

জিল্লুর রহমান :
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এখনও এমন অনেক কান্না চাপা পড়ে থাকে, যেগুলো রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায় না, সমাজের বিবেককে নাড়া দেয় না। তাড়াশ উপজেলার কুসমবি গ্রামের মোঃ সাহেব আলির মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, যা আমাদের সামনে আবারও যৌতুক নামক সামাজিক ব্যাধির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

বিয়ের নামে বেচাকেনা
মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া গ্রামে। বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় নির্যাতনের পালা। যৌতুকের দাবিতে তার স্বামী, শ্বশুর এবং শাশুড়ি তাকে নিয়মিত মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করত। পিতা সাহেব আলি জানান, “কত টাকা পয়সা খরচ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, কিনতু মেয়ে আমার সুখ পেল না।” মাঝে মাঝেই মেয়েটি বাবার বাড়ি এসে টাকা চাইত, যা তার স্বামী পক্ষের চাপে করতে বাধ্য হতো। শেষবার যখন টাকা চাওয়া হয়, বাবা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপরই ঘটে সেই নির্মম ঘটনা—মেয়েটিকে হত্যা করে মুখে বিষ দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়।
এই ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয় সচেতন মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, “আর কত দিন মেয়েরা যৌতুকের বলি হবে?”
যৌতুক: একটি সামাজিক ব্যাধি
যৌতুকপ্রথা বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনও একটি ‘স্বাভাবিক’ প্রথা হিসেবে গৃহীত। বিয়ের সময় মেয়ের পরিবারকে অর্থ, গহনা, আসবাবপত্র, এমনকি জমিজমা পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হয়। এই প্রথা শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, এটি নারীর প্রতি সহিংসতার একটি কাঠামোগত রূপ। যৌতুক না দিতে পারলে মেয়েদের উপর চলে নির্যাতন, অপমান, এমনকি প্রাণনাশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশে যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে এই প্রথা রোধ করা যাচ্ছে না। অনেক সময় পরিবার, সমাজ, এমনকি প্রশাসনও নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়ায় না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
একটি মৃত্যুর পরিণতি
এই ঘটনার পর সাহেব আলির পরিবার শোকস্তব্ধ। মেয়ের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা। সাহেব আলির কান্না যেন প্রতিধ্বনিত হয় হাজারো বাবার হৃদয়ে, যারা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে শান্তি খোঁজেন, কিন্তু ফিরে পান লাশ।
এই ঘটনায় মামলা না হওয়া, প্রশাসনের নীরবতা, এবং সমাজের উদাসীনতা যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও দুর্বল করে তোলে। প্রশ্ন ওঠে—এই মৃত্যু কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা, নাকি এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পেছনে রয়েছে একটি প্রথাগত সহিংসতা?
নারীর অধিকার ও সামাজিক দায়
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, শিক্ষা, এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। মেয়েদের শুধু ‘বিয়ের উপযোগী’ করে তোলার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে হবে। পরিবারকে বুঝতে হবে, মেয়ের বিয়ে মানেই তার দায়িত্ব শেষ নয়, বরং শুরু।
যৌতুকপ্রথা রোধে প্রয়োজন:
শিক্ষা ও সচেতনতা: স্কুল-কলেজে যৌতুকবিরোধী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: যৌতুকের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন।
সামাজিক আন্দোলন: স্থানীয় পর্যায়ে যৌতুকবিরোধী কমিটি ও প্রচারণা চালানো।
মিডিয়ার ভূমিকা
এই ধরনের ঘটনা মিডিয়ায় যথাযথভাবে তুলে ধরলে প্রশাসন ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব। সাহেব আলির মেয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনা যেন চাপা পড়ে না যায়, তার জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মানবাধিকার সংগঠনের সক্রিয়তা, এবং নাগরিক সমাজের জোরালো অবস্থান।
শেষ কথা
যৌতুকের বলি হয়ে একজন নারী যখন প্রাণ হারায়, তখন শুধু একটি জীবন শেষ হয় না—একটি সম্ভাবনা, একটি স্বপ্ন, একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। সাহেব আলির মেয়ের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যৌতুকপ্রথা কতটা ভয়াবহ, কতটা নির্মম।
এই সমাজে আর কতজন সাহেব আলি কান্না চাপা রাখবেন? আর কতজন মেয়ে বিষ খেয়ে ‘ফাঁস নিয়েছে’ বলে চালিয়ে দেওয়া হবে? সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ গড়ার, এবং পরিবর্তনের। যৌতুকের বলি যেন আর কেউ না হয়—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫












