

ক্ষুদীরাম দাস :
বাংলা বচন আছে, “মুখ থেকে কথা ছুটে গেলে আর বন্দুক থেকে গুলি বের হয়ে গেলে, তা আর ফেরানো যায় না, যা ঘটার তাই ঘটে যায়।” অনেকসময়ই দেখবেন কোনো মানুষ খুব ছোট একটি চাকরি করছেন আপনার বা আমার অফিসে, কিন্তু তার আচার-আচরণ খুবই ভদ্র ও পরিশীলিত। তার সততা অনেক বড় চাকুরিজীবির চাইতে বেশি। খোঁজ করে দেখবেন সেই ব্যক্তি হয়তো দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে পড়াশোনা শিখে বড় কোনো চাকরি করতে পারেননি কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা তাকে একজন বড় মানুষে পরিণত করেছে। এই আচরণ খুব সাধারণ যেকোনো পেশাজীবি মানুষের মধ্যেও দেখতে পারবেন। শুধু বই মুখস্ত করে, পরীক্ষায় জিপিএ বাড়িয়ে, কর্মক্ষেত্রে চটকদার প্রেজেন্টেশন দিয়ে বা গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলে আপনি হতে পারেন অনেক বড় চাকুরে, অফিসের কান্ডারি, ক্ষমতাধর আমলা, বড় কোনো ব্যবসায়ী, নামকরা পেশাজীবি অথবা শিক্ষক বা সাংবাদিক। কিন্তু এই আপনিই যদি মানুষের মনের কাছে পৌঁছুতে না পারেন, তাহলে অর্জন হয়ে যেতে পারে ষোল আনাই মিছে। বেফাঁস মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে কেউ কেউ গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপান। বলেন, মিডিয়ায় বক্তব্য বিকৃত বা খÐিতভাবে এসেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কথা ধোপে টেকে না, কারণ সবকিছুরই প্রমাণ থাকে। জিহŸাকে বশে রাখার প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়ে জ্ঞানী রাজা বলেন, “বাক্যের বাহুল্যে অধর্ম্মের অভাব নাই; কিন্তু যে ওষ্ঠ দমন করে, সে বুদ্ধিমান” (হিতোপদেশ ১০:১৯)। মুখের বুলি আর বন্দুকের গুলি দুই-ই এক। এটা ভাল কাজেও ব্যবহার করা যায় আবার খারাপ কাজেও। সুতরাং সাবধান এই দুইটা জিনিস যত কম ব্যবহার হবে ততই সবার জন্য মঙ্গল। আগে তবু মুখের কথা বলে অস্বীকার করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন আর অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। অডিও বা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলেই শেষ। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রæ তার মুখের কথা। বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই।

“অজ্ঞান লোক অনেক কথা কহে।” (উপদেশক ১০:১৪) জ্ঞানহীন মানুষ পৃথিবীর বোঝা ও পশুর সমতুল্য মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন বলেছেন, জ্ঞানহীন মানুষ অনেক সময় ভয়ানক হিংস্র হয়ে উঠে। তাদের কারণে পৃথিবীর অনেক ক্ষতি হয়, মানবতা পদদলিত হয়। এই জ্ঞানই মানুষকে সুন্দর ও সভ্য করে এবং পৃথিবীকে রাখে নিরাপদ। মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠা করা জ্ঞানী মানুষ ছাড়া তা সম্ভব নয়। জ্ঞানী মানুষ মানবতার উত্তম সেবক। তাঁরা পরার্থে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে মানবজনম সার্থক করেন। আসলে জীবনে জ্ঞান ছাড়া একজন মানুষ এবং পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। কেননা এই পৃথিবীতে যারা সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তারা কিন্তু সবসময় উন্নত চিন্তা ভাবনা নিয়ে উপরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর যারা জ্ঞানহীন লোক তারা কিন্তু তাদের সেই অলস মস্তিষ্ক নিয়ে তারা কখনো উন্নত জীবনে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করে না। তারা অন্যান্য প্রাণীদের মত শুধুমাত্র বর্তমান জীবনটাকেই আঁকড়ে ধরে বসবাস করার চেষ্টা করে। আসলে জ্ঞান যে মানুষের জীবনে কতটা প্রয়োজন তা একজন জ্ঞানী লোক ছাড়া অন্য কেউ আর কখনো বুঝতে পারে না। কেননা আমরা দেখেছি যে যারা জ্ঞানহীন মানুষ তারা মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলবে এবং কিভাবে আচরণ করবে তা কিন্তু তারা কখনো বুঝে উঠতে পারে না। আর এজন্য জ্ঞানহীন মানুষের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করা সময় নষ্ট। তার মুখ “অজ্ঞানতা উদ্গার করে।” (হিতোপদেশ ১৫:২) তার মানে এই নয় যে, প্রত্যেক বাচাল ব্যক্তিই বোকা। কিন্তু, যে ব্যক্তি অতিরিক্ত কথা বলে সে কত সহজেই না ক্ষতিকর সমালোচনা অথবা গুজব ছড়ানোর এক মাধ্যম হয়ে পড়তে পারে! প্রায়ই বোকার মতো কথা বলার ফলে সুনাম নষ্ট হয়, দুঃখ পেতে হয়, সম্পর্ক খারাপ হয় ও এমনকি শারীরিক দিক দিয়েও ক্ষতি হতে পারে। “বেশি কথার মধ্যে পাপ উপস্থিত।” (হিতোপদেশ ১০:১৯) কমবেশি প্রতিবার ঝগড়ার মূলে থাকে দুই পক্ষের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগের অভাব। মনোযোগ ও ধৈর্য ধরে অপরের কথা শুনলে সহজেই অনেক ঝগড়ার সমাধান করা সম্ভব। ঝগড়ার সময় সবাই বেশ আবেগতাড়িত থাকেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই নিজেদের মনের কথা ঝগড়ার সুরে হলেও খুলে বলেন। তাই ঝগড়ার সময় অন্তত অপর পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিন। প্রয়োজনে নিজের অবস্থানও খুলে বলুন। ফলে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান বুঝতে সমর্থ হবে। এছাড়া, যে ব্যক্তি সব ব্যাপারে কথা বলতে চায়, এইরকম ব্যক্তির উপস্থিতি খুবই বিরক্তিকর। তাই, আসুন আমরা যেন অতিরিক্ত কথা না বলি। মুখ খোলার আগে দশবার ভাবা উচিত। এটা সব মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই কথা বলার ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। বিনয়ী হতে হবে। কথায় আছে, ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’। সবাইকেই কমবেশি মুহূর্তের এই আবেগ, অনুভ‚তির কাছে হার মানতে হয়। আর ঝগড়ার সময় মেজাজ হারানোই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ঝগড়ার সময়েই মেজাজ রাখতে হয় শান্ত। ধীরে সুস্থে খুঁজতে হয় সমস্যার সমাধান। নাহলে শুধু কথায় কথা বাড়বে, সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। জেনে নিন কীভাবে ঝগড়ার সময় নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন।
মিথ্যা বলা এড়িয়ে চলা ছাড়াও, যে ব্যক্তি তার ওষ্ঠ দমন করেন তিনি বুদ্ধিমান। কিছু বলার আগে তিনি চিন্তা করেন। যিহোবার মানগুলোকে ভালবাসার ও তার সহ মানবদেরকে সাহায্য করার আন্তরিক ইচ্ছার দ্বারা প্রেরণা পেয়ে তিনি অন্যদেরকে কিছু বলার আগে ভেবে দেখেন যে, সেই কথাগুলো তাদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে। তার কথার মধ্যে প্রেম ও দয়া থাকে। তিনি যা বলেন সেই কথাগুলোকে কীভাবে আগ্রহজনক ও গঠনমূলক করা যায়, তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেন। তার কথাগুলো “রৌপ্যের ডালিতে সুবর্ণ নাগরঙ্গ ফলের” মতো অর্থাৎ সবসময়ই বিচক্ষণতা ও মর্যাদার সঙ্গে বলা। (হিতোপদেশ ২৫:১১) কথায় আছে, বন্দুকের গুলি আর মুখের বুলি একবার বেরিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আর ঝগড়ার সময় প্রতিটি শব্দের মূল্য বেড়ে যায় বহুগুণ। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম শব্দের আঘাত মনে লেগে থাকে অনেক দিন। যে কারণে ঝগড়ার সময়ে শব্দচয়নের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করুন। কী বলবেন, কী বলবেন না, ভেবে কথা বলুন। কারণ, আপনার একটি শব্দই বহু বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঝগড়ার সময়ে প্রত্যেকের মনই বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। অশান্ত মনে স্বাভাবিকভাবে একে অপরের কথা শোনা কিংবা বোঝা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাই ঝগড়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে শান্ত করুন। বড় বড় শ্বাস নিন, নিজেকেই নিজে শান্ত করার চেষ্টা করুন। এতে করে যেমন অনাকাক্সিক্ষত বাক্যব্যয় থেকে দূরে থাকা যায়, তেমনই শান্তভাবে বসে অপর পক্ষের কথাও বোঝা যায়। অনেকেই ঝগড়া করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যান যে তাঁদের কাছে ঝগড়ার সমাধান নয়, বরং জয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে। নিজের অবস্থান বোঝানোর চেয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে ঝগড়ায় নিজের জয়। এতে করে কথায় কথায় কথা বেড়ে শুধু সময়ের অপচয়ই হয়, কোনো সমাধান আর আসে না। তাই মাথা ঠান্ডা করে সমাধান খুঁজুন।
শলোমন বলেন, “ধার্ম্মিকের জিহŸা উৎকৃষ্ট রৌপ্যবৎ, দুষ্টদের অন্তঃকরণ স্বল্পমূল্য।” (হিতোপদেশ ১০:২০) মুখ ও কথার দ্বারা মানুষের মনোভাব ভালো কিংবা মন্দ; তা প্রকাশ পায়। নিয়ন্ত্রণহীন কথা ও মুখ অন্যায় সংঘটিত হওয়ার উৎস। মানুষের মুখ ও মুখের কথা ঠিক তো তার যাবতীয় বিষয় ঠিক। ব্যভিচার প্রতিরোধে মুখ ও মুখের কথার ভ‚মিকা রয়েছে। মুখ ও মুখের কথার দ্বারাই তা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়। অন্তর হচ্ছে ডেগের (বড় পাতিলের) ন্যায়। তাতে যা রয়েছে অথবা দেয়া হয়েছে তাই রান্না হতে থাকবে। বাড়তি কিছু নয়। আর মুখ হচ্ছে চামচের ন্যায়। যখন কেউ কথা বলে তখন সে তার মনোভাবই ব্যক্ত করে। অন্য কিছু নয়। যেভাবে আপনি কোনো পাত্রে রাখা খাদ্যের স্বাদ জিহবা দিয়ে অনুভব করতে পারেন ঠিক তেমনিভাবে কারোর মনোভাব আপনি তার কথার মাধ্যমেই টের পাবেন। সুতরাং কখনো অযথা কথা বলা যাবে না। যদি কখনো অন্তরে কোনো কথা বলার ইচ্ছা জাগে; তাহলে আগেই চিন্তা করতে হবে যে, এ কথার দ্বারা কোনো উপকারিতা আছে কিনা? যদি তাতে কোনো ধরনের উপকারিতা না থাকে তবে তা থেকে বিরত থাকা অর্থাৎ কোনো কথা না বলা। আর যদি তাতে কোনো ধরনের উপকারিতা থাকে তবে দেখতে হবে এ কথার চেয়ে আরো লাভজনক কোনো কথা আছে কি না? যদি থেকে থাকে তাহলে তাই বলবে। অন্য কোনো কথা নয়। ধার্মিক ব্যক্তি যা বলেন তা খাঁটি, অত্যন্ত উচ্চ মানের, পরিশোধিত রুপোর মতো, যেটাতে কোন খাদ নেই। এটা বিশেষ করে যিহোবার দাসদের প্রতি সত্য যখন তারা ঈশ্বরের বাক্যের জীবন-রক্ষাকারী জ্ঞান অন্যদেরকে জানান। তাদের সর্বমহান শিক্ষক যিহোবা ঈশ্বর তাদেরকে শিক্ষিত করেছেন এবং ‘তাহাদের শিক্ষাগ্রাহীদের জিহŸা দিয়াছেন, যেন তারা বুঝিতে পারে, কিরূপে ক্লান্ত লোককে বাক্য দ্বারা সুস্থির করিতে হয়।’ (যিশাইয় ৩০:২০; ৫০:৪) সত্যিই, তাদের জিহŸা যখন অন্যদেরকে বাইবেলের সত্য জানায়, তখন তা উচ্চ মানের রুপোর মতোই হয়। দুষ্ট লোকেদের কুমন্ত্রণার চেয়ে সৎ ব্যক্তিদের জন্য তাদের কথাগুলো কত হাজার গুণ বেশি মূল্যবান! আসুন আমরা ঈশ্বরের রাজ্য ও তাঁর চমৎকার কাজগুলো সম্বন্ধে বলতে তৎপর হই।
ধার্মিক ব্যক্তিরা তাদের আশেপাশের লোকেদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। শলোমন বলেন, “ধার্ম্মিকের ওষ্ঠাধর অনেককে প্রতিপালন করে, কিন্তু অজ্ঞানেরা বুদ্ধির অভাবে মারা পড়ে।”Ñহিতোপদেশ ১০:২১। ‘মুখে মধু অন্তরে বিষ’ বলে একটি কথা রয়েছে। এ জাতীয় মানুষ হতে সাবধান। কেননা তাদের কথা ছুরির চেয়ে কথায় ধার বেশি হয়। তার কথাও খারাপ; আর অন্তরও খারাপ। হৃদয়ের চিত্রটা অনেক সময়ই এরকম আকৃতি ধারণ করে। বাইরে থেকে আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এমন কল্যাণকর কোন দিন কি যায় যেদিন কেউ আমার সম্পর্কে এমনটা ভাবে না? সত্যি করে বলছি, বাস্তবজীবনে এমন অনেক মানুষকে জানি যার ভালো-খারাপ দুই দিকটাই দেখি। কেউ কারো সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাবলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিলিং করা উচিত; যার উপর সে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত তার ভালো দিকটা দেখিয়ে দেয়ার। এভাবেই একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হয়, অন্যদের সম্পর্কে সুধারনা করতে হয়। বিপত্তি বাধে অপরিচিত মানুষদের নিয়ে। একটা মানুষের তাকানো আমাদের কষ্ট দেয়, কথা বলা কষ্ট দেয়, মন্তব্য কষ্ট দেয়। চোখের সামনে তখন ঐ মানুষটার ভেতরের চিত্র এই ছবির মত মনে হয়। দুষ্ট মুখের ছবিটা খুব ভীতিকর সবার কাছে। কতটা নেতিবাচক চিন্তা, দুর্ব্যবহার, রুক্ষতা, চটাং চটাং কথা, হিংসা, একে অপরকে ছোট করার, হেয় করার চিন্তা থাকলে মানুষ মানুষের হৃদয় সম্পর্কে এমন দৃশ্য কল্পনা করতে পারে। ভালো কথায় হৃদয়ে সবার স্বস্তি জাগে। মানুষ আমার উপর বিরক্ত নয়, আমার কথায় কেউ কষ্ট পায় না। আমার মুখের কথাকে কারো ছুরির ফলার মতো মনে হয় না, তখন সে নিশ্চয় দেখে আমার হৃদয়কে ঘিরে আছে হাজারো সুন্দর ফুলের বাগান। মাঝখানে আমার হৃদয়। সেখানে আলো ফেলছে সূর্য। মানুষই তো মানুষ সম্পর্কে এমনটা ভাবে। কত কত মানুষের দেখা পেয়েছি যাদের হৃদয় সম্পর্কে আমার এমনই ধারণা। তাদের কাছে গেলেই ভালো লাগে। মনে হয় এক অন্যরকম ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। আবার এমন অনেক মানুষকে পাই, পেয়েছি যাদের দেখলেই মনে হয় মীরজাফর। আর যদি তার হৃদয় নিয়ে ভাবি। কোন সন্দেহ নেই এ ছবির হৃদয়টা যা সেরকমই মনে আসে। এর থেকে ভালো কিছু চিন্তা তাদের নিয়ে করা এটা সহজাত প্রবৃত্তিতে আসে না। একজন কথায় বিষ ঢেলেছে, আমি কি করে তাকে বলব তুমি ওর প্রতি ভালো ধারণা রাখ। সাপ, বিচ্ছু কিছুই তো ভালো কিছু না। মানুষের জন্যে ভীতিকর প্রাণী। আর আমরা মানুষ হয়ে মানুষের সম্পর্কে এমন ধারণা করছি। সুতরাং মানুষের কোনো কোনো সময় এতোই খারাপ হয়ে যায় যে, সাপ বিচ্ছুর চেয়েও খারাপ। একজন মানুষের মুখের চরিত্রকে সাপের মতো ভাবছি, অক্টোপাসের মতো ভাবছি, জোঁক, কেঁচো, চ্যালা, বিচ্ছুর মতো ভাবছি। এক শ্রেণীর মানুষই পারে নগদ নগদ মুখের কথা, মন্তব্য দিয়ে অচেনা, অজানা কারো অন্তরে ছুরি চালিয়ে দেয়; ঠিক সাপের মত। সাপ যাকে পায় তাকেই ছোবল মারে; বুঝে না বুঝে। সুতরাং জিহŸার ধর্ম অনুসারে এটাই ওর কাজ। আমাদের আশপাশে পরিচিত জনদের মধ্যে এমন অনেক কিছুই আমরা দেখি যখন একজন কে দেখে মনে হয় তার মুখে মধু নেই। কথায় বিষ আছে। আমাদের কথা, কাজ, আচরণের জন্যে অনেকের কাছেই আমাদের হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি এরকম। আপনাকে-আমাকে তারা কাছ থেকে দেখে না।
কীভাবে ‘ধার্ম্মিক অনেককে প্রতিপালন করে’? এখানে যে ইব্রীয় শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে এর মানে হল “চরানো।” (হিতোপদেশ ১০:২১)- এর অর্থ পরিচালনা করা ও সেইসঙ্গে পুষ্টিবিধান করাকে বোঝায়, অনেকটা প্রাচীনকালের মেষপালকদের মতো, যারা তাদের মেষদের যতœ নিত। (১ শমূয়েল ১৬:১১; গীতসংহিতা ২৩:১-৩; পরমগীত ১:৭) ধার্মিক ব্যক্তি অন্যদেরকে ধার্মিকতার পথে পরিচালিত করে বা নিয়ে যায়, তার কথাবার্তা শ্রোতাদের পুষ্টিবিধান করে। ফলে, তারা আরও সুখী, পরিতৃপ্তিজনক জীবন ও এমনকি অনন্ত জীবনও লাভ করতে পারেন। কিন্তু, একজন বোকা ব্যক্তির সম্বন্ধে কী বলা যায়? বুদ্ধির অভাব থাকায় কাজের পরিণতি সম্পর্কে তার মধ্যে ভাল উদ্দেশ্য বা চিন্তা কোনটাই দেখা যায় না। এরকম ব্যক্তি শুধু তার ইচ্ছেখুশি মতো কাজ করে, কাজের পরিণতি সম্বন্ধে ভেবে দেখে না। তাই, তার কাজের জন্যে সে শাস্তি ভোগ করে। ধার্মিক ব্যক্তি অন্যদেরকে বাঁচাতে সাহায্য করেন কিন্তু যার বুদ্ধির অভাব রয়েছে, সে এমনকি নিজেকেও বাঁচাতে পারে না। একজন ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ দেখে প্রায়ই বোঝা যায় যে তার ব্যক্তিত্ব কেমন। এই বিষয়টা উল্লেখ করে ইস্রায়েলের রাজা বলেন: “কুকর্ম্ম করা অজ্ঞানের আমোদ, আর প্রজ্ঞা বুদ্ধিমানের আমোদ।” (হিতোপদেশ ১০:২৩) জিহŸাকে দমন করার সঙ্গে আমরা যা বলি সেই ব্যাপারে লক্ষ রাখার চেয়ে আরও বেশি কিছু জড়িত। বস্তুতপক্ষে, আমাদের কথাবার্তা মুখ থেকে নয় বরং হৃদয় থেকে আসে। যিশু বলেছিলেন: “ভাল মানুষ আপন হৃদয়ের ভাল ভাÐার হইতে ভালই বাহির করে; এবং মন্দ মানুষ মন্দ ভাÐার হইতে মন্দই বাহির করে; যেহেতুক হৃদয়ের উপচয় হইতে তাহার মুখ কথা কহে।” (লূক ৬:৪৫) তাই, আপনার জিহŸাকে দমন করার জন্য আপনাকে হয়তো দায়ূদের মতো প্রার্থনা করতে হবে: “হে ঈশ্বর, আমাতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ সৃষ্টি কর, আমার অন্তরে সুস্থির আত্মাকে নূতন করিয়া দেও।” (গীতসংহিতা ৫১:১০)
মানব অসিদ্ধতা ছাড়াও, পারিবারিক পরিবেশ জিহŸার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে ভ‚মিকা পালন করে। কিছু লোক এমন ঘরে মানুষ হয়েছে, যেখানে বাবামারা ছিল “ক্ষমাহীন [‘ঝগড়া করে আপোস করে না,’ বাংলা কমন ল্যাঙ্গুয়েজ ভারসন], . . . অজিতেন্দ্রিয়, প্রচÐ।” (২ তীমথিয় ৩:১-৪) বেশির ভাগ সময়ই, যে-ছেলেমেয়েরা এই ধরনের পরিবেশে বড় হয়, তারা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে তখন একইরকম বৈশিষ্ট্য দেখিয়ে থাকে। অবশ্য, অসিদ্ধতা অথবা অনুপযুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া, কোনোটাই ক্ষতিকর কথাবার্তার জন্য কোনো অজুহাত হতে পারে না। তবে, এই বিষয়গুলো সম্বন্ধে সচেতন থাকা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, ক্ষতিকর কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে জিহŸাকে দমন করা কারো কারো পক্ষে কেন বিশেষভাবে প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক।
কেউ কেউ কুকর্মকে আমোদ বা খেলার মতো দেখে আর শুধু “মজা” করার জন্যে তারা কুকর্ম করে। এধরনের ব্যক্তিরা যাঁর কাছে সকলকে নিকাশ দিতে হবে, সেই ঈশ্বরকে অবজ্ঞা করে এবং নিজেদের অন্যায় কাজের প্রতি তারা অন্ধ হয়ে থাকে। (রোমীয় ১৪:১২) তারা বিকৃত যুক্তি দেখিয়ে এ বলে নিজেদেরকে ভোলায় যে, ঈশ্বর তাদের অন্যায় দেখতে পাচ্ছেন না। তাদের কাজের দ্বারা তারা আসলে বলে: “ঈশ্বর নাই।” (গীতসংহিতা ১৪:১-৩; যিশাইয় ২৯:১৫, ১৬) কত বোকা! মানুষকে প্রধানত কথা ও কাজের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া হয়ে থাকে। কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া বলতে গালি দেওয়া, গিবত-তোহমত, চোগলখুরি করা, খোটা দেওয়া, তুচ্ছ জ্ঞান করা ইত্যাদি বোঝায়। আর কাজের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া বলতে জুলুম করা, ধোঁকা-প্রতারণা, রাস্তা বন্ধ করা, সম্পদ জবরদখল করা, হত্যা করা ইত্যাদি বুঝায়। অন্যদিকে, বিচক্ষণ ব্যক্তি জানেন যে কুকর্ম করা কোন খেলা নয়। তিনি জানেন যে, এটা ঈশ্বরকে অখুশি করে এবং একজন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে নষ্ট করতে পারে। এধরনের আচরণ হলো বোকামি। কারণ, এটা লোকেদের আত্ম-সম্মানকে হরণ করে, বিয়ে ভেঙে দেয়, মন ও শরীর উভয়কেই কলুষিত করে এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর প্রতি উপলব্ধি কমিয়ে দেয়। কুকর্মকে পরিহার করলে এবং এক প্রিয় বোনের প্রতি যেমন ভালোবাসা গড়ে তুলি; তেমনই প্রজ্ঞার জন্যে ভালোবাসা গড়ে তুললে আমরা বিজ্ঞ। (হিতোপদেশ ৭:৪) একজনের জীবনকে সঠিক ভিত্তিমূলের ওপর গেঁথে তোলার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে শলোমন বলেন: “দুষ্ট যাহা ভয় করে, তাহার প্রতি তাহাই ঘটিবে; কিন্তু ধার্ম্মিকদের বাসনা সফল হইবে। যখন ঘূর্ণবায়ু বহিয়া যায়, দুষ্ট আর নাই; কিন্তু ধার্ম্মিক নিত্যস্থায়ী ভিত্তিমূলস্বরূপ।” (হিতোপদেশ ১০:২৪, ২৫) দুষ্ট লোক হয়তো অন্যদের ভয়ের কারণ হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভয় তার নিজের ওপরই এসে পড়ে। ভিত্তিমূল ধার্মিক নীতিগুলোর ওপর গেঁথে না ওঠায় সে দুর্বল এক বিল্ডিংয়ের মতো হয়, যেটা বড় কোনো ঝড় এলেই ভেঙে পড়ে। সে চাপকে প্রতিরোধ করতে পারে না। কারণ যা-ই হোক না কেন, আঘাত দেয় এমন কথাবার্তা বিয়েতে ব্যবহার করা নিজের স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা ও সম্মানের অভাবকে ইঙ্গিত করতে পারে। উত্তম কারণেই পিতর খ্রিস্টানদেরকে ‘সমস্ত পরীবাদ ত্যাগ করিবার’ উপদেশ দিয়েছিলেন। (১ পিতর ২:১) যে-গ্রিক শব্দকে “পরীবাদ” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, সেটির অর্থ হল “অপমানজনক ভাষা।” এটি ‘লোকেদেরকে কথার দ্বারা বিদ্ধ করার’ ধারণা প্রকাশ করে। এটা এক অশান্ত জিহŸার প্রভাবগুলোকে কত ভালভাবেই না বর্ণনা করে! অন্যদিকে, ধার্মিক ব্যক্তি এমন একজন ব্যক্তির মতো, যিনি যীশুর কথা অনুযায়ী কাজ করেন। তিনি ‘একজন বুদ্ধিমান লোক . . . যিনি পাষাণের উপরে আপন গৃহ নির্ম্মাণ করিলেন।’ যীশু বলেছিলেন, “পরে বৃষ্টি নামিল, বন্যা আসিল, বায়ু বহিল, এবং সেই গৃহে লাগিল, তথাপি তাহা পড়িল না, কারণ পাষাণের উপরে তাহার ভিত্তিমূল স্থাপিত হইয়াছিল।” (মথি ৭:২৪, ২৫) এইরকমের ব্যক্তি দৃঢ় অর্থাৎ ঈশ্বরের নীতিগুলোর ওপর তার চিন্তা ও কাজগুলোর দৃঢ় ভিত্তি আছে। অপমানজনক কথাবার্তাকে হয়তো ততটা গুরুতর বলে মনে না-ও হতে পারে কিন্তু একজন স্বামী বা স্ত্রী যদি এই ধরনের কথাবার্তা ব্যবহার করেন, তা হলে কী ঘটে তা বিবেচনা করুন। নিজের সাথিকে বোকা, অলস অথবা স্বার্থপর বলার অর্থ প্রকাশ করে যে, তার সম্পূর্ণ চরিত্রকে একটা আখ্যা দিয়ে সারাংশ করা যেতে পারে আর তা এক মর্যাদাহানিকর আখ্যা! নিশ্চিতভাবেই এটা নিষ্ঠুর কাজ। আর অতিরঞ্জিত উক্তিগুলো সম্বন্ধেই বা কী বলা যায়, যেগুলো সাথির ত্রæটিগুলোকে বড় করে তুলে ধরে? “তুমি সবসময়ই দেরি করো” অথবা “তুমি কখনোই আমার কথা শোনো না,” এই ধরনের বিবৃতিগুলো কি আসলেই অতিরঞ্জন নয়? এগুলো নিশ্চিতভাবে এক আত্মরক্ষামূলক প্রত্যুত্তর করতে বাধ্য করবে। আর এর ফলে হয়তো প্রচÐ তর্কবিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে।Ñযাকোব ৩:৫. দুষ্ট ও ধার্মিক ব্যক্তির মধ্যে আরও পার্থক্য তুলে ধরার আগে জ্ঞানী রাজা সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ এক সাবধানবাণী জানান। তিনি বলেন: “যেমন দন্তের পক্ষে অ¤øরস ও চক্ষের পক্ষে ধূম, তেমনি আপন প্রেরণকর্ত্তাদের পক্ষে অলস।” (হিতোপদেশ ১০:২৬) অ¤øরস দাঁতের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মধ্যে যে এসিটিক এসিড রয়েছে তার স্বাদ টক এবং এর ফলে একজনের দাঁত শিরশির করতে পারে। ধোঁয়ার জন্য চোখ জ্বলে ও ব্যথা করে। ঠিক একইভাবে কেউ যদি কাজের জন্য কোন অলস ব্যক্তিকে রাখেন অথবা তাকে দিয়ে কোন কাজ করান, তাহলে সেই ব্যক্তির জন্য সেটা সত্যিই বিরক্তিকর হবে ও আর্থিকভাবে তার অনেক লোকসান হবে।
আঘাত দেয় এমন কথাবার্তা যদি ধীরে ধীরে আপনার বিয়ের অংশ হয়ে ওঠে, তা হলে আপনি পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারেন। কিন্তু, এর জন্য কঠোর প্রচেষ্টার প্রয়োজন। কেন? একটা কারণ হল যে, আপনাকে অসিদ্ধ মাংসের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পাপ আমরা যেভাবে চিন্তা করি ও পরস্পরের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। “যদি কেহ বাক্যে উছোট না খায়,” যাকোব লিখেছিলেন, “তবে সে সিদ্ধ পুরুষ, সমস্ত শরীরকেই বল্গা দ্বারা বশে রাখিতে সমর্থ।” (যাকোব ৩:২) আপনি আপনার সাথির সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, তা লক্ষ করা বিজ্ঞতার কাজ। যদি চাপপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা দেয়, তা হলে চাপ কমানোর চেষ্টা করুন। ইস্হাক ও তার স্ত্রী রিবিকার জীবনে যে-পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, তা বিবেচনা করুন, যা আদিপুস্তক ২৭:৪৬–২৮:৪ পদে লিপিবদ্ধ রয়েছে। “রিবিকা ইস্হাককে কহিলেন, এই হিত্তীয়দের কন্যাদের বিষয় আমার প্রাণে ঘৃণা হইতেছে; যদি যাকোবও ইহাদের মত কোন হিত্তীয় কন্যাকে, এতদ্দেশীয় কন্যাদের মধ্যে কোন কন্যাকে বিবাহ করে, তবে প্রাণধারণে আমার কি লাভ?” এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে, ইস্হাক রূঢ়ভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। এর পরিবর্তে, তিনি তাদের ছেলে যাকোবকে এমন এক ঈশ্বরভয়শীল স্ত্রী খোঁজার জন্য পাঠিয়েছিলেন, যে-স্ত্রী হয়তো রিবিকার দুর্দশার উৎস হয়ে উঠবে না। ধরুন, একজন স্বামী ও তার স্ত্রীর মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দক্ষতার সঙ্গে “তুমি” শব্দের জায়গায় “আমি” শব্দ ব্যবহার করা, ছোটখাটো মতবিরোধকে ধীরে ধীরে প্রচÐ তর্কবিতর্কে পরিণত করা থেকে রোধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, “তুমি কখনোই আমার সঙ্গে সময় কাটাও না!” এটা বলার পরিবর্তে এই কথা বলুন না কেন, “আমি চিন্তা করছিলাম, আমরা যদি একসঙ্গে সময় কাটাতে পারতাম”? কেবল ব্যক্তির ওপর নয় বরং সমস্যার ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভ‚ত করুন। কে ঠিক আর কে ভুল, তা যাচাই করার প্রবণতাকে প্রতিরোধ করুন। “যে যে বিষয় শান্তিজনক, ও যে যে বিষয়ের দ্বারা পরস্পরকে গাঁথিয়া তুলিতে পারি, আমরা সেই সকলের অনুধাবন করি,” রোমীয় ১৪:১৯ পদ বলে।
ইস্রায়েলের রাজা বলে চলেন: “সদাপ্রভুর ভয় আয়ুবৃদ্ধি করে; কিন্তু দুষ্টদের বৎসর-সংখ্যা হ্রাস পাইবে। ধার্ম্মিকদের প্রত্যাশা আনন্দজনক; কিন্তু দুষ্টদের আশ্বাস বিনাশ পাইবে।” (হিতোপদেশ ১০:২৭, ২৮) ধার্মিক ব্যক্তি ঈশ্বরীয় ভয়ে চলেন এবং তার চিন্তা, কথা ও কাজগুলোর দ্বারা যিহোবাকে খুশি করতে চান। ঈশ্বর তার জন্য চিন্তা করেন এবং তার ধার্মিক ইচ্ছাগুলোকে পূর্ণ করেন। কিন্তু, দুষ্ট লোক নোংরা জীবনযাপন করে। কখনও মনে হতে পারে যে তার আশাগুলো পূর্ণ হচ্ছে বলে কিন্তু তা আসলে কিছু সময়ের জন্য হয় কারণ হিংসা বা নোংরা জীবনযাপনের জন্য কোন অসুখে পড়ে তার আয়ু কমে যেতে পারে। মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত আশা নষ্ট হয়ে যায়। (হিতোপদেশ ১১:৭) শলোমন বলেন, “সদাপ্রভুর পথ সিদ্ধের পক্ষে দুর্গ, কিন্তু তাহা অধর্ম্মাচারীদের পক্ষে সর্ব্বনাশ।” (হিতোপদেশ ১০:২৯) পথ বলতে এখানে আমাদের যে পথে চলা উচিত জীবনের সেই পথকে বোঝাচ্ছে না বরং মানুষের সঙ্গে ঈশ্বর যেভাবে ব্যবহার করেন সেটাকে বোঝাচ্ছে। মোশি বলেছিলেন, “তিনি শৈল, তাঁহার কর্ম্ম সিদ্ধ, কেননা তাঁহার সমস্ত পথ ন্যায্য।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:৪) ঈশ্বরের ধার্মিক পথগুলোর মানে ধার্মিকদের জন্য নিরাপত্তা এবং দুষ্টদের জন্য সর্বনাশ। যিহোবা তাঁর লোকদের জন্যে কত দৃঢ় দুর্গ বলেই না প্রমাণিত হন! “ধার্ম্মিক লোক কখনও বিচলিত হইবে না; কিন্তু দুষ্টগণ দেশে বাস করিবে না। ধার্ম্মিকের মুখ প্রজ্ঞা-ফলে ফলবান; কিন্তু কুটিল জিহŸা ছেদন করা যাইবে। ধার্ম্মিকের ওষ্ঠাধর সন্তোষের বিষয় জানে, কিন্তু দুষ্টদের মুখ কুটিলতামাত্র।” (হিতোপদেশ ১০:৩০-৩২) একটি মতিচ্ছন্ন, দুর্বশ বা বিকৃত জিহŸা কি? এটি বিকৃত বক্তব্য বা কথাবার্তা। জিহŸা এখানে কথা বলার একটি রূপক শব্দ, যেখানে কথা বলার মাধ্যম কথা বলার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হয়। কোন পুরুষদের ভদ্র জিহŸা আছে? দুষ্ট পুরুষদের! নিরুদ্দিষ্ট শব্দ আছে, যাকে উপবৃত্ত বলা হয়, দ্বিতীয় ধারায়, প্রথম ধারার বিপরীতে দেখা যায়। ধার্মিক পুরুষরা বুদ্ধিমানের সাথে কথা বলে; দুষ্ট লোকেরা ভীতুভাবে বা বিকৃতভাবে কথা বলে। বিকৃত, মতিচ্ছন্ন বক্তৃতা কাকে বলে? এটি একটি বিশেষণ যার অর্থ হল, “অভ্যাসগতভাবে অবাধ্যতা এবং বিরোধিতা করা, বিকৃত মস্তিষ্ক, যার সাথে কোন সম্পর্ক রাখা কঠিন এবং যাকে খুশি করা কঠিন। “ এই ধরনের পুরুষরা বিরক্তিকর এবং এই ধরনের মহিলারা জঘন্য; জগতও যাদের সহ্য করতে পারে না। আপনি হয়তো এমন ভাষণ আগেও শুনেছেন। আপনি কি কখনও এই ধরনের বক্তৃতার দোষী হয়েছেন? মনে রাখবেন, মন্দ হৃদয়ের পুরুষ (বা মহিলা) গ্রহণযোগ্য উপায়ে কথা বলতে পারে না; তারা বিকৃত (হিতোপদেশ ১০:৩২)। তারা সমালোচনামূলক, চরম, কঠোর, নেতিবাচক, ব্যঙ্গাত্মক এবং অকৃতজ্ঞ হয়। তারা অভিযোগ করতে, গর্বিত হতে, অপবাদ দিতে, ফিসফিস করতে, ঠাট্টা-তামাশা করতে, বকাঝকা করতে ভালোবাসে। তারা বোকা কথা বলে, নোংরা কথাবার্তা, জাগতিক বিষয়, ঠাট্টা-তামাশা এবং প্রতারণার জন্য পরিচিত, তারা সবসময় বকবক করে। তারা বেশিরভাগ সবাইকে বিরক্ত করে এবং হতাশ করে, কারণ তারা নিজেই খুব কম গঠনমূলক বা, প্রজ্ঞার কথা বলে, তবুও তারা বকবক বন্ধ করতে পারে না। তারা বিরক্তিকর এবং জঘন্য হয়। অপমানজনক কথাবার্তাপূর্ণ আলাপআলোচনা একটা বিয়েতে চাপ সৃষ্টি করে আর এটাও মারাত্মক পরিণতি ঘটাতে পারে। হিতোপদেশ ২৫:২৪ পদ বলে: “বরং ছাদের কোণে বাস করা ভাল; তবু বিবাদিনী স্ত্রীর সহিত প্রশস্ত বাটীতে বাস করা ভাল নয়।” অবশ্য, বিবাদ করে এমন স্বামীর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো সাথির কাছ থেকে আঘাত দেওয়ার মতো কথাবার্তা একটা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে আর এর ফলে হয়তো একজন স্বামী বা স্ত্রী মনে করতে পারেন যে, তাকে ভালবাসা হয় না, এমনকি তিনি ভালবাসা পাওয়ারও যোগ্য নন। স্পষ্টতই, জিহŸাকে দমন করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, কীভাবে তা করা যেতে পারে?
এই হিতোপদেশ বেশ আরও অনেক বিষয়ের শিক্ষা দেয়। এতে বলা হয়েছে, কৃপণ জিহŸা কেটে ফেলা হবে। একটি জিহŸা কেটে ফেলা নিষ্ঠুর এবং কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর তার গম্ভীরতা ঘোষণা করতে চান এবং আমরাও যেন তাঁর প্রতি গম্ভীর হই। যারা বুদ্ধিমান বা গ্রহণযোগ্যভাবে কথা বলবে না ঈশ্বর এবং ভালো মানুষেরা তাদের বিচার করবে। ঈশ্বর তাদের এই জীবনে এবং পরবর্তী জীবনে বিচার করবেন, এবং ভালো মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। যেহেতু হিতোপদেশটির দুটি সমান্তরাল ধারা রয়েছে, এটি বোঝায় যে ঈশ্বর এবং ভালো মানুষ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে তার বক্তৃতার জন্য আশীর্বাদ করবেন। একজন ধার্মিক লোক গ্রহণযোগ্য এবং লাভজনক কথা বলার জন্য আশীর্বাদ পাবে, কিন্তু একজন দুষ্ট লোক বিকৃত ও ভুল কথা বলার জন্য ধ্বংস হবে। এই পার্থক্য উল্লেখযোগ্য আছে। আপনার ভবিষ্যৎ আপনার বক্তব্যের উপর নির্ভর করে। যীশু বলেছেন আপনার কথার দ্বারা আপনার বিচার করা হবে (মথি ১২:৩৬-৩৭)। যাকোব ৩:৮ পদ বলে, “জিহŸাকে দমন করিতে কোন মনুষ্যের সাধ্য নাই।” তা সত্তে¡ও, পশুর গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একজন অশ্বারোহী যেমন একটা ঘোড়াকে বল্গা বা লাগাম পরান, তেমনই আমাদের জিহŸাকে বল্গা দ্বারা বশে রাখার জন্য যথাসাধ্য করা উচিত। “যে ব্যক্তি আপনাকে ধর্ম্মশীল বলিয়া মনে করে, আর আপন জিহŸাকে বল্গা দ্বারা বশে না রাখে, কিন্তু নিজ হৃদয়কে ভুলায়, তাহার ধর্ম্ম অলীক।” (যাকোব ১:২৬; ৩:২, ৩) এই কথাগুলো দেখায় যে, আপনি যেভাবে আপনার জিহŸাকে ব্যবহার করেন, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা আপনার সাথির সঙ্গে আপনার সম্পর্কের চেয়ে আরও বেশি কিছুকে প্রভাবিত করে; এটা যিহোবা ঈশ্বরের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। (১ পিতর ৩:৭) অতএব, কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তার পরিণতি ভীষণ ভয়াবহ হয়। মৃত্যু এবং জীবন আপনার জিহŸার শক্তিতে (হিতোপদেশ ১৮:২১)। অন্যরা নিরুৎসাহিত হয় এবং আঘাত পায় যখন আপনি তাদের সাথে বিকৃত ভাবে কথা বলেন, এবং স্বর্গের সত্য ঈশ্বর তাদের সাথে এইভাবে কথা বলার জন্য আপনাকে শাস্তি দেবেন। প্রজ্ঞার কোনো কথা বলতে না পারলে মুখ বন্ধ রাখুন। ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করে এমন সদয় এবং প্রজ্ঞার কথা দিয়ে অন্যদের গড়ে তোলার জন্য আপনার মূল্যবান বক্তৃতা ব্যবহার করুন। বৃদ্ধ বয়সে গীতরচক দায়ূদ বলেছিলেন, “আমি যুবক ছিলাম, এখন বৃদ্ধ হইয়াছি, কিন্তু ধার্ম্মিককে পরিত্যক্ত দেখি নাই, তাহার বংশকে খাদ্য ভিক্ষা করিতে দেখি নাই।” (গীতসংহিতা ৩৭:২৫) যিহোবা ঈশ্বর ধার্মিকদের ভালবাসেন এবং প্রেমের সঙ্গে তাদের যতœ নেন। তাঁর বাক্য বাইবেলে তিনি সত্য উপাসকদের পরামর্শ দেন তারা যেন ধার্মিকতার অনুশীলন করে। (সফনিয় ২:৩)
ধার্মিকতার মানে হলো, কোনটা ভালো ও কোনটা মন্দ সেই বিষয়ে ঈশ্বরের মানগুলোকে মেনে চলা। আমাদেরকে ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে চলতে উৎসাহ দিয়ে বাইবেলের হিতোপদেশ বইয়ের ১০ অধ্যায় দেখায় যে, যারা তা মেনে চলবে তাদের জন্য প্রচুর আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর আধ্যাত্মিক পুষ্টিকর খাবার, পুরস্কারজনক ও তৃপ্তিদায়ক কাজ এবং ঈশ্বর ও মানুষদের মধ্যে এক উত্তম সম্পর্ক। তাই, আসুন আমরা হিতোপদেশ ১০:১-১৪ পদ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। এটি এক চমৎকার প্রেরণা আমাদের জন্যে। অধ্যায়ের শুরুতে বলা কথাগুলো পড়লে কোন সন্দেহ থাকে না যে, হিতোপদেশ বইয়ের পরের অংশটুকু কে লিখেছেন। সেখানে পড়া হয়: “শলোমনের হিতোপদেশ।” যা সঠিক তা করা এক চমৎকার প্রেরণার বিষয় বলে প্রাচীন ইস্রায়েলের রাজা শলোমন বলেছিলেন: “জ্ঞানবান পুত্ত্র পিতার আনন্দজনক, কিন্তু হীনবুদ্ধি পুত্ত্র মাতার খেদজনক।” (হিতোপদেশ ১০:১.) কোনো সন্তান যখন সত্য এবং জীবন্ত ঈশ্বরের উপাসনা ছেড়ে চলে যায়, তখন বাবামা কত দুঃখ পান! জ্ঞানী রাজা বিশেষ করে শুধু মার দুঃখের কথা বলেন, যার থেকে মনে হয় যে বাবার চেয়ে মা-ই বেশি দুঃখ পান। ছেলেমেয়েরা বাবার আনন্দের ওপর ছাপ ফেলতে পারে এবং মার দুঃখের কারণ হতে পারে। আসুন আমরা প্রজ্ঞা দেখাই এবং আমাদের বাবা-মাদের জন্যে আনন্দ নিয়ে আসি। আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আসুন আমরা আমাদের স্বর্গীয় পিতা যিহোবার হৃদয়কে আনন্দিত করি। বাইবেল লেখক যাকোব বলেন যে, জিহŸা হল “অশান্ত মন্দ বিষয়,” যা “মৃত্যুজনক বিষে পরিপূর্ণ।” (যাকোব ৩:৮) যাকোব অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সত্য সম্বন্ধে অবগত ছিলেন: এক অশান্ত জিহŸা হল ধ্বংসাত্মক। নিঃসন্দেহে, তিনি বাইবেলের সেই প্রবাদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, যা অবিবেচনাপূর্ণ কথাবার্তাকে “খড়্গাঘাতের” সঙ্গে তুলনা করে। এর বৈসাদৃশ্যে, সেই একই প্রবাদ বলে যে, “জ্ঞানবানদের জিহŸা স্বাস্থ্যস্বরূপ।” (হিতোপদেশ ১২:১৮) সত্যিই, কথাবার্তা এক জোরালো প্রভাব ফেলতে পারে। সেগুলো হয় আঘাত দিতে নতুবা স্বাস্থ্যকর হতে বা গেঁথে তুলতে পারে। আপনার বিবাহসাথির ওপর আপনার কথাবার্তার কোন প্রভাব রয়েছে? আপনি যদি আপনার স্বামী বা স্ত্রীকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেন, তা হলে তিনি কেমন উত্তর দেবেন? অতএব, জিহŸা সাবধান-দমন আবশ্যক।
বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৫
২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন









