হাজার কোটি টাকা লোপাটের ‘হুন্ডি কাজল’ ভারতে মারা গেলেন

মালিকুজ্জামান কাকা :
‘এক লাখ টাকা কাজলে কর ইনভেস্ট
প্রতি মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা লাভ, বেস্ট।’
এটি হুন্ডি কাজলের স্লোগান। তবে তা ছিল সেরা ভন্ডামি। তার অপরাধের জের এখনো টেনে বেড়াচ্ছে ভুক্তভুগি মানুষ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের আলোচিত ও বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রধান হোতা ফারুক আহমেদ কাজল ওরফে ‘হুন্ডি কাজল’ মৃত্যু বরণ করেছেন। গত বুধবার রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ থানা শহরের এক বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হুন্ডি কাজল দৈনিক জনকণ্ঠের যশোরের নন্দিত সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল হত্যায় সম্প্রীক্ত ছিলেন বলে জোর প্রচার আছে।

মৃত্যু কালে হুন্ডি কাজলের বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে পশ্চিমবঙ্গে কোন কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা ও তার ছোট ভাই কবি চঞ্চল শাহরিয়ার।

আশির দশকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে প্রতিভাবান ফুটবলার ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। ১৯৯৫ সালের দিকে বিপুল মুনাফার কথা বলে লোকের কাছ থেকে শত সহস্র কোটি টাকা সংগ্রহ শুরু করেন। প্রথমাবস্থায় মানুষ লভ্যাংশ পাওয়ায় ক্রমেই তার ‘সিন্ডিকেট ব্যাংক’ রমরমা রূপ নেয়। তৈরি হয় বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। কোটচাঁদপুর হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম ব্যাস্ততম এলাকা। তার এজেন্ট ছিল প্রায় ২০ হাজার নারী পুরুষ। এরাই লোভনীয় অফারে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতেন। তার ছিল সর্বহারা সংযোগ। জানা যায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির দাদা তপন ও চুয়াডাঙ্গার লাল্টু ছাড়াও অন্তত জনা ত্রিশেক সর্বহারা নেতা তার কাছ থেকে অর্থ নিতেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায় এক লাখ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক ১০ লাখ টাকা জমা করতেন প্রতিদিন গড়ে হাজার জন। গরীব কেউ কেউ ৫০ হাজার টাকা দিতেন। কয়েক জন খাতায় নাম লিখে রাখতেন। তাদের একটি টোকেন ধরিয়ে দেওয়া হোত।

কাজলের অবৈধ কালো অর্থ আদায় কে স্থানীয়ভাবে ‘হুন্ডি ব্যবসা’ বলা হতো। আর কাজলের নাম হয়ে যায় ‘হুন্ডি কাজল’। এই কারবারে কোটচাঁদপুর ছাড়াও ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজধানী ঢাকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার লাখ লাখ মানুষ ‘বিনিয়োগ’ করেন। কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, মাঝারি ও বড় ব্যাবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জমিজমা সম্পদ বিক্রি করে অর্থ লগ্নি করেন। এমনকি ফকিররাও তাকে টাকা দিয়ে বিপাকে পড়েন। একপর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, এই এলাকার ব্যাংক শাখা গুলো অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। সব টাকা জড়ো হয় কাজলের সিন্ডিকেট ব্যাংকে।

কাজলের হুন্ডি কারবার মুখ থুবড়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি। কারণ দৃশ্যত তার কোনো ব্যবসা ছিল না। সে একের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাকা থেকে অন্যজনকে দুই এক মাস কিছু টাকা দিতেন। চুয়াডাঙ্গার এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী এই কারবারের নেপথ্যের মূল ব্যক্তি ছিলেন বলে সেসময় গণমাধ্যমে খবর আসে। যদিও তিনি বরাবরই ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে তার টাকা মাইক্রো বোঝাই হয়ে বেনাপোল দিয়ে ভারতে চলে যেতো শোনা যায়। তার বস্তা ব্যাগে বোঝাই অর্থসহ মাইক্রো সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন দুপুরের পর যশোর মুজিব সড়ক হয়ে বেনাপোলে যেত বলে জনশ্রুতি ও প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছে।
১৯৯৯ সালে কাজলের কারবার ধ্বসে পড়ে। চারিদিকে শুরু হয় হাহাকার। তার কাছে মানুষ মোট কত টাকা লগ্নি করেছিল, তার হিসেব কোথাও নেই। ধারণা করা হয়, এই অংক কয়েক হাজার কোটি টাকা। কারবারে পতন এবং কাজল গ্রেপ্তারে লাখ লাখ লগ্নিকারীরা পথে বসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কোটচাঁদপুর সফর করে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা উদ্ধারের আশ্বাস দেন। লগ্নিকারীদের টাকা ফেরত দিতে কাজলকে নজিরবিহীন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কিছুতেই লাভ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ের সরকারি দলের কয়েক নেতা ও ঝিনাইদহের পুলিশ কর্তাদের কেউ কেউ কাজলের কাছ থাকা কিছু টাকা লুটে নেন।

অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন থানায় কয়েকটি মামলা হয়ে। সেসব মামলায় জামিনলাভের পর সে ভারতে পালিয়ে যায়। সেখানে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

কাজলের ছোট ভাই কবি চঞ্চল শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এ তথ্য সত্য।’
কাজলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগম কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বর্তমানে কোটচাঁদপুরের সলেমান এলাকায় থাকেন।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম জানান, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর খবর জেনেছি। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন। বর্তমানে তার নামে পাঁচটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

প্রকাশিত : সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ খ্রি
.

You might like

About the Author: priyoshomoy