তৈরি করতে। এই সেতু তাকে ভেলোরায় নিয়ে যেতে পারে।

ভেলোরার আকাশে একদিন একটি দরজা খুলে যায়। আবেগী পাথরের সামনে বসে ছিল, চোখে জল। দরজা দিয়ে ইরফান প্রবেশ করে। তারা একে অপরকে দেখে, কিন্তু সময় তাদের বদলে দিয়েছে। তবুও, তারা একে অপরকে চিনে নেয়, চোখের ভাষায়, অনুভূতির কম্পনে।

তারা আবার লাল ছাতার নিচে দাঁড়ায়। ছাতা এবার তাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয় না। তারা নাইভেরা আর ভেলোরার মাঝখানে একটি নতুন গ্রহে বসবাস শুরু করে ‘অপেক্ষা’ নামের গ্রহে। এখানে সময় নেই, শুধু অনুভূতি।

আবেগী ইরফানকে বলে, “ভালোবাসা কখনো হারায় না।  শুধু অপেক্ষা করে।”

“আমরা সময়ের ভেতর হারাইনি। আমরা অপেক্ষার ভেতর বেঁচে আছি।” ইরফান উত্তর দেয়।

বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন
বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

You might like

About the Author: priyoshomoy