

| মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত শিক্ষা পৌঁছে দিতে প্রায় প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। কোথাও কোথাও জনসংখ্যা ও এলাকার চাহিদা অনুযায়ী একাধিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও অন্যান্য সুবিধার পেছনে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে।

কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন সদর এলাকার কিছু বিদ্যালয় ছাড়া গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। অনেক বিদ্যালয় কার্যত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে যে চিত্র দেখা যায়, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে দ্রুতগতিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও নূরানি মাদরাসা। ফলে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ তাদের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ের পরিবর্তে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন।
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অনেক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকে। কোথাও ছয়জন শিক্ষকের স্থলে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র তিনজন শিক্ষক। ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
দ্বিতীয়ত, কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতারও ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। পাঠদানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সময় ব্যয় করার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকার অনেক মেধাবী শিক্ষক বিভিন্ন উপায়ে শহরমুখী বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষক থেকে বঞ্চিত হয়।
চতুর্থত, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার কিছু বিদ্যালয়ে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে, কোনো কোনো শিক্ষক নিজ দায়িত্বে না থেকে খণ্ডকালীন ব্যক্তিকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করান। যদিও এটি নিয়মবহির্ভূত, তবুও যথাযথ নজরদারির অভাবে এমন অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।
ফলাফল হিসেবে আজ এমন বিদ্যালয়ও দেখা যায়, যেখানে পুরো স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন। একটি দেশের জন্য এটি অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র।
অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হলেও অনেক অভিভাবক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে সন্তান ভর্তি করাতে আগ্রহী। এর প্রধান কারণ হলো তারা সেখানে অধিক শৃঙ্খলা, নিয়মিত পাঠদান, বাড়তি নজরদারি এবং তুলনামূলক ভালো শিক্ষার পরিবেশ পাচ্ছেন বলে মনে করেন।
এ বাস্তবতায় শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নিকট বিনীত অনুরোধ—
১. গ্রামাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. শিক্ষক সংকট দ্রুত দূর করা এবং শূন্য পদ পূরণ করা।
৩. প্রধান শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।
৪. দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি চালু করা।
৫. কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতিমালা ও ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা।
৬. সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু করা, যাতে অভিভাবকদের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।
৭. শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় শিক্ষা পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান বৃদ্ধি করা।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম ধাপ। এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে পুনরায় শিক্ষার্থীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমরা আশা করি, সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনের সময়োপযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।
লেখক পরিচিতি: লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি, সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক
















