
ক্ষুদীরাম দাস :
সত্যিই কি বর্তমান বাস্তব চিত্র অতি ভয়াবহ! হয়তো সকলেই তাই বলবেন। কেননা চারিদিকে তাকালে সে রকম উত্তর ছাড়া আর কিছু পাওয়া কঠিন হবে। তবে বেঁচে থাকারও অবশ্যই অবলম্বন রয়েছে, সেটাও অস্বীকার করা যায় না। কেননা সেটা না থাকলে তো এতোদিন আমরা বেঁচেই থাকতে পারতাম না। কিন্তু বর্তমান চারিদিকের বাস্তব চিত্র সত্যিই ভয়াবহ! আমরা জানি, পৃথিবীজুড়ে বর্ণ এবং সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভেদাভেদ, জাতীয়তাবাদ, উপজাতিগত এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য মানুষের মধ্যে প্রায়ই অসহনশীলতা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়। এর সাথে স্বার্থপরতা তো রয়েছেই। একারণেই ক্ষেত্রেবিশেষে চোখ থাকতেও আমরা অন্ধ, কান থাকতেও বধির! বিবেক আমাদের অবশ হয়ে গেছে। এটা কি করুণ চিত্র নয়?

আমরা জানি, যীশু খ্রিষ্ট যখন ঈশ্বরের বাক্যের পরিচর্যা করতেন, তখন তাঁর কথা যারা শুনতে আসতো সকলেই অসহনশীল ছিল। যিহুদী এবং শমরীয়রা বেশি অসহনশীল ছিলো। ওরা একে অন্যকে ঘৃণা করত। যিহুদী ধর্মীয় নেতারা সাধারণ লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত, তাদেরকে গণ্য করতো না। তবে যিশু খ্রিষ্ট ছিলেন একেবারে আলাদা। যীশু ছিলেন দয়ালু, ধৈর্য্যশীল এবং সহনশীল। কারণ তিনি লোকেদের বিচার করতে নয় বরং তাদের আধ্যাত্মিকভাবে সুস্থ করতে এসেছিলেন। তিনি প্রধানত প্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করতেন। আর আমরা সে রকম একটি চমৎকার উদাহরণ একটি গল্পের মধ্যে দেখতে পাই।
কিন্তু তার পাশাপাশি নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার উদাহরণও দেখতে পাই, সেই যাজক ও লেবীয়ের আচরণের মধ্য দিয়ে। সে রকম যারা করে তাদেরকে ভালো প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য করেননি। অথচ সে রকম প্রতিবেশীর কাছাকাছিই আমরা বসবাস করছি। আর আমরা দুর্বিসহ জীবনযাপন করছি। অথবা আমরাও সে রকম (যাজক ও লেবীয় মতো) প্রতিবেশীর মতো জীবনযাপন করছি। আমরা কারো প্রয়োজনে এগিয়ে যাচ্ছি না।
আমরা জানি, মানুষের আচরণ বা কাজ প্রভাবিত হয় তার অনুভূতির দ্বারা; কিন্তু যেখানে অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায় সেখানে কাজের অগ্রগতি থাকে না বা আচরণও সীমা ছাড়িয়ে অমানবিকতায় চলে যায়। আবার আমাদের অনুভূতি সৃষ্টি হয় তার চিন্তার ফলে। কিন্তু আমাদের ভালো চিন্তা করার সময় নাই। আমরা ভালো চিন্তা করবার জন্যে নৈতিকতা অর্জন করি না। মানুষ যদি ইতিবাচক চিন্তা করে, তবে তার অনুভূতি ইতিবাচক হয় এবং ইতিবাচক কাজ করে; আবার সে যদি নেতিবাচক চিন্তা করে তবে তার অনুভূতিও নেতিবাচক হয় এবং তখন সে নেতিবাচক কাজ করে থাকে। কিন্তু নেতিবাচক বিষয়টিই অনেক মানুষর কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। আমাদের জীবনের ভিত্তি মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠত হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা মূল্যবোধ গঠনের জন্যে চেষ্টা করি না।
করুণাযুক্ত ভালোবাসা ছাড়া আমরা কেউ বেঁচে থাকতে পারি না। আমাদের জীবন, বেঁচে অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আর সেজন্যেই পরস্পরের প্রতি করুণাযুক্ত ভালোবাসার উদয় হওয়া উচিত। তাহলেই সকলেই চমৎকার জীবনযাপন করতে পারবে। কেউ করুণাযুক্ত ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে পারলে, সেও একইভাবে করুণাযুক্ত ভালোবাসা পেতে পারে।
করুণা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই থাকা উচিত। যদি না থাকে তাহলে মানুষের উপকারের জন্যে মানুষ এগিয়ে আসবে না। বিনিময় ছাড়াই মানুষের সাহায্য করা প্রতিটি মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত। আমরা অনেকে এগুলো জানি; তবুও করি না-এড়িয়ে চলি। যে কোনো কৌশলে পার্শ্ব দিয়া চলে যাই।
বিশ্ব মানবের উন্নতির জন্য পরিবর্তনে অবদান রাখা মানুষের কর্তব্য, সারা বিশ্বে মঙ্গল আনয়নের জন্যে স্বচেষ্ট হওয়া, মানুষকে আনন্দ দেয়া প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। সত্যিই আমরা কেউ জানি না কোন কঠিন মুহূতে আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দেবে; আমরা যেন সবসময় প্রস্তুত থাকি।
বাঙালি হৃদয়ে একটি স্থান করে আছে, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে—’ হৃদয় থেকে দয়া বের না হলে মানুষ মানুষের জন্যে এগিয়ে আসবে না। দয়ালু হওয়ার অর্থ হল অন্য ব্যক্তিকে নির্দেশিত সুবিধা বিনামূল্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। কোনো বিনিময় পাওয়ার জন্যে হওয়া উচিত নয়, সাধারণ প্রশংসা, জনস্বীকৃতি বা পরবর্তী ধন্যবাদের জন্যও নয়। করুণা প্রতিটি মানুষের বিবেককে শান্ত করে ও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। বড়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, করুণা ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়। অর্থাৎ কারো প্রতি কোনো কারণে ক্ষিপ্ত থাকলেও তার বিপদে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে তার মনের মধ্যে করুণা সৃষ্টি হবে। তখন সেই করুণা পূর্বের কোনো বিষয়ে ক্রোধ থাকলেও তা’ নিভিয়ে দেবেই। তাছাড়া স্বার্থপরতাকেও দমন করে।
সত্যিই, অনেক সময় আমরা পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয়স্বজনকেও বিপদের দিনে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারি না। আমরা বিভিন্ন অজুহাতে দূরে দূরে থাকতে বেশি পছন্দ করি। অথবা আমরা এড়িয়ে চলতে দারুণভাবে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকি। কিন্তু এটা যে আমাদের অমানবিক আচরণ সেটা মোটেও আমরা চিন্তা করি না বা আমাদের বোধোদ্বয় হয় না। অপরদিকে অপরিচিত ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্যও আমরা খুব একটা এগিয়ে যাই না। আমাদের বিবেক আমাদের শক্তি কেড়ে নেয়। আমাদের অমানবিক আচরণ একটি উদার কাজ করাকে সমর্থন জানায়। অথচ আমি যাকে সম্মুখে বিপদগ্রস্ত দেখতে পাই, সে-ই কিন্তু আমার প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর প্রতি ভালবাসা, সমস্যায় তার যতœ নেয়া ও সহায়তা করা কর্তব্য বলে মনে করি না। দিনে দিনে যেন আমাদের ভেতর থেকে দয়া হারাতে শুরু করেছে। আমরা ততটুকুই দয়া করি, যেখানে আমার যতটুকু লাভ হবে। কিন্তু এটা আসলে ঠিক নয়। কেননা দয়ালু হওয়ার অর্থ হলো- ব্যক্তিগত লাভের আশা করা যায় না, যে কোনো ভয়কে দমন করা উচিত।
মানুষের সমস্যায় এগিয়ে যাওয়ার মতো আনন্দের আর কি হতে পারে! যদি আমরা তা করি তাহলে আমাদের হৃদয়ে আনন্দ জেগে উঠে। এটা সুখানুভূতি সবসময় আমাদের চাঙ্গা রাখে। যেমন-স্বজন এবং বন্ধুদের সাথে দেখা করা ও তাদের ভালো-মন্দ খোঁজ নেয়া একটি কার্যকরী ভালোবাসা প্রদর্শনই বলে মনে হবে। তাছাড়া বয়স্কদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখাও আনন্দের বিষয়। কিন্তু তারাই আমাদের থেকে দারুণভাবে অবহেলিত হয়! তাছাড়া আমাদের আশপাশের প্রতিবন্ধীদের খোঁজ খবর নেয়াসহ তাদের সাহায্যেও আমরা এগিয়ে আসতে পারি। আমাদের সমাজের একটি অংশ যারা অত্যন্ত কষ্টে থাকে। তারা হলো এতিম! তাদের বিষয়ে আমাদের চেতনা থাকা দরকার। তাদেরকে আমরা ভালোবাসা প্রদর্শন করতে পারি। কিন্তু আমরা তাদের প্রতি ভালোবাসা দেখাই না। একজন পথচারীকে সাহায্য করেও আমরা মানবিক হতে পারি। যেমন-পথভোলা একজনকে ঠিকানা দেখিয়ে দিয়েও তার সাহায্য করতে পারি। যে বিপদ সম্পর্কে জানে না তাকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেও তাকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। কিভাবে জীবনের সমস্যার সমাধান করা যায় সে বিষয়েও আমরা ইঙ্গিত দিয়ে সাহায্য করতে পারি। অথচ আমরা এসব জানি না। আবার জানলেও আমরা এসব এড়িয়ে চলতে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে থাকি। উপরন্তু দেখিয়াও না দেখার ভান করি।
আমাদের প্রত্যেককে করুণাবিশিষ্ট হওয়া উচতি। কেননা করুণা বা দয়া না থাকাতে সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায় ও অন্যদের প্রতি ভালোবাসার অভাবে আশপাশের জগৎ ও মানুষের বাস্তবিক দুঃখকষ্ট বেড়ে যায়। যা’ আমরা বাস্তবে প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। সেখান থেকে আমাদের উঠে আসা উচিত। কিন্ত আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ব্যক্তিগত লাভের আশা সবসময়ই থাকে। অনেকের কাছে এটা একেবারে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু কখনো কখনো ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে মানুষের কল্যাণেও আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। একটা কথা আমাদের বোঝা উচিত যে, সবসময়ই অন্যেও সমস্যার সমাধান নির্বিশেষে নিজেদের জন্য আরামদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করে। তাছাড়া আত্মসম্মানকে আনন্দ দেয় ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করে সুখানুভূতি পাওয়া যায়। করুণাবিশিষ্ট হওয়ার অর্থ হল অন্য লোকের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় অংশ নেয়া, উদারতা বৃদ্ধি করা, ভালবাসা দেয়া, এ জগতকে আরো ভালো করার জন্যে পরিবর্তন করা। অন্যের দুঃখ দূর করার জন্য কাজ করা সবসময় আমাদের উচিত। এটা না করে ধর্মপালনে কি মহত্ব থাকতে পারে? অথবা আমাদের অনেক সম্পদ থাকলেও কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। আমাদের জীবনে করুণা প্রেমের সাথে দেখানো আমাদের আধ্যাত্মিকভাবে অনেক শক্তিশালী করে।
সত্যিই, আমাদের জগতের আরো উন্নতির জন্য পরিবর্তনের দরকার আছে। আমাদের হৃদয়কে জাগানো দরকার আছে। তাছাড়া দয়াপূর্ণ ভালোবাসা কঠিন সময়ে জীবন বাঁচায়, আমাদের মনের শান্তি দেয়, শেখায় যে একটি ভাল কাজ অবশ্যই মন্দের চেয়ে বেশি। করুণা হল একটি আয়না যা একজন ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র দেখায়। আধুনিক বিশ্বে অনেক অর্থ ও ক্ষমতাশালীরা দরিদ্রদের সমস্যা বা বিপদকে গুরুত্ব দেয় না। যদিও অনেক মানুষের পক্ষে সম্ভব ও সামর্থ রয়েছে মানুষের উপকার করা। কিন্তু তারা এগিয়ে আসে না।
আমরা কাকে প্রকৃত প্রতিবেশী বলতে পারি? অথবা আমরাও কি ভালো প্রতিবেশী হয়ে উঠতে পেরেছি কিনা? এটা একটি কঠিন প্রশ্ন! তবুও বাস্তব যে-এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজে পাই না। কেননা আমরা উত্তর খোঁজার মতো সেরকম কাজ করি না, বা সে রকম পরিস্থিতিতে আমরা এগিয়ে আসি না। অথবা আমাদের বিপদেও কোনো এগিয়ে আসে না। ফলে আমরাও শিখতে পারি না যে, মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা উচিত। আমরা যখন কোনো প্রিয় মানুষের সাথে দেখা করি, তখন নিশ্চয় হাসিমুখে দেখা করি ও কথা বলি। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তি কোনো দুর্ভোগের মধ্যে থাকে, তখন তার সাথে অশ্রæসিক্ত মুখে আমাদের ভালোবাসা তাকে দেখা পারি না।
একবার যিশু খ্রিস্টকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: অনেক আদেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী? তিনি বললেন, ঈশ্বর ও মানুষের প্রতি ভালবাসা। ‘তোমার প্রতিবাসীকে তোমার মত ভালোবাসো’ এবং তারপর তাকে একটি কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কে আমার প্রতিবেশী?’ আসলে এমন কোনো মানুষ নেই যে কাউকে ভালোবাসবে না। কিন্তু অনেক লোক বলে, ‘আমি তাদের ভালবাসি যারা আমাকে ভালবাসে, অর্থাৎ আমার পরিবার এবং আমার বন্ধুদের। এরা আমার প্রতিবেশী (আত্মীয়)।’ অথচ দয়ালু শমরীয় গল্পে আমরা কি নির্মমতার পরিস্থিতি দেখতে পাই না! একজন রক্তাক্ত ব্যক্তি পথে রয়েছে, অথচ আমাদের অনেক কাজ আছে, খুবই ব্যস্ত, আমার হাতে সময় নেই বলে আমরা দেখিয়াও চলে গেলাম। আমরা কি এ রকম নির্দয় রসিকতা দেখাই না? অথচ গল্পে আমরা দেখেছি যে, তার কাছের মানুষই প্রতিবেশী হয়েও লোকটিকে না দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কিন্তু পরিদর্শনকারী অপরিচিত ব্যক্তি তাকে তার প্রতিবেশী হিসেবে দেখেছে। খ্রীষ্টের দৃষ্টান্তের অর্থ হল: প্রতিবেশী সেই ব্যক্তি যে আপনাকে কষ্টে ছাড়বে না। আর প্রতিবেশী হল সেই যে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন। যদি একজন ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সে কোন ধর্মের সেটা বড় বিষয় নয়, তার গায়ের রঙ কেমন সেটাও বিষয় নয়; আমাদের বুঝতে হবে যে-সব মানুষের রক্তের রং একই। এমনকি যদি এই ব্যক্তিটি আপনার সামনে ব্যক্তিগতভাবে দোষী হয়, তবুও, তার কষ্টের মুহুর্তে, আপনাকে আপনার অভিযোগগুলি ভুলে যেতে হবে এবং তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যদি আমরা অসহায় ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করি তাহলে আমাদের আত্মাকে আরো উজ্জ্বল করে তুলবে।
মানুষের আত্মার ভালো গুণ হলো করুণা। একজন করুণাময় ব্যক্তি হলেন একজন সদয় ব্যক্তি যিনি সবাইকে করুণা করেন, সহানুভূতিশীল, ক্ষমা করেন। সে সবার সাথে এমন আচরণ করে যেন সে তার নিজের, প্রতিবেশী। যীশুখ্রীষ্ট মানুষের প্রতি এই মনোভাব শিখিয়েছিলো। আমরা কি বাইবেলের গল্পটি জানি না?- ‘একজন লোক জেরুজালেম থেকে অন্য শহরে হাঁটছিল এবং ডাকাতদের হাতে পড়েছিল। তারা তার জামাকাপড় কেড়ে নেয়, তাকে আহত করে এবং রাস্তায় তাকে সবেমাত্র জীবিত অবস্থায় ফেলে রাখে। এমন সময় একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক ব্যক্তি। তিনি হতভাগ্য লোকটির দিকে তাকিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলেন। দ্বিতীয় পথচারীও তাই করল। কিন্তু একজন শমরীয় রাস্তায় একজন আহত লোককে দেখে তার জন্য করুণা করল। তিনি তার ক্ষতগুলি ব্যান্ডেজ করে, তাকে তার গাধার উপর রেখে তাকে একটি সরাইখানায় নিয়ে আসেন। পরের দিন তিনি চলে যাওয়ার সময় সরাইখানার কর্মচারীকে টাকা দিয়ে বললেন, এই লোকটির যতœ নেও। দৃষ্টান্তটি শেষ করার পর, যীশু জিজ্ঞাসা করলেন, “এই তিনজনের মধ্যে কে একজন লোকের প্রতিবেশী ছিল যে চোরদের হাতে পড়েছিল?” শ্রোতা উত্তর দিলেন: “যে তাকে করুণা করেছে।” যীশু তাকে বললেন, “যাও এবং একই কাজ কর। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, করুণা হল অন্য ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল, পরোপকারী, যতœশীল ও প্রেমময় মনোভাব। এটি প্রেমের কাজে নিজেকে প্রকাশ করে। কোনো ভালো কাজ করবার জন্যে শুধুমাত্র টাকারই দরকার হয় না। শুধু মনোভাব হলেও যথেষ্ট। ইচ্ছাশক্তিকে যদি জাগ্রত করতে পারি, তাহলেই আমরা অনেক উপকার করতে পারি। আমরা যদি মানুষের উপকার করি তাহলে সেই উপকারের জন্য আপনার সমস্ত কাজ তার দ্বারা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। টাকা দিয়ে দয়া কেনা যায় না। টাকা দিয়ে সময় কেনা যায়, ক্ষণিকের ভালোবাসা কেনা যায়। তবে তা অবশ্য চিরস্থায়ী হয় না। পৃথিবীতে মানুষ মানুষের জন্য। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে মানবতায় পরিপূর্ণ হবে প্রতিটি মানুষ। যে ব্যক্তি অন্য মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে সেই তো প্রতিবেশীর ভূমিকা পালন করে এবং সে একজন উত্তম প্রতিবেশী হয়ে উঠতে পারে। অবশ্যই ঈশ্বরও তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট বা বিপদ দূর করে দেয়, ঈশ্বরও তার সকল প্রার্থনা শুনে থাকেন।
মানুষকে আমরা অনেকভাবে উপকার করতে পারি। বিপদে-আপদে অর্থ/টাকা দিয়ে সহযোগিতা করা। কাজের মধ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা। সামর্থ থাকলে যখন যে-রকম সহযোগিতার প্রয়োজনÑ সে-রকমভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াই প্রতিবেশীর ভূমিকা পালন করা।

সামাজিক হতে হলে পরোপকারী হতে হবে। বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াবে এমনটাই হওয়া উচিত প্রতিটি মানুষের। একজন অন্যজনের বিপদে এগিয়ে আসা, পাশে দাঁড়ানো, সহমর্মী হওয়া, শুধু নিজের সুখের জন্য ব্যস্ত না হয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করাই মনুষ্যত্ব। ঈশ্বর মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি, নৈতিকতা আর অপরের প্রতি সহানুভূতির মতো অমূল্য সম্পদ। সেজন্য মানুষ যেমন সামাজিক, তেমনি পরোপকারীও। আর পরোপকারের মনোভাব মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার। পরোপকার না থাকলে সমাজের স্থিতিশীলতা থাকে না। সমাজে একের পর এক অন্যায়, অত্যাচার, প্রবঞ্চনা আর খুনের মতো মন্দ কাজগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা মারাত্মক আকার ধারণ করে। সত্যিই, একে অপরের সহযোগিতা ছাড়া জীবন যাপন করা কঠিন। যখন কোনো সমাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতা হ্রাস পায়, সে সমাজের মানুষ সব দিক দিয়েই পিছিয়ে পড়ে। সে সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, শান্তি বিলুপ্ত হয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার ঘাটতি দেখা দেয়। তাই পরোপকারের চেতনায় কোনো শ্রেণিভেদ থাকা উচিত নয়। বড়-ছোট, ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বজাতি-বিজাতি এসব ব্যবধানের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত।
পরোপকারী হতে হলে অনেক ধনসম্পদের মালিক হতে হবে এমন নয়। প্রত্যেক মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থানে থেকে পরোপকারী হতে পারে। পরোপকার নির্দিষ্ট সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক কর্মকাÐে এর পরিধি পরিব্যাপ্ত ও বিস্তৃত। পরোপকার মানুষকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করে। কিন্তু আমরা মানুষ সবকিছুই দেখেও অনেক সময় না দেখার ভান করে থাকি, মানুষের উপকার করতে আমাদের ইচ্ছা জেগে উঠে না।
অনাথ-অসহায় ও অনাহারির কষ্টে সমব্যথী হয়ে উপকারে এগিয়ে আসা উচিত। নিঃস্ব ও অভাবীর অভাব মোচনে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমার আপনার আমাদের পাশের বাড়ির মানুষজন না খেয়ে থাকলেও আমরা তার দেখি তাকাই না ও তাকে সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসি না। মানুষের উপকার করা যায় বিভিন্নভাবে। অর্থ দিয়ে, শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে এবং বিদ্যা দিয়ে। ঈশ্বর আমাদের বিভিন্নভাবে যোগ্যতা দিয়েছেন। যার যেই যোগ্যতা আছে, সে যদি তার সেই যোগ্যতাকে সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত করে, তবেই তার সেই যোগ্যতা সার্থক হয়। মানব-সেবায় নিয়োজিত করে নিজ জীবনকে সফল করে তুলতে পারলে জীবন আরো সুন্দর হতে পারে।
আমরা মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব হলেও আমরা চিরস্থায়ী হতে পারি না পৃথিবীতে। আমাদের অবস্থান ক্ষণিকের! যেন ভ্রমণ করতে আসা এই পৃথিবীতে। আর এই ভ্রমণের পরিসমাপ্তি হবে মৃত্যু দিয়ে। অথচ এই সহজ-সরল সত্যকে আমরা সহজভাবে নিতে চাই না। অথচ আমরা আজ হিংসা, অহংকার আর স্বার্থ নিয়ে বেঁচে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সত্যি বলতে, আমাদের এখন আমরা বিষয়টা নেই। আমরা এখন প্রত্যেকেই আমিত্ব নিয়ে বেঁচে আছি। কেউ কষ্ট পাচ্ছে, কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কেউবা রাস্তায় পড়ে আছে মুমূর্ষু অবস্থায়। কিন্তু এতে আমার আপনার কী? হ্যাঁ, আমাদের এখন এই টেনডেন্সি কাজ করে। এটা সত্যি, এসব এখন আমাদের দুচোখে দেখা বাস্তব দৃশ্য। আমরা পথে কেউ অ্যাক্সিডেন্ট করলে এগিয়ে যাই না, পালিয়ে যাই। কেউ কাউকে কুপিয়ে মারলে আমরা এগিয়ে যাই না, পালিয়ে যাই। আমরা সিনেমা, সিরিয়াল, নাটক, টেলিফিল্ম দেখতে দেখতে আসলেই এখন ভোর। তাই এখন আমরা বাস্তবে এমন কিছু দেখতে উৎসাহী। আমরা নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে এড়িয়ে চলি। শুধু দেখি বললেও ভুল হবে, আমরা ভিডিও করেছি। উফফ, এটাও কম হয়ে গেল। আমরা ভিডিও করে সেটা আবার ফেসবুকেও দিচ্ছি। এতে অনেক লাইক, শেয়ার এবং কমেন্ট হবে। দিন শেষে আমরা নায়ক হয়ে যাই ফেসবুকে। বাহ্! কী চমৎকার!
হ্যাঁ, এ রকম ফেসবুকের নায়ক এ সমাজে অহরহ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের উপকার করে, মানুষের কষ্ট দেখলে এগিয়ে যায়, এদের সংখ্যা খুবই কম। আজ আমরা সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে পছন্দ করি। এই স্বভাবটা এখন আমাদের প্রথা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিত্যদিন এমন দৃশ্য দেখতে পাই, যেখানে মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে অন্যের কষ্টের দৃশ্য দেখছে। ধরুণ, কোথাও মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেখবেন সেখানে গোল হয়ে দেখছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না। নির্মম ঘটনা জীবনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার এক কঠিন এবং রূঢ় চিত্র যেন এখন প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে। প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনায় উপস্থিত মানুষের নির্লিপ্ততা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণ কি? এটা কি শুধুই নিজেকে ঝামেলা থেকে রক্ষা করার জন্য, নাকি মানুষের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়? এ কেমন মানসিকতা? নির্লিপ্ততা প্রসঙ্গে অনেকে বলেন, নিজেরা পরবর্তীকালে ভোগান্তিতে পড়তে চান না বলেই তারা এসব বিষয় এড়িয়ে চলেন। কথা হলো, এ ধরনের ঘটনায় কাউকে বাঁচাতে বা উপকার করতে গেলে ঝামেলা পোহাতে হবে কেন? তাই বলে বিপদের সময় কি কারো সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা যাবে না? তবে কি দিন দিন আমরা বোধহীন হয়ে যাচ্ছি? আমাদের মনুষ্যত্ব লোপ পাচ্ছে? ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, মানুষের প্রতি মানুষের এহেন নির্লিপ্ততা কেন বাড়ছে? বড়ই আশ্চর্যের বিষয়! এ কেমন মনুষ্যত্ব! কিন্তু সত্য এটাই।
সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, গরীব আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা দেয়া ও খোঁজ খবর নেয়া, আশপাশের লোকজনের খোঁজ-খবর নেয়া, ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দেয়া, ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দেয়া মানুষ মাত্রেরই দায়িত্ব হওয়া উচিত। পানির কাজ হলো অপরকে ভিজিয়ে দেয়া, বাতাসের কাজ অপরকে শীতল করা, বৃক্ষের কাজ অপরকে ছায়া দেয়া, আর মানুষের নৈতিক কাজ হলো অপরের বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা। দুর্গত এলাকার দুস্থ মানুষেরা আমাদের প্রতিবেশী। তাদের দুঃখ কষ্টে লাগবের সাহায্যার্থে এগিয়ে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।
জেনেও না জানার ভান করা, বা দেখেও না দেখার অভিনয় করে অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া মানবিক হতে পারে। সত্যিই এমন নির্মোহ নিষ্ক্রিয়তা ও নির্লিপ্ততা মানবিকতা পরিপন্থী। কোনো ধর্মই এমন মনোভাব সমর্থন করে না নিশ্চয়ই। অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব প্রত্যেকের মধ্যেই থাকা উচিত। একজন মানুষের স্বাভাবিক বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধই পারে আরেকজন মানুষকে রক্ষা করতে। অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার মানসিক প্রত্যেকেরই থাকা উচিত। কারণ মানুষ মানুষের জন্য। জীবনে এটা প্রমাণ করতে না পারলে সেটা অবশ্যই নিজের জন্য গøানিকর বিষয়।
মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, মানুষের দুঃখ দূর করা, মানুষের বিপদের দিনে এগিয়ে যাওয়া, অথবা দুঃস্থ মানুষের অভাব দূর করে দেয়া, বিপদগ্রস্ত অন্য ভাইয়ের সাহায্য সহযোগিতা করা, সহযোগিতামূলক যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিরা অবশ্যই ঈশ্বরের আশির্বাদ লাভ করবেন। আমাদের দেশে প্রতি বছরই বানবাসী, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ¡াস-পাহাড় ধ্বস ও ভূমিকম্পে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি মানুষও মারা যায়। তখন আক্রান্ত মানুষের উপকারে, সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত। কিন্তু যারা ধনী আছে, তাদের এসবে কোনো খেয়ালই থাকে না। আমরা তো ছোট বেলা থেকেই পড়েছি যে, কোনো মানুষের পক্ষে পৃথিবীতে একাকী বাস করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন প্রয়োজনে একে অপরের সাহায্য ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। এছাড়াও নানা বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে। কেননা কোনো মানুষ যখন কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়, সে তখন সবচেয়ে বেশি অসহায়ত্ব অনুভব করে। ওই সময় সে আন্তরিকভাবে অন্যের সাহায্য প্রত্যাশা করে।
মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই হওয়া উচিত- একটি দেহের মতো! দেহের একটি অঙ্গ যেকোনো ধরনের বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অঙ্গ তাকে সাহায্যের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। উদাহরণ স্বরূপ- কারো চোখে কোনো কিছু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আপন কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা সবাই কিভাবে চোখকে তার বিপদ থেকে রক্ষা করবে সেদিকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে অন্যেরও শরণাপন্ন হয়। অনুরূপ কোনো ভাই যখন কোনো প্রকার বিপদে পড়ে, তখন অপর ভাইয়ের উচিত হবে – তাকে সাহায্য করা। এমন সুন্দর জীবনই হওয়া উচিত আমাদের সকলের।
কোনো মানুষের কঠিন বিপদের মুহূর্তে যখন কেউ তাকে সাহায্য করে, তখন তার সে সাহায্যের কথা সে কখনো ভুলে না। যারা বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যকারী হয়, তারাই প্রকৃত বন্ধু। প্রবাদে আছে, ‘বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।’ আমরা জানি যে, পৃথিবীর সবকিছুর অধিকার ঈশ্বরের রয়েছে। পৃথিবীতে যত সম্পদ রয়েছে, মানুষ যে সম্পদের অধিকারী হিসেবে দাবি করে, তা’ মূলত ঈশ্বরের কৃপার ফসল। ঈশ্বর যাকে অর্থ-সম্পদ দিয়েছেন তিনি সে সম্পদ থেকে অভাবী মানুষকে সাহায্য করলে তাতে ঈশ্বর অবশ্যই খুশি হয়ে থাকেন। এ ধরনের মানবিক কর্তব্য পালন করা আমাদের সকলেরই উচিত। কোনো মানুষের সঙ্গে যখন সদয় ব্যবহার করা হয়, তার বিপদে সাহায্য করা হয়, তখন ঈশ্বরকেই খুশি করা হয়। সমাজের আশ্রয়হীন, দুর্বল ও অসহায় লোকজনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত। আমরা যদি মনে করি, গরীব-দুঃস্থরা আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। গরীব-দুঃস্থসহ সমাজের আশ্রয়হীন, দুর্বল ও অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, অসচ্ছল, বিপদগ্রস্ত এবং অভাবী মানুষের সাহায্যে কেউ এগিয়ে এলে ঈশ্বর প্রসন্ন হন। সুতরাং গরীব-অসহায়, দুঃস্থের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়া অত্যাবশ্যক। ছোট বেলা থেকেই আমরা পড়েছি যে, ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও;তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’-এটা অবশ্যই আমরা কেউ ভুলে যাইনি। অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া এবং পরের বিপদে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা একটি মহৎ গুণ। হিতৈষী মনোভাব ও সহমর্মিতার গুণ ছাড়া মানবিকতা ও মহানুভবতার বিকাশ পূর্ণতা পায় না। যেমন-আমি তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারি। একাধিক পদের তরকারি ছাড়া আমার খাবার হয় না। বিচিত্র স্বাদ আস্বাদন ছাড়া আমার রসনা তৃপ্ত হয় না। বাসার নৈশ প্রহরী কুকুরকে নিত্য টাটকা মাংসা খাওয়াই। দুই বেলা দামী খাবার খেতে দেই। শ্যাম্পু ছাড়া ওর ¯œান হয় না। অথচ পাশের বস্তিতে খাবার না পেয়ে অবোধ শিশুরা চিৎকার করে কাঁদে। জঠরজ্বালা সইতে না পেরে কত গরীব উপুড় হয়ে কাতরায়। ফল-ফ্রুটস খেতে খেতে আমার আদরের দুলালের অরুচি ধরে আছে। অথচ বাড়ির কাজের লোকের অথবা প্রতিবেশী গরীবদের অভুক্ত সন্তানদের মুখে মৌসুমী ফলটি পর্যন্ত ওঠে না। ফ্যাশন বদলের সঙ্গে সঙ্গেই ধনীর মেয়েদের শীতবস্ত্র আর গ্রীষ্মের পোশাক বদল হয়। অথচ অদূরের গাঁয়েই কি-না শীতবস্ত্রের অভাবে গরীবের প্রাণ যায় যায়। আমরা সবই জানি, আমরা সবই দেখি, কিন্তু পাশ কাটিয়ে চলে আসি।
যারা দেখে চলে গেছে, এড়িয়ে গেছে তাদের উত্তম প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য করেননি। কেননা তারা প্রতিবেশীর মতো আচরণ করেনি। প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্যই থাকা উচিত। বিপদে-আপদে অতি সহজে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর একমাত্র কাছের লোক হলো প্রতিবেশী। তাই তাদের প্রতি আমাদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকা দরকার। তাদের বিপদে আপদে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। প্রতিবেশীকে সুখে-দুঃখে সাহায্য-সহযোগিতা করা অপর প্রতিবেশীর নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে প্রতিবেশী যখন বিপদে পড়ে যায় তখন তার সাহায্য এগিয়ে যাওয়া উচিত। কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হলে দ্রæত তার আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করা ও সরাসরি তার সেবাশুশ্রষা করার মতো কাজগুলো আমাদের করা উচিত। এই একসঙ্গে থাকাটাই সমাজ। আর সমাজ মানে বাড়ির পাশে বাড়ি, ঘরের পাশে ঘর, মানুষের পাশে মানুষ। একটি ঘর পুড়ে গেলে অন্য ঘরটিও অনিরাপদ হয়ে যায়। প্রতিবেশীর ঘর বাঁচলে তাই দেশও বাঁচে, মানুষও বাঁচে। প্রতিবেশীর ঘর নিরাপদ মানে সমাজ নিরাপদ। প্রতিবেশীর ঘরে যতক্ষণ আশ্রয় আছে, ততক্ষণ মানুষ আছে। প্রতিবেশী যখন প্রতিবেশীর পাশে থাকে, তখন জীবন নিরাপদ। প্রত্যেকে আমরা যদি প্রতিবেশীর ঘরের নিরাপত্তা হই, তাহলেই নিজের ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত।
আরও আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গিয়েছেন, ‘আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূরে্যর আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখদুঃখে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন-একটি পাপ আমরা পোষণ করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এ পাপকে ঈশ্বর কোনোমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না। …পরকে অপমান করিয়া যাহাদিগকে জাতি রক্ষা করিতে হইবে, পরের হাতে চিরদিন অপমানিত না হইয়া তাহাদের গতি নাই। তাহারা যাহাদিগকে ¤েøচ্ছ বলিয়া অবজ্ঞা করিতেছে সেই ¤েøচ্ছের অবজ্ঞা তাহাদিগকে সহ্য করিতে হইবে।’ আর যীশু বলেছেন, ‘প্রতিবেশীকে আপনার মতো প্রেম করিও।’ পার্থিব জীবনে মানুষ অপরের সাহায্য ছাড়া মোটেও চলতে পারে না। এজগতে কোন মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বরং সে কোন না কোন ক্ষেত্রে অপরের মুখাপেক্ষী। প্রতিবেশীর কাজে সাধ্যমত সহায়তা করা তার প্রতি দয়ার বহিঃপ্রকাশ। আর মানুষের প্রতি মানুষের দয়া-অনুগ্রহে সমাজ সুন্দর হয়; আর ঈশ্বর সন্তোষ্ট হন।
কিন্তু সত্যিই কখনো কখনো আমরা অনেকেই মহানুভব, মানুষের জন্য আমাদের মন কাঁদে ঠিকই, কিন্তু নিজের ক্ষতির ভয়ে কিছু করি না; এড়িয়ে চলি। এটা তো আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, প্রতিবেশিতা ছাড়া সমাজ অসম্ভব। আমাদের সমস্ত কিছুতেই প্রতিবেশীর দরকার। বেঁচে থাকতেও প্রতিটি পদে পদে দরকার, আবার মারা গেলেও দরকার। কেননা প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশী ভরসা করেই থাকে। যদি মুখ দেখাদেখি না থাকে, যদি উৎসবে বা শোকে সহমর্ম না হই, যদি বিপদের দিনে পাশে না দাঁড়াই, তাহলে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না; সমাজের মৃত্যু ঘটবে।
প্রতিবেশীরাই বিপদে-আপদে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসে। প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে নিরাপত্তার বোধ বৃদ্ধি পায় এবং মানসিকভাবে ভালো থাকা যায়। কিন্তু এখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বেড়েই চলেছে। এটি আমাদের সমাজবিচ্ছিন্ন করে মানসিক চাপ ও একাকিত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ প্রতিবেশীদের কাছে প্রিয় হতে পারলে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব। প্রতিবেশী অপরিচিত হলে পরিচিত হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা এড়িয়ে চলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। পাড়ায় কোনো নতুন কোনো প্রতিবেশী এলে তাকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে তারা সাথে খারাপ আচরণও করি। কিন্তু যদি এইমাত্র বাসা বদল করে আসা ক্লান্ত প্রতিবেশীদের একটু লেবুর শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করি তাহলে তাদের শরীর ও মন জুড়িয়ে যাবে এবং আপনাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করবে।
আমরা বাইরে শুধু মানুষের রূপ নিয়ে চলছি। আমাদের ভেতর এখন না আছে মানবতা, না আছে মনুষ্যত্ব। এখন কেন জানি মানবতা আর মনুষ্যত্ব শব্দগুলোর জন্য মায়া জন্মে! শুধুমাত্র এখন নিজের জন্যই এই শব্দ দুটোকে বাঁচিয়ে রাখি। অন্যের জন্য এই শব্দ দুটো আজীবন মৃত যেন! কিন্তু এভাবে আর কত? মানুষ তো মানুষের জন্য। আপনি অন্যের জন্য মানবতা, মনুষ্যত্ব না দেখালে আপনার জন্যও কেউ দেখাবে এমনটা আশা করতেই পারেন না। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই স্বভাব মুছে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে মানুষের বিপদে। নিজের চিন্তা নয়, অন্যের চিন্তা যে করে তার চিন্তা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর করবেন। তাই আসুন মানুষের পাশে দাঁড়াই। মানুষকে সহযোগিতা করি। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার স্বভাব বন্ধ করি। একজন উত্তম প্রতিবেশী কখনো এমন করে না।









