

রাকিবুল হাসান, মনপুরা প্রতিনিধি :
চলতি বছরে ভোলার মনপুরা উপজেলায় আষাঢ় মাসে ঠিক তেমন একটা বৃষ্টির দেখা মেলেনি। প্রচণ্ড খরা পার করে শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়ে ভারি বর্ষনে প্লাবিত হয়ে যায় এই উপজেলা । শ্রাবণের শেষে আবহাওয়া কিছুটা অনুকুলে আসে। আবহাওয়া অনুকল থাকায় খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমনের বিভিন্ন জাতের ধান গাছের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন মনপুরা কৃষকরা।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা যায় কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যের এমন চিত্র।
মনপুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১২ হাজার ৩০শ ৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উফশী জাতের ৬ হাজার ৪০০ হেক্টর, স্থানীয় ৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হবে।এই জমিতে আমন চাষ করার জন্য ৬শ হেক্টর বীজতলায় চারা ফেলানো হয়েছে।
সরেজমিনে মনপুরা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে পাওয়াটিলার দিয়ে জমি চাষ করা শুরু করেছেন। কেউ জমি প্রস্তুত করছে, কেউ বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলতে আবার কেউ ভাটিয়ালি গানের সুরে সুরে জমিতে চারা রোপণ করতে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
মনপুরায় বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা চুক্তি ভিত্তিতে এসেও কাজ করছেন। দৈনিক মজুরিতে জমিতে ধানের চারা বপণের কাজে তাদের মজুরি মেলে ৭০০ টাকা। এভাবে এক একটি গ্রুপে ১০-১২ জন করে শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করে থাকে।
অধিকাংশ কৃষকরা জানিয়েছে,আষাঢ় মাসে তাপপ্রবাহে পুড়ছিল দেশ। ফলে মনপুরার আবাদি জমিগুলো প্রায়ই পানিশূন্য হয়ে প্রখর রোদে নষ্ট হচ্ছিল বীজতলা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে বিকল্প ব্যবস্থায় সেচের পানিতে আমনের চারা রোপণের চিন্তা করছিলেন, কিন্তু টানা সাত দিনের বিরামহীন বৃষ্টিতে বীজতলা তলিয়ে গেছে। এত করে মনপুরা প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির বীজ তলা পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে । আংশিক ক্ষতি বীজের বয়স বেশি হয়ে গেলে ফলন কমে যায়। পাশাপাশি দেরিতে আবাদ হলে রোগবালাই বেশি হয়। এ অবস্থায় আমন আবাদে কৃষকের সার ও কীটনাশকও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। তাছাড়া তীব্র গরমের কারণে শ্রমিকদের কাজে ধীরগতি এসেছে। সব মিলিয়ে আমন চাষে কৃষকের হাল খরচ, সেচ খরচ ও শ্রমিক খরচ বেশি পড়ছে। এতে লাভ এর চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
উপজেলা দক্ষিন সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আঃ রহমান জানান, আমাদের গোটা গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে। প্রতি বছরের আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে আমরা দল বেঁধে ধান লাগাই। কিন্তু এবার পানিতে অনেক বীজ তলা পঁচে যাওয়া চারার খুব সংকট দেখা দিয়েছে ।
হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনারচর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, আষাঢ় মাসে বর্ষায় রোপা আমনের চারা রোপণ করার সময়। এ বছর আষাঢ়ে বৃষ্টি অনেক কম হয়েছে। শ্রাবণ মাসের শুরুতে রোপা আমনের চারা বপনের উপযুক্ত সময়। কিন্তু এ বছরে মনপুরা বৃষ্টিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই যথা সময়ে রোপা আমন আবাদ করতে সময় লাগছে । সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ার সময়মত অতিবৃষ্টির কারণে অনেক শ্রমিকরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাছাড়া কম হাজিরায় কাজ করতে চায় না। তাই বাহিরের জেলা থেকে শ্রমিকরা চুক্তিতে কাজ করছেন।
রহমানপুর গ্রামের কৃষক শাহে আলম বলেন, এ বছর যে বৃষ্টিপাত আমরা দেখেছি, বিগত ৫ বছর এমন বৃষ্টিপাত আমারা দেখিনি।আমার ৭ বিঘা জমির মধ্যে ইতোমধ্যে ১ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছি। বাকি জমিগুলো ধান রোপণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।টানা বৃষ্টির কারণে বীজ তলায় অনেক চারা পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে ।এখন চারা সংকটে পরছি ।কোথাও কোন আমনের চারা পাওয়া যাচ্ছে না ।এখন ধান রোপণে সমস্যা আছি।
এ বিষয়ে মনপুরা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুরুতেই আমন ধান রোপণের জন্য বীজতলার চারা প্রস্তুত করেন তারা। এরপর শ্রাবণ মাসের শুরু থেকে পুরো মাস জুড়েই মাঠে আমনের চারা রোপণ করেন তারা। কিন্তু এবার শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝিতে অতিবৃষ্টির কারণে তার দুই একর জমির মধ্যে মাত্র বিশ শতক জমিতে চারা রোপণ করতে পেরেছেন। বীজ তলায় চারা পঁচে যাওয়া দুচিন্তায় আছে সে ।
জয়লাল আবেদীন নামে এক কৃষক জানান, কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়িয়ে দেয়। ধানের চারা রোপণের পর যখন রাসায়নিক সারের প্রয়োজন ঠিক তখনই ডিলার ও সার ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সারের মূল্য বাড়িয়ে দেয়, তখন দোকানে দোকানে ধরনা দিয়েও সার পাওয়া যায় না। এমন ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন বলে, সারের কোনো সংকট নেই।
মাষ্টারহাট এলাকার কৃষক মাকসুদ আলম জানান, টানা ৮ থেকে ১০ দিনে ভারি বৃষ্টিতে ২০০ কেজি ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে থাকায় পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এবার আর আমন চাষ করা সম্ভব নয়। নতুন ধান চাষাবাদের জন্য অনেক জায়গায় যোগাযোগ করেও বীজ সংগ্রহ করতে পারিনি।
মনপুরা উপজেলা কৃষি অফিসার আহসান তাওহীদ জানান,মনপুরা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১২ হাজার ৩শ ৫০ হেক্টর জমি চাষের উপযোগী করতে ব্যাস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এখানে রোপা আমনের ব্রি- ৫২ ধান জাতের আবাদ করেন এ এলাকার কৃষকরা। আর কোন বড় ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা ধান গাছের রোগবালাই কম হলে এবারে বাম্পার ফলন ঘরে তুলবেন কুষকরা। এছাড়া কৃষকদের পরামর্শ দিতে আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। আর সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে বিঘা প্রতি ৩০ মন পর্যন্ত ধানের ফলন পাওয়া সম্ভব। এখন পর্যন্ত চারা রোপণ হয়েছে ১০ ভাগ জমিতে ।
তাছাড়া কোন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়িয়ে দেয় আমরা মোবাইল কোর্ড পরিচালনা করবো ।










