

আমরা জানি, প্রাতঃকাল শব্দের অর্থ হলো ভোরবেলা বা সকাল। এটি দিনের প্রথম ভাগকে বোঝায়, যখন সূর্যোদয় হয় এবং চারপাশ আলোকময় হয়ে ওঠে। এটি দিনের প্রথম ভাগ, যা সূর্যোদয়ের সময় এবং আলো আসার সাথে সাথে শুরু হয়। পবিত্রশাস্ত্রে প্রাতঃকাল অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। কেননা প্রাতঃকালের উপাসনা আত্মিক শান্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়। সারাটি দিন শান্তি ও প্রশান্তিতে অতিবাহিত হয়ে থাকে। সত্যিই ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে মানসিক একাগ্রতা বাড়ে এবং মনের ক্লান্তি দূর হয়। আমরা আমাদের জীবন দিনের শুরুতে ঈশ্বরের কাছে তুলে দিতে পারি। একটি দিনের শুরুতেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশিত হলে আমাদের আশীবাদ লাভ হয়। প্রাতঃকাল সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে আসার একটি উপায়ও হতে পারে।
ঈশ্বর প্রাতঃকালকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক আদেশ দিয়েছেন। যাত্রাপুস্তক ১২:১০ পদে রয়েছে, ‘আর প্রাতঃকাল পর্যন্ত তাহার কিছুই রাখিও না; কিন্তু প্রাতঃকাল পর্যন্ত যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা অগ্নিতে পোড়াইয়া ফেলিও।’ সৃষ্টির শুরুতে আমরা দেখি, ঈশ্বর প্রাতঃকালের উল্লেখ করেছেন (আদিপুস্তক ১:৫; আদিপুস্তক ১:৮; আদিপুস্তক ১:১৩; আদিপুস্তক ১:১৯; আদিপুস্তক ১:২৩; আদিপুস্তক ১:৩১)। আমরা পবিত্র বাইবেলের মাধ্যমে জানতে পারি যে, সদাপ্রভু অনেক কাজে প্রাতঃকাল ব্যবহার করেছিলেন। যাত্রাপুস্তক ১০:১৩ পদে রয়েছে, ‘তখন মোশি মিসর দেশের উপরে আপন যষ্টি বিস্তার করিলেন, তাহাতে সদাপ্রভু সমস্ত দিন ও সমস্ত রাত্রি দেশে পূর্বীয় বায়ু বহাইলেন, আর প্রাতঃকাল হইলে পূর্বীয় বায়ু পঙ্গপাল উঠাইয়া আনিল।’ যাত্রাপুস্তক ১৪:২৭ পদে রয়েছে, ‘তখন মোশি সমুদ্রের উপরে হস্ত বিস্তার করিলেন, আর প্রাতঃকাল হইতে না হইতে সমুদ্র পুনরায় সমান হইয়া গেল; তাহাতে মিসরীয়েরা তাহার দিকেই পলায়ন করিল; আর সদাপ্রভু সমুদ্রের মধ্যে মিসরীয়দিগকে ঠেলিয়া দিলেন।’

যাত্রাপুস্তক ১৬:৭ পদে রয়েছে, ‘আর প্রাতঃকাল হইলে তোমরা সদাপ্রভুর প্রতাপ দেখিতে পাইবে, কেননা সদাপ্রভুর বিরুদ্ধে তোমাদের যে বচসা, তাহা তিনি শুনিয়াছেন। আমরা কে যে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে বচসা কর?’ এখানে আমরা দেখতে পাই যে, সদাপ্রভুর মহিমা আমরা প্রভাতের আলোতে দেখতে পাই। এ অংশে ইস্রায়েলীয়দের মিশর থেকে বের হয়ে আসার পর মরুভ‚মিতে খাদ্য সঙ্কটের সময় সদাপ্রভু তাদের উদ্দেশ্যে এ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, সন্ধ্যায় মাংস এবং সকালে রুটি দিয়ে তাদের অভাব পূরণ করবেন এবং এর মাধ্যমে তারা সদাপ্রভুকে চিনতে পারবে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপট হলো, মিশর থেকে বেরিয়ে আসার পর ইস্রায়েলীয়রা খাদ্য সংকটে পড়ে সদাপ্রভুর উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলো। তারা মোশির কাছে অভিযোগ করে বলেছিলো যে, তাদের মিশরীয়দের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত ছিলো, যেখানে তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য ছিলো। তখন সদাপ্রভু মোশিকে বলেন, তিনি ইস্রায়েলীয়দের অভাব পূরণ করবেন এবং এর মাধ্যমে তারা জানতে পারবে যে তিনিই তাদের ঈশ্বর। সদাপ্রভু সন্ধ্যায় কোয়েল পাখি এবং সকালে মান্না (এক প্রকার খাদ্য) দিয়ে তাদের অভাব পূরণ করেন। এ ঘটনার মাধ্যমে ইস্রায়েলীয়রা সদাপ্রভুর প্রতাপ ও করুণা দেখতে পায়। আর আমরাও সদাপ্রভুর করুণা সবসময় দেখি। সদাপ্রভুর মহিমা ও করুণা আমরা সকালের আলোতে দেখতে পাবো। অতএব, ঈশ্বর আমাদের অন্তরের কথা জানেন। আমরা আমাদের সময়গুলো তখন দুঃখে থাকি, তখন সদাপ্রভুকেই দোষারোপ করতে কুণ্ঠবোধ করি না; কিন্তু ঈশ্বর আমাদের পরিকল্পনা, চিন্তা, ভাবনা সবই জানেন। কাজেই পরস্পরের বিরুদ্ধে বচনা করা উচিত নয়।
এখন যেমন, তেমনি আদিতেও প্রাতঃকালকে সীমা হিসেবে গণনা করা হতো। যেমন-রূতের বিবরণ ৩:১৪ পদে আমরা দেখতে পাই, ‘তাহাতে রূৎ প্রাতঃকাল পর্যন্ত তাঁহার চরণসমীপে শুইয়া রহিল, পরে কেহ তাহাকে চিনিতে পারে, এমন সময় না হইতে উঠিল; কারণ বোয়স কহিলেন, খামারে এই স্ত্রীলোকটি যে আসিয়াছে, ইহা লোকে জ্ঞাত না হউক।’ কেননা দিনের বেলা সকলের হাঁটাচলা ও আনাগোনা শুরু হয়। তখন সবকিছুই দেখা যায় ও চিনতে পারে। আর তাছাড়া দিনের বেলা পরস্পরের সাথে মানুষ কথা বলে; এতে পরস্পরের বিষয়ে জানতে পারে এবং গোপনীয়তা না থেকে প্রকাশিত হয়ে যায়। এজন্যেই প্রাতঃকালেই যেন কেউ চিনতে না পারে-উঠে যেতে বলা হয়েছে।
মোশী প্রাতঃকাল হতে সন্ধ্যা অবধি বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। আর লোকেরাই ঐসময়ে মোশীর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকতো (যাত্রাপুস্তক ১৮:১৩)। তাছাড়া লোকের মোশীর আদেশও যথাযথভাবে পালন করতো (যাত্রাপুস্তক ১৬:২৪)। যাত্রাপুস্তক ১৮:১৪ পদে আমরা অনুযোগের বিষয়ে দেখতে পাই, যা’ মোশীর শ্বশুর করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তখন লোকদের প্রতি মোশি যাহা যাহা করিতেছেন, তাঁহার শ্বশুর তাহা দেখিয়া কহিলেন, তুমি লোকদের প্রতি এ কেমন ব্যবহার করিতেছ? কেন তুমি একাকী বসিয়া থাক, আর সমস্ত লোক প্রাতঃকাল অবধি সন্ধ্যাকাল পর্যন্ত তোমার নিকটে দাঁড়াইয়া থাকে?’ …আমার উৎসব সম্পর্কীয় মেদ প্রাতঃকাল পর্যন্ত সমস্ত রাত্রি না থাকুক (যাত্রাপুস্তক ২৩:১৮)। এর মানে, আমি চাই না যে উৎসবের কারণে আমার শরীরে মেদ জমা হোক-এখানে এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে “উৎসব সম্পর্কীয় মেদ” বলতে উৎসবের সময় অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়ার কারণে শরীরে জমা হওয়া মেদকে বোঝানো হয়েছে। আর এ মেদ যেন সারারাত ধরে না থাকে, অর্থাৎ, দ্রæত কমে যায়। রূতের বিবরণ ৩:১৩ পদে আমরা প্রতিশ্রæতি দেখতে পাই। সেখানে রয়েছে, আজ রাত থাকুক, কাল সকালে যদি সে তোমাকে মুক্তি দেয়। এখানে একটি পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে কেউ হয়তো বন্দী আছে বা কোনো কারণে আটকে আছে; তাকে বলা হচ্ছে যে, আজ রাত থাকুক, কাল সকালে যদি মুক্তি মেলে। কিন্তু যদি মুক্ত না করে তাহলে জীবন্ত সদাপ্রভুর দিব্য করে বলা হয়েছে যে, অবশ্যই মুক্ত করা হবে। অতএব, তুমি প্রাতঃকাল পর্যন্ত শুইয়া থাক। এখানে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি সেসময়ে প্রাতঃকালকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে (রূতের বিবরণ ২:৭)। তৎকালে প্রাতঃকাল সময়কে প্রাধান্য দেয়া হতো; কেননা প্রাতঃকাল হতেই সমস্ত দিনের কাজ শুরু হয়। (বিচারকর্তৃগণ ১৯:২৭) এখানে এ কথার অর্থ হলো, সকালে যখন তার স্বামী ঘুম থেকে উঠলো, তখন সে পথে বের হওয়ার জন্য ঘরের দরজা খুলে বাইরে গেল। আমরা ইস্রায়েল-সন্তানদের পুরুষানুক্রমে পালনীয় চিরস্থায়ী নিয়ম হিসেবেও দেখতে পাই যে, সমাগম-তাম্বুতে সাক্ষ্য-সিন্দুকের সম্মুখে স্থিত তিরস্করিণীর বাহিরে হারোণ ও তাহার পুত্রগণ সন্ধ্যা অবধি প্রাতঃকাল পর্যন্ত সদাপ্রভুর সম্মুখে তাহা প্রস্তুত রাখতো (যাত্রাপুস্তক ২৭:২১)। যাত্রাপুস্তক ২৯:৩৪ পদে বলা হয়েছে যে, উৎসর্গ করা মাংস ও রুটি যা পুরোহিতদের অভিষেকের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কোনো অংশ যদি পরদিন প্রাতঃাল পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তা’ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কেউ তা খেতে পারবে না, কারণ সেগুলো পবিত্র বস্তু। এর অর্থ হলো, ঈশ্বরকে উৎসর্গ করা জিনিসগুলো অত্যন্ত পবিত্র এবং সেগুলোর সম্মান বজায় রাখা জরুরি। এ পবিত্র জিনিসগুলো নির্দিষ্ট সময়ের পরে আর খাওয়া যাবে না, কারণ তা ঈশ্বরের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করতে পারে। তাই, সেগুলো নষ্ট না করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলোর পবিত্রতা অক্ষুণœ থাকে। যাত্রাপুস্তক ৩৪:২৫ পদে আমরা দেখি যে, প্রাতঃকালকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রাতঃকাল (সকাল) এর উপর গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো, এটি পবিত্রতা এবং ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধার একটি প্রতীক। এ আদেশে মূলত পবিত্রতা বজায় রাখা: নিস্তারপর্বের বলি এবং তাড়ীবিহীন ভক্ষ্যগুলো ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়, তাই সেগুলো অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য। প্রাচীন ইসরায়েলী প্রথার একটি অংশ ছিল যে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত খাবার এক দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলতে হবে এবং পরের দিনের জন্য কোনো অংশ অবশিষ্ট রাখা যাবে না। অবশিষ্ট থাকলে তা পুড়িয়ে ফেলতে হতো, যাতে কোনো পবিত্র বস্তু অপবিত্র না হয় বা নষ্ট না হয়।
লেবীয় পুস্তক ৭:১৫ পদে, প্রাতঃকাল (সকাল) পর্যন্ত মঙ্গলার্থক স্তববলির মাংস না রাখার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার কারণ হলো : পবিত্রতার সংরক্ষণ: মঙ্গলার্থক বলি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো। বাইবেলে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা সবকিছুকেই পবিত্র বলে গণ্য করা হয়। এই পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সকাল পর্যন্ত রেখে দিলে মাংসটি পচে যেতে বা অপবিত্র হয়ে যেতে পারত, যা ঈশ্বরের প্রতি অসম্মানজনক। তাৎক্ষণিক ভোজন: এই বলির একটি উদ্দেশ্য ছিল উৎসর্গকারী এবং যাজকদের মধ্যে ঈশ্বরের সাথে একটি শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় ভোজের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করা। এই ভোজটি উৎসর্গের দিনেই সম্পন্ন করার নিয়ম ছিল, যাতে এই আনন্দময় অভিজ্ঞতাটি সজীব থাকে। অসম্মান এড়ানো: দীর্ঘ সময় ধরে পবিত্র মাংস রেখে দিলে তা সাধারণ খাদ্যের মতো মনে হতে পারত এবং এর বিশেষ পবিত্রতা ও গুরুত্ব হ্রাস পেত। এটি ঈশ্বরের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং ভক্তিকে প্রকাশ করত যে, তারা ঈশ্বরের আদেশকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। এ নিয়মটি কেবল একটি খাদ্যবিষয়ক নিয়ম ছিল না, বরং এটি ছিল ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ ভক্তি, সম্মান এবং আজ্ঞাপালনের একটি বহিঃপ্রকাশ। আর মঙ্গলার্থক স্তববলির মাংস উৎসর্গের দিনেই ভোজন করিতে হইবে; তাহার কিছুই প্রাতঃকাল পর্যন্ত রাখা যাইবে না। লেবীয় পুস্তক ২২:৩০ পদে রয়েছে, ‘সেই দিনে তাহা ভোজন করিতে হইবে; তোমরা প্রাতঃকাল পর্যন্ত তাহার কিছু অবশিষ্ট রাখিও না; আমি সদাপ্রভু।’ এখানে একথাটি বলার মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর নিজের কর্তৃত্ব এবং পবিত্রতা প্রকাশ করেছেন। বাইবেলে এ ধরনের নির্দেশগুলোতে প্রায়শই “আমি সদাপ্রভু” বা “আমি তোমাদের ঈশ্বর” এ ধরনের উক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে ঈশ্বর বোঝান যে, এ নিয়মগুলো কোনো সাধারণ মানবীয় নিয়ম নয়, বরং সরাসরি তাঁর কাছ থেকে এসেছে। তিনি মহাবিশ্বের সার্বভৌম প্রভু এবং তাঁর আদেশের কোনো ব্যতিক্রম নেই। এখানে আজ্ঞাপালনের গুরুত্ব রয়েছে। ইসরায়েলীয়দের মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের এ নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত; কারণ এটি তাদের ঈশ্বরের আদেশ। ঈশ্বরের আদেশ মেনে চলা তাদের ধর্মীয় জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো। বলি বা উৎসর্গের মাংস পরের দিন পর্যন্ত না রেখে সেই দিনেই ভোজন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো; কারণ, উৎসর্গিত বস্তুগুলো অত্যন্ত পবিত্র ছিলো। “আমি সদাপ্রভু” এ কথাটি এই পবিত্রতার গুরুত্বকে আরও জোরদার করে। এ পবিত্রতা ঈশ্বরের নিজস্ব পবিত্রতারই প্রতিফলন। তাই, ঈশ্বরের প্রতি সম্মান জানাতে এবং তাঁর পবিত্রতা বজায় রাখতে এই নিয়মগুলো কঠোরভাবে পালন করা আবশ্যক ছিলো।
গণনা পুস্তক ৯:১২ পদে বলা হয়েছে যে নিস্তারপর্বের বলি প্রাতঃকাল পর্যন্ত রাখা যাবে না এবং তার কোনো অস্থি (হাড়) ভাঙা যাবে না। এর কারণ হলো: নিস্তারপর্বের বলিদ্রব্য উৎসর্গের রাতেই খেয়ে ফেলতে হতো। এ নিয়মটি ছিলো পবিত্রতার প্রতীক। ঈশ্বরকে উৎসর্গ করা খাবার পরের দিনের জন্যে রেখে দিলে তা’ অপবিত্র হয়ে যেতে পারতো। এটি যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক চিত্র। বাইবেলের নতুন নিয়মে (যোহন ১৯:৩৬) বলা হয়েছে যে, যখন যিশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়, তখন তার কোনো অস্থি ভাঙা হয়নি। এটি ছিলো পুরাতন নিয়মের এ আদেশেরই একটি পূর্ণতা। নিস্তারপর্বের মেষশাবক ছিল যিশুর প্রতীক, যিনি মানবজাতির পাপের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। গণনা পুস্তক ৯:১৫ পদে বলা হয়েছে যে, সাক্ষ্যতাম্বু স্থাপিত হওয়ার পর, দিনের বেলায় একটি মেঘ এসে তা ঢেকে রাখত, আর রাতে সেই মেঘ আগুনের মতো রূপ নিতো এবং তা’ সকাল পর্যন্ত থাকতো। এখানে প্রাতঃকাল পর্যন্ত থাকা নির্দেশ করে যে, ঈশ্বরের উপস্থিতি স্থায়ী এবং অবিরাম ছিলো। এ মেঘ এবং অগ্নির স্তম্ভ ছিলো ঈশ্বরের নির্দেশনা এবং সুরক্ষার প্রতীক। এ অলৌকিক ঘটনাটি ছিলো ইসরায়েলীয়দের কাছে ঈশ্বরের সরাসরি উপস্থিতির দৃশ্যমান প্রমাণ। দিনের মেঘ এবং রাতের আগুন তাদের মনে করিয়ে দিতো যে, ঈশ্বর তাদের সঙ্গে আছেন এবং তাদের পথ দেখাচ্ছেন। এ অলৌকিক ঘটনা প্রতিদিন সকালে শুরু হয়ে পরের দিন সকাল পর্যন্ত চলতো। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে ঈশ্বরের নির্দেশনা কোনো ক্ষণিকের বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিনের বেলায় মেঘ সূর্যের তাপ থেকে তাদের রক্ষা করত, আর রাতের আগুন ঠাÐা থেকে উষ্ণতা দিত। এটি ঈশ্বরের সুরক্ষার প্রতীক ছিলো।
গণনা পুস্তক ৯:২১ পদে বলা হয়েছে যে, যদি মেঘ সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত তাঁবুর ওপর থাকতো, তাহলে ইসরায়েলীয়রা সকালে যাত্রা করতো। আবার যদি মেঘ দিনের বেলায় বা রাতের বেলায় উঠে যেতো, তাহলে তারা তখনই যাত্রা শুরু করতো। এখানে প্রাতঃকাল পর্যন্ত মেঘ থাকার বিষয়টি আবারও ঈশ্বরের নির্দেশনার গুরুত্বকে তুলে ধরে। এর মূল বিষয়গুলো হলো: ঈশ্বরের সময় মেনে চলা: এ পদ থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসরায়েলীয়রা নিজেদের ইচ্ছামতো নয়, বরং কেবল ঈশ্বরের নির্দেশে যাত্রা করত। মেঘের গতিবিধি ছিল তাদের জন্যে ঈশ্বরের নির্দেশের চিহ্ন। মেঘ তাঁবুর ওপর থাকা মানে ছিলো ঈশ্বর সেখানে থাকার অনুমতি দিচ্ছেন, আর মেঘ উঠে যাওয়া মানে ছিলো তিনি তাদের পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছেন। ইসরায়েলীয়দের এ মেঘের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হতো এবং যে কোনো সময় যাত্রার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হতো। এটি তাদের শিখিয়েছিল যে ঈশ্বরের প্রতি তাদের বিশ্বাস এবং আনুগত্য কতোটা জরুরি। মেঘ এবং আগুনের স্তম্ভ ছিলো ঈশ্বরের উপস্থিতির প্রতীক। এ অলৌকিক ঘটনাটি তাদের মনে করিয়ে দিতো যে. তাদের যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ঈশ্বর তাদের সঙ্গে আছেন। সুতরাং, এ পদে প্রাতঃকাল শব্দটি ঈশ্বরের স্থায়ী এবং সঠিক নির্দেশনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা’ ইসরায়েলীয়দের জীবন ও যাত্রাপথকে পরিচালিত করতো। বিচারকর্তৃগণ ৬:৩১ পদে আমরা দেখতে পাই, যোয়াশ তার প্রতিক‚লে দাঁড়ানো লোকদের বললেন, “তোমরাই কি বালের পক্ষে বিবাদ করবে? তোমরাই কি তাকে উদ্ধার করবে? যে কেউ তার পক্ষে বিবাদ করে, সে এই সকালে নিহত হবে। যদি বাল দেবতা হয়, তবে সে নিজেই নিজের পক্ষে বিবাদ করুক, কারণ তার যজ্ঞবেদি ভেঙে ফেলা হয়েছে।” দ্বিতীয় বিবরণ ১৬:৪ পদে প্রাতঃকাল বিষয়ে রয়েছে, “সাত দিন তোমার সমস্ত সীমানার মধ্যে কোনো তাড়ী দেখা যাবে না। আর প্রথম দিন সন্ধ্যায় যে বলিদান করবে, তার মাংসের কোনো অংশই সারা রাত থেকে সকাল পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে না।” দ্বিতীয় বিবরণ ২৮:৬৭ পদে রয়েছে, “তোমার অন্তরে যে ভয় থাকবে এবং তোমার চোখে যে ভয়ংকর দৃশ্য দেখবে, তাতে সকালে বলবে, ‘আহা, কখন সন্ধ্যা হবে?’ আর সন্ধ্যায় বলবে, ‘আহা, কখন সকাল হবে?'” বাইবেলের লেবীয় পুস্তকের ১৯:১৩ পদের শ্লোকের বাক্যটির অর্থ হলো, সমাজে ন্যায় ও সততার সঙ্গে জীবনযাপন করা উচিত। আমাদের প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান প্রদশন করা উচিত। “তুমি তোমার প্রতিবেশীর ওপর অত্যাচার করবে না” – এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, আমাদের উচিত প্রতিবেশীদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করা। এটি কেবল শারীরিক অত্যাচার নয়, বরং যেকোনো ধরনের হয়রানি, শোষণ বা অন্যায় আচরণকেও বোঝায়। সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখা উচিত। “তার জিনিসপত্র চুরি করবে না”-এটি সরাসরি চুরি করাকে নিষেধ করে, যা’ সম্পদ বা অধিকারের প্রতি সততা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। আমাদের উচিত শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। “একজন শ্রমিকের মজুরি সারারাত ধরে সকাল পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে দেবে না”-এ অংশটি শ্রমিকের অধিকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। প্রাচীন সমাজে দিনমজুররা তাদের দৈনন্দিন উপার্জনের উপর নির্ভরশীল ছিলো। মজুরি আটকে রাখা হলে তাদের পরিবারকে অনাহারে থাকতে হতো। তাই, এ আদেশটি দ্রæত মজুরি পরিশোধ করার একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা, যা’ অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ওপর জোর দেয়। এ শ্লোকটি সামগ্রিকভাবে বোঝায় যে, শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে ন্যায়, সততা এবং মানবিকতার অনুশীলন করাও ঈশ্বরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি মানবিক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের নির্দেশনা।
এখানে আমরা জানতে পারি যে, ‘প্রভাতকাল’ শব্দটি বাইবেলে কেবল দিনের প্রথম অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এর গভীর আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং আনুগত্যের প্রতীক। বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে প্রভাতকালকে ঈশ্বরের উপস্থিতি, তাঁর করুণা এবং সঠিক নির্দেশনার সময় হিসেবে দেখানো হয়েছে। সকালের উপাসনা ও প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষ মানসিক শান্তি ও একাগ্রতা লাভ করে। একই সঙ্গে, বিভিন্ন বিধানের মাধ্যমে এটি শেখানো হয়েছে যে, ঈশ্বরকে উৎসর্গীকৃত বস্তু পবিত্র এবং তা’ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত; যা’ তাঁর প্রতি সম্মান ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। শ্রমিকের মজুরি দ্রæত পরিশোধ করার নির্দেশনার মধ্যে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে; যা’ একটি সুস্থ সমাজের জন্যে অপরিহার্য। একইভাবে, ইসরায়েলীয়দের যাত্রাপথে মেঘ ও অগ্নির স্তম্ভের মাধ্যমে ঈশ্বরের নির্দেশনা প্রভাতকাল পর্যন্ত স্থায়ী থাকতো; যা’ বোঝায় যে, ঈশ্বরের করুণা ও পথনির্দেশনা অবিরাম এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে থাকেন। সুতরাং, প্রভাতকাল কেবল একটি নতুন দিনের সূচনা নয়, বরং এটি বিশ্বাস, ন্যায়পরায়ণতা, এবং ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ সমর্পণের একটি সুযোগ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি নতুনদিন ঈশ্বরের করুণা ও আশীর্বাদের মাধ্যমে শুরু হয়। আমেন।
বুধবার, ২০ আগস্ট ২০২৫
৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন













