তাড়াশের সরাপপুরে মদের কারবার: যুবসমাজ বিপন্ন, প্রশাসনের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ

জিল্লুর রহমান :

সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের পৌষার সরাপপুর গ্রাম। এক সময় এই গ্রাম ছিল কৃষিনির্ভর, শান্তিপূর্ণ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে চিত্র। এখন এই গ্রাম পরিচিত এক ভিন্ন পরিচয়ে—মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য তৈরির কেন্দ্র হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষায়, “সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মদের আসর, মাতালদের হট্টগোলে মুখ থুবড়ে পড়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশ।”

মদের উৎপাদন ও সরবরাহ

সরাপপুর গ্রামের বেশ কিছু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মদ তৈরির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়ভাবে তৈরি এই মদ শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হয়। কেউ কেউ সরাসরি গ্রামে এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যায়, আবার কেউ ঘরে বসেই পান করে। সন্ধ্যার পর থেকেই পাড়া-মহল্লায় শুরু হয় মদের আসর। যুবক থেকে মধ্যবয়সী, কেউ বাদ যায় না। মাতালদের চিৎকার, ঝগড়া, এমনকি মারামারিও ঘটে প্রায়ই।

এই মদ তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু পরিবার নিজেদের বাড়ির আঙিনায় কিংবা গোপন ঘরে মদ তৈরি করে। ব্যবহৃত হয় চাল, গুড়, খেজুর, কখনোবা রাসায়নিক দ্রব্য। এসব মদ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

উঠতি বয়সের ছেলেরা বিপথে

এই অবৈধ ব্যবসার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে উঠতি বয়সের ছেলেদের ওপর। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেক তরুণ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। প্রথমে কৌতূহল, পরে অভ্যাস, আর শেষে আসক্তি। ফলে শিক্ষাজীবন নষ্ট হচ্ছে, পরিবারে অশান্তি বাড়ছে, সমাজে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা।

স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “আমাদের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই এখন নিয়মিত মদ্যপান করে। ক্লাসে মনোযোগ নেই, পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ। অভিভাবকরা চিন্তিত, কিন্তু কিছু করার নেই।”

প্রশাসনের ভূমিকা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবৈধ ব্যবসা প্রশাসনের নাকের ডগায় চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়, কিন্তু তা স্থায়ী কোনো সমাধান দেয় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “আমরা বহুবার ইউএনও, থানায় অভিযোগ করেছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। বরং যারা প্রতিবাদ করে, তাদের হুমকি দেওয়া হয়।”

সামাজিক ক্ষয়

মদের এই অবাধ প্রবাহ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সমাজের জন্যও ভয়াবহ। পারিবারিক অশান্তি, নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, এমনকি খুনের মতো অপরাধও বাড়ছে। গ্রামে এখন সন্ধ্যার পর নারীরা বাইরে বের হতে ভয় পান। শিশুরা ভয় পায় মাতালদের চিৎকারে।

একজন নারী বলেন, “আমার স্বামী আগে ভালো মানুষ ছিলেন। এখন প্রতিদিন মদ খেয়ে এসে আমাকে মারধর করেন। সন্তানদের সামনে অপমানিত হতে হয়।”

 সমাধানের পথ

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ। নিয়মিত অভিযান, মদ তৈরির উপকরণ ধ্বংস, ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা, এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।

স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন কঠোর হোক। শুধু অভিযান নয়, স্থায়ী সমাধান দরকার। যুবকদের রক্ষা করতে হবে, সমাজকে রক্ষা করতে হবে।”

সরাপপুর গ্রামের এই বাস্তবতা শুধু একটি গ্রামের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রশাসনের উদাসীনতা, সমাজের অসচেতনতা, এবং কিছু অসাধু ব্যক্তির লোভ একত্রে একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই সময়, এই অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। না হলে, ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।

মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড

You might like

About the Author: priyoshomoy