তাড়াশে কারেন্ট পোকার ভয়াবহ আক্রমণ: ফলন শূন্যের কোঠায়, কৃষকের মাথায় হাত

জিল্লুর রহমান, সিরাজগঞ্জ, তাড়াশ :
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ‘কারেন্ট পোকা’র আক্রমণে দিশেহারা কৃষক। মাঠের পর মাঠ ধানগাছ শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নের ফলন ঘরে তোলা তো দূরের কথা, অনেক কৃষক এখন কেবল গরুর খড়ের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে ধান কাটছেন। উপজেলার মাধাইনগর, নওগাঁ, তালমসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি।

মাঠের চিত্র: সোনালি স্বপ্ন পুড়ে ছাই

সরেজমিনে মাধাইনগর ইউনিয়নের ওয়াশিন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠে ধানগাছগুলো পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ধান পেকে গেছে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, গাছের গোড়ায় কারেন্ট পোকার আক্রমণে শিষ শুকিয়ে চিটা হয়ে গেছে। ধানে কোনো চাল নেই।

কৃষক এনছাব আলি জানান, “এইবার ৪০ বিঘা জমিতে বোরো লাগাইছিলাম। পুরাটাই কারেন্ট পোকায় খাইয়া ফেলছে। বিঘা প্রতি ৫ থেকে ৬ মন ধান হইতেছে। এর মধ্যে কামলারাই ৫ মন নিয়া যাইতেছে। আমার হাতে কিছুই থাকতেছে না। শুধু গরুর খড়টার জন্য ধান কাটতেছি। না হইলে এই ধান কাইটা লাভ নাই।”

একই গ্রামের কৃষক আলোম, হাকিম ও সোহেল রানা জানান, তাদেরও একই অবস্থা। আলোম বলেন, “কীটনাশক দিয়া কোনো কাজ হয় নাই। স্প্রে করার ২-৩ দিন পর আবার পোকা আইসা ভরে যায়। ১ বিঘা জমিতে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হইছে। এখন ৫-৬ মন ধান বেচলে কামলার টাকাও উঠবো না।”

কী এই ‘কারেন্ট পোকা’?

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, স্থানীয়ভাবে ‘কারেন্ট পোকা’ নামে পরিচিত এই পোকার প্রকৃত নাম বাদামি গাছ ফড়িং বা Brown Plant Hopper (BPH)। এটি ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। আক্রমণ বেশি হলে গাছ দ্রুত শুকিয়ে ‘হপার বার্ন’ হয়। এই পোকা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং এক ক্ষেত থেকে অন্য ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া গরম ও আর্দ্র থাকায় পোকার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

কেন ঠেকানো গেল না আক্রমণ?

কৃষকদের অভিযোগ, তারা প্রথম দিকে পোকার আক্রমণ বুঝতে পারেননি। গাছের গোড়ায় পোকা থাকায় উপর থেকে সহজে দেখা যায় না। যখন পাতা হলুদ হয়ে শুকাতে শুরু করে, তখন স্প্রে করেও কাজ হয়নি।

সোহেল রানা বলেন, “আমরা ডিলারের পরামর্শে ওষুধ দিছি। কিন্তু কাজ হয় নাই। কৃষি অফিসের লোকজন যদি আগে আইসা মাঠ দেখতো, পরামর্শ দিত, তাহলে হয়তো এত ক্ষতি হইতো না।”

তবে কৃষি বিভাগ বলছে, তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও কৃষকদের সচেতন করছে। অনেক কৃষক শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ করায় দমন ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে।

ক্ষতির পরিমাণ ও অর্থনৈতিক ধাক্কা

তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমি কারেন্ট পোকার আক্রমণে আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মাধাইনগর ইউনিয়নেই ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ হেক্টরের বেশি।

বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ গড়ে ১৮-২২ হাজার টাকা। যেখানে স্বাভাবিক ফলন ২০-২২ মন, সেখানে এখন হচ্ছে ৫-৬ মন। প্রতি মন ধানের বাজারদর ১২০০-১৩০০ টাকা। অর্থাৎ বিঘা প্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে ১৫ হাজার টাকারও বেশি। শ্রমিক খরচ মেটানোর পর কৃষকের হাতে থাকছে শুধু খড়।

শ্রমিকরাও বিপাকে

ধান কাটা শ্রমিকরা সাধারণত ধান ভাগে কাটেন। প্রতি ৫ মন ধানে ১ মন শ্রমিকের। কিন্তু ফলন বিপর্যয়ের কারণে শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত। তাড়াশের নওগাঁ গ্রামের ধানকাটা শ্রমিক সর্দার জামাল বলেন, “সারাদিন কাইটা ১০-১২ কেজি ধান পাইতেছি। এতে আমাদের পোষায় না। কিন্তু কৃষকের কষ্ট দেইখা আমরা কম মজুরিতেই কাইটা দিতেছি। না হইলে তাদের খড়টাও হইবো না।”

কৃষি অফিস কী বলছে?

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসার লুৎফুন্নাহার লুনা জানান, “কারেন্ট পোকার আক্রমণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। বীজ, সার ও নগদ অর্থ সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী আমন মৌসুমে যাতে এ ধরনের আক্রমণ না হয়, সেজন্য আগাম সতর্কতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রতিরোধে করণীয়

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারেন্ট পোকা দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরি।
– নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ: সপ্তাহে অন্তত একবার ধানগাছের গোড়া দেখতে হবে।
– আলোক ফাঁদ ব্যবহার: রাতে আলোক ফাঁদ দিয়ে পোকার উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়।
– পরিমিত ইউরিয়া সার: অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারে গাছ নরম হয়, পোকা বেশি আক্রমণ করে।
– অনুমোদিত কীটনাশক: আক্রমণের শুরুতেই পাইমেট্রোজিন, ডিনোটেফুরান বা আইসোপ্রোকার্ব গ্রুপের কীটনাশক গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
– একসাথে ব্যবস্থা: এলাকার সব কৃষক একযোগে দমন ব্যবস্থা নিলে সুফল মেলে।

কৃষকের দাবি

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, শুধু প্রণোদনা নয়, কৃষিঋণ মওকুফ ও বিনাসুদে নতুন ঋণ দিতে হবে। এনছাব আলি বলেন, “এনজিও থাইকা কিস্তি নিয়া আবাদ করছি। এখন ধান না হইলে কিস্তি দিমু কেমনে? সরকার যদি ঋণ মওকুফ না করে, তাইলে আমাদের মাঠে মারা যাওন ছাড়া উপায় নাই।”

তাড়াশের বোরো কৃষকদের এই আর্তনাদ এখন শুধু খড়ের জন্য। সোনালি ধানের যে স্বপ্ন নিয়ে তারা মাঠে নেমেছিলেন, কারেন্ট পোকা সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। কৃষি বিভাগের দ্রুত ও কার্যকর প্রণোদনা এবং আগামী মৌসুমের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনাই এখন তাদের বাঁচার একমাত্র ভরসা।

প্রকাশিত : শনিবার, ০২ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy