নষ্টা মেয়ে মম

মিজানুর রহমান রানা :

রাতের মাঝে চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা অচিন এক গ্রাম। যেন বাস্তব নয়, স্বপ্নের মতো লাগে। চারদিকে পাহাড়, নদী আর বাতাসে এক ধরনের স্নিগ্ধতা। সেই স্নিগ্ধতার মাঝেই একরাতে দেখা হয়েছিল ইরফান আর মমের।

ইরফান সকালে বাসে উঠে সারাদিন চলতে চলতে এসেছিলো শহর থেকে একা। এই গ্রামে তার নানার বাড়ি। বাস থেকে নেমে অনেক গ্রাম্য পথ হাঁটতে হাঁটতে রাত হয়ে যায়।

ক্লান্ত শরীর, নিজের ভেতরের শূন্যতা নিয়ে প্রায় নানার বাড়ি চলে এসেছে। এমন সময় নানার বাড়ির সামনেই দেখে মমকে।

সে এই গ্রামেরই মেয়ে। তার পরনের ছিলো একটা উজ্জ্বল লাল শাড়ি, যেনো জোছনার আলোকে এক জীবন্ত পরী। কিন্তু তার চোখে ছিলো না শহরের মতো জটিলতা। তবে যেন কোনো অতীত তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

ওই রাতে গ্রামের পুরনো বটগাছের নিচে, লাল শাড়ি পরেই দাঁড়িয়ে ছিলো মম। তার চোখে ছিলো একধরনের অজানা ভাবনা।

ইরফান চলতে পথে তাকে দেখে থেমে গিয়েছিলো। মেয়েটিকে দেখে যেন সময় থেমে গেছে তার। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে না, বাতাস বইছে না, সব স্থির হয়ে আছে।

অবাক হয়ে ইরফান জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি এখানে একা?”

মম শুধু হেসে বলেছিল, “আমি তো সবসময় এখানেই ছিলাম, তুমি খুঁজে পাওনি।”

ইরফান এমন সহজ সরল কথায় অবাক হয়। তারপর মম তাকে জিজ্ঞাসা করে সে কোন বাড়িতে এসেছে? ইরফান তার নানার নাম বলতেই মম অনতিদূরে আঙ্গুল দেখিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দেয়।

সেই রাতের পর থেকে তাদের বন্ধন গড়ে উঠেছিল। তারা হাঁটত চাঁদের আলোয়, বাতাসে ভেসে বেড়াত এক সুঘ্রাণ। অচিন গ্রামটা যেন তাদের জন্যই তৈরি হয়েছিল। আর তারা যেনো এক ইতিহাসের পাতায় ঘুরে ফিরছিলো।

ইরফান আর মমের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। তারা একে অপরের ভেতরের দুঃখ, স্বপ্ন, ভয় সব ভাগ করে নিতে শুরু করে।

কিন্তু গ্রামের মানুষজন, বিশেষ করে মমের পরিবার, এই সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখেনি। মমের বাবা ছিলেন রক্ষণশীল, আর ইরফান ছিলো শহরের ছেলে অপরিচিত, অজানা।

একদিন গ্রামের এক কুচত্রি ব্যক্তি জামশেদ ইরফানকে ডেকে বলেছিল, “এই মেয়েটা তোমার জন্য নয়। ওর অন্ধকার এক অতীত আছে, তুমি তা জানো না। জানলে হাজার মাইল দূরে সরে যেতে।”

ইরফান শুধু বলেছিল, “আমি অতীত খুঁজি না, আমি মনের মানুষ দেখি। যাকে কেউ দূরে সরিয়ে দিতে পারে না।”

কিন্তু জামশেদ হাসে, সে কুটিল এক দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

এক রাতে, মম নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ জানে না সে কোথায়। গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে মম পালিয়েছে, নষ্টা মেয়ের মতো। কেউ বলে জামশেদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, কেউ বলে শহরের কোনো লোকের সঙ্গে চলে গেছে।

ইরফান বিশ্বাস করেনি। সে জানত, মম এমন নয়। সে খুঁজতে শুরু করে গ্রাম, শহর, রেলস্টেশন, পুরনো বন্ধুরা সব জায়গায়।

একদিন, এক অচেনা সূত্রে জানতে পারে, মমকে চট্টগ্রামের বন্দরে দেখা গেছে, এক জাহাজে।

ইরফান ছুটে যায় চট্টগ্রামে। বন্দর যেন এক বিশাল গোলকধাঁধা। জাহাজ, কন্টেইনার, লোকজন সবকিছু যেন অচেনা। তবু সে খুঁজে চলে। অবশেষে, এক সন্ধ্যায়, সে দেখে এক জাহাজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জামশেদ। আর তার পাশে, লাল শাড়িতে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মম।

ইরফান ছুটে যায়। জামশেদ তাকে থামায়। আর বলে, “তুমি কি জানো, এই মেয়েটা এখন নষ্টা?  আমার সব লোকেরা তাকে ভোগ করেছে। তুমি তাকে নিয়ে কি করবে?”

এ সময় জামশেদের পেছন থেকে বেরিয়ে আসে নিয়াজ, যে জামশেদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। সে বলে, “এই মেয়ে এখন নষ্টা। তাকে আমরা সবাই মিলে গণধর্ষণ করেছি।”

ইরফান স্তব্ধ। মম কিছু বলে না, শুধু চোখে চোখ রাখে ইরফানের। তার চোখে ছিলো একধরনের ইঙ্গিত- সব মিথ্যা। সব মিথ্যা।

ইরফান বুঝে যায়, মমকে অপহরণ করা হয়েছিল। তার সম্মানকে ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মম ভাঙেনি।

ইরফান আর দেরি করে না। পকেট থেকে কি একটা বের করে জামশেদের দিকে ছুঁড়ে মারে। জামশেদ পড়ে যায়, আর নিয়াজ রিভলবার বের করার চেষ্টা করে।

সে আগেই থানায় খবর দিয়ে রেখেছিলো। পুলিশের বিশেষ বাহিনী চলে আসে। জামশেদ তার সহকর্মীদের নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ধরা পড়ে শুধু তার সহকর্মীরাই, জামশেদ জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে ডুবে যায়। তাকে আর পাওয়া যায়নি।

মম জানায়, তাকে অপহরণ করে বন্দরে আনা হয়েছিল। তার ছবি তুলে সামাজিকভাবে অপমান করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সে কাউকে নিজের শরীর দেয়নি, কাউকে নিজের আত্মা ভাঙতে দেয়নি।

পুলিশ তদন্ত করে, জামশেদ ও তার লোকেরা নারী পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মম ছিলো তাদের শিকার, কিন্তু সে বেঁচে যায়। তবে জামশেদকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

ইরফান মমকে নিয়ে ফিরে আসে গ্রামে। গ্রামের মানুষজন প্রথমে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে, সত্য প্রকাশ পায়। মম নিজেই দাঁড়িয়ে বলে, “আমি নষ্টা নই। আমি ভাঙিনি। আমি বেঁচে আছি, মাথা উঁচু করে।”

ইরফান তার পাশে দাঁড়ায়। তাদের সম্পর্ক সমাজের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, তারা জানত তাদের ভালোবাসা সত্য।

এক রাতে, আবার সেই বটগাছের নিচে, চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকে মম। ইরফান পাশে এসে দাঁড়ায়।

“তুমি কি এখনো এখানে?” ইরফান জিজ্ঞেস করে।

মম হেসে বলে, “আমি তো সবসময় এখানেই ছিলাম, তুমি খুঁজে পাওনি।”

ইরফান তার হাত ধরে। চাঁদের আলোয়, বাতাসে, তারা আবার ভেসে বেড়ায় এইবার আর অচিন নয়, এইবার বাস্তব।

এ সময় হঠাৎ করেই মম ইরফানকে প্রশ্ন করে, “তুমি কি আমার অন্ধকার অতীতটা জানতে চাও না?”

ইরফান মম’র হাত ধরে তারপর আবেগে বলে উঠে, “তুমিও তো আমার অতীত বা বর্তমান পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাও না। তাহলে আমি কীভাবে তোমার অতীত নিয়ে পড়ে থাকবো?”

মম উত্তর দিলো, “বলো আমি তোমার বিষয়ে জানতে চাই।”

“আমি একজন সরকারি গোয়েন্দা। আমি শুধু এসেছিলাম জামশেদকে ধরতে, কারণ জামশেদ এক আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া ডন। সে কয়েকবার আমাদের হাত ফসকে চলে গিয়েছিলো। সর্বশেষ জানামতে সে এই গ্রামে এসে ছদ্মবেশে তার আত্মীয়র বাড়িতে উঠে। আমি খোঁজ পেয়ে এখানে আসি নানার বাড়ির অজুহাতে। আর সাথে তোমাকেও পেয়ে যাই। তবে আসল বিষয় হলো দায়িত্বের খাতিরে মনে অনেক মানুষই জায়গা করে নেয় কিন্তু আমি কাউকে ধরে রাখতে পারি না। কারণ আমার একটার  পর একটা মিশন চলমান।”

ইরফানের পরিচয় পেয়ে হতবাক হয়ে যায় মম। কিছুক্ষণ স্তব্দতা। তারপর ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে, “এই জনমে তোমাকে পেয়েছিলাম, জানি না সারাজীবনের জন্যে পাবো কিনা, তবে তোমার প্রতি আমার অন্তরের টান চিরদিন থাকবে।”

সোমবার, ১৮ আগস্ট ২০২৫

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy