

মিজানুর রহমান রানা :
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম তার চরবিন্দুপুর। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে একটি ছোট নদী, আর দূরে দূরে তালগাছের সারি। এই গ্রামে সময় যেন থেমে থাকে, আর বিশ্বাস চলে প্রজন্মের রক্তে।

সেই রাতে আকাশ ছিল অস্থির। বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠছিল ঘরবাড়ি। গ্রামের মানুষ দরজা জানালা বন্ধ করে বসে ছিল, কেউ কেউ কোরআন পড়ছিল, কেউ আবার মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনায় বসেছিল।
রুখসানা নামের এক তরুণী বিধবা, তার ছোট কুঁড়েঘরে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। পাশে ছিল না কেউ, শুধু তার বৃদ্ধা মা, আর দূরে দূরে কুকুরের ডাক। হঠাৎ এক প্রবল বজ্রপাতের শব্দে ঘর কেঁপে উঠল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শিশুটি জন্ম নিল।
শিশুটি কাঁদল না। বরং তার চোখ খুলে গেল, আর সেই চোখে ছিল এক অদ্ভুত নীলাভ আলো। রুখসানা ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু শিশুটি হেসে উঠল, একটি কোমল, অথচ অস্বাভাবিক হাসি। বাইরে বজ্রপাত চলছিল, আর শিশুটি যেন তার সাথে তাল মিলিয়ে হাসছিল।
রুখসানা নাম রাখল জিউস। কারণ সেই রাতে তার মনে হয়েছিল, এই শিশু যেন আকাশ থেকে সরাসরি মাটিতে পড়েছিলো।
পরদিন সকালেই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে “রুখসানার ছেলে বজ্রপাতের সময় হাসে!” গ্রামের মানুষ ভিড় করল তার ঘরে। কেউ বলল, “এ তো অশুভ!”
কেউ বলল, “এটা তো অলৌকিক!”
আর কেউ কেউ চুপ করে শিশুটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই নীল আলো যেন তাদের ভিতরটা কাঁপিয়ে দিল।
মাওলানা হাফিজ, গ্রামের এক বৃদ্ধ পণ্ডিত, যিনি বহু বছর ধরে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন, খবর শুনে এলেন। তিনি শিশুটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন, “এই চোখ আমি আগে দেখেছি, এক পাণ্ডুলিপিতে লেখা ছিল, ‘এক শিশু আসবে, যার চোখে থাকবে আকাশের ভাষা। সে হাসবে বজ্রের সাথে, আর তার আগমন হবে এক পরিবর্তনের সংকেত।’
গ্রামবাসী দ্বিধায় পড়ে গেল। কেউ বিশ্বাস করল, কেউ ভয় পেল। রুখসানা শিশুটিকে আগলে রাখল, যেন সে এক মহামূল্যবান রত্ন।
জিউস বড় হতে লাগল। সে ছিল শান্ত, কিন্তু তার চোখে সবসময় সেই আলো জ্বলত। যখনই আকাশে মেঘ জমত, সে বাইরে গিয়ে দাঁড়াত, আর বজ্রপাত হলে সে হাসত, একটি গভীর, অথচ আনন্দময় হাসি।
সে কথা বলত কম, কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল তীব্র। গ্রামের শিশুরা তাকে ভয় পেত, আবার আকর্ষিতও হতো। কেউ কেউ বলত, “জিউস জানে কখন বৃষ্টি হবে।”
আর সত্যিই, সে আগেই বলে দিত, “আজ বিকেলে ঝড় আসবে।” তার কথা কখনো ভুল হতো না।
মাওলানা হাফিজ তাকে নিয়মিত দেখতেন। একদিন তিনি জিউসকে একটি পুরনো পাণ্ডুলিপি দেখালেন, যেখানে লেখা ছিল :
“আকাশের সন্তান যখন হাসবে, পৃথিবী কাঁপবে। তার চোখে থাকবে ভবিষ্যতের ছায়া, আর তার আগমন হবে এক নতুন যুগের সূচনা।”
জিউস পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কোথা থেকে এসেছি?”
হাফিজ বললেন, “তুমি হয়তো আমাদের মতো নও, কিন্তু তুমি আমাদের জন্য।”
এক রাতে, জিউস ঘুম থেকে উঠে বাইরে গেল। আকাশে ছিল অদ্ভুত আলো, আর হঠাৎ এক বজ্রপাতের সাথে সে চিৎকার করে উঠল, “আগুন আসছে!” গ্রামবাসী জেগে উঠল। কেউ বুঝল না, কেউ ভয় পেল।
পরদিন সকালে, পাশের গ্রামে আগুন লেগে গেল। কয়েকটি ঘর পুড়ে গেল, কিন্তু চরবিন্দুপুর ছিল নিরাপদ।
মানুষ বলল, “জিউস আগেই জানত!”
কেউ বলল, “সে তো ফেরেশতা!”
আর কেউ বলল, “এটা তো ভয়ংকর!”
রুখসানা ছেলেকে আগলে রাখল আরও শক্ত করে। সে জানত, জিউস আলাদা, কিন্তু সে তার সন্তান।
একদিন গ্রামে এল এক বহিরাগত ড. রায়হান, এক গবেষক। তিনি শুনেছিলেন জিউসের কথা। তিনি বললেন, “আমি চাই তাকে নিয়ে গবেষণা করতে। তার চোখের আলো, তার বজ্রের সাথে সংযোগ, এটা এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময়।”
রুখসানা রাজি হল না। হাফিজ বললেন, “জিউস কোনো পরীক্ষার বস্তু নয়। সে আমাদের বিশ্বাসের প্রতীক।”
ড. রায়হান বললেন, “বিশ্বাস আর বিজ্ঞান একসাথে চলতে পারে। আমি শুধু জানতে চাই, সে কি সত্যিই ভবিষ্যৎ জানে?”
জিউস চুপ করে ছিল। তারপর বলল, “আপনি যা খুঁজছেন, তা আমার ভিতরে নয় তা আকাশে। আল্লাহর কাছে। কোরআনে সবই লেখা আছে ১৪ শ’ বছর আগে। কোনো মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। শুধু তিনি ব্যতীত, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা। আমরা শুধু তার সৃষ্টি গোলাম মাত্র।”
ড. রায়হান জিউসের কথাগুলো শুনে আশ্চর্য হলেন। তিনি ভাবলেন এই ছোট্ট শিশু কোরআন সম্পর্কেও জ্ঞান রাখে কীভাবে? সে তো এখনও কোরআনই পড়েনি!
তিনি জিউসের পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। তারপর যা দেখলেন, তাতে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন।
ছেলেটির শরীরে কোনো হাড়ই নেই। তাহলে সে মানুষের মতো বসে আছে কীভাবে?
গ্রামে বিভাজন শুরু হল। কেউ বলল, “জিউসকে শহরে পাঠানো উচিত।”
কেউ বলল, “না, সে আমাদের!”
কেউ আবার বলল, “সে অশুভ, তাকে দূরে রাখতে হবে।”
রুখসানা কাঁদল। হাফিজ বললেন, “বিশ্বাস যখন দ্বিধায় পড়ে, তখনই সত্যের পরীক্ষা হয়।”
জিউস একদিন বলল, “আমি চলে যাব। কিন্তু আমি ফিরে আসব, যখন তোমরা প্রস্তুত হবে।”
সে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াল, আকাশের দিকে তাকাল, আর বলল, “আমি জানি, আমার সময় আসছে। কারণ তোমরা আমাকে গ্রহণ করতে পারছো না।”
এক রাতে, প্রবল ঝড় উঠল। বজ্রপাত চলছিল, আর জিউস নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ এক আলোয় সে ঢেকে গেল, আর তারপর, সে আর দেখা গেল না।
গ্রামবাসী বলল, “সে আকাশে চলে গেছে।”
হাফিজ বললেন, “সে ফিরে আসবে, যখন পৃথিবী প্রস্তুত হবে।”
রুখসানা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি আমার সন্তান, কিন্তু তুমি সবার।”
ড. রায়হান হুঁশ ফিরে ভাবছেন, জিউস ছিল এক শিশু, আর এক রহস্য। তার হাসি বজ্রের সাথে মিলিয়ে যেত, তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের ছায়া। সে হয়তো ফেরেশতা ছিল না, কিন্তু সে ছিল এক সংকেত, এক নতুন যুগের, এক নতুন বিশ্বাসের। যা মানুষ কখনও ভেবে কূল-কিনারা পায়নি। আসলেই সে কে ছিলো?
শনিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ৩১ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন













