দীপ্তি : ক্ষুদীরাম দাস

দীপ্তি শব্দের অর্থ হলো আলো, দ্যুতি, কান্তি, শোভা, প্রভা, ঔজ্জ্বল্য, উজ্জ্বলতা, কিরণ, বা তেজ। সৃষ্টির শুরুতেই দীপ্তি শব্দটি আমরা দেখতে পাই। বাইবেলের আদিপুস্তকের বর্ণনা অনুসারে, ঈশ্বর প্রথম দিনে দীপ্তি বা আলো তৈরি করেন। প্রথম দিনেই তিনি আলো তৈরি করে দিন ও রাতের পার্থক্য করেন। সুতরাং, দীপ্তি বা আলো তৈরির কাজটি ঈশ্বরের প্রথম দিনের সৃষ্টি কাজের অন্তর্ভুক্ত।

দীপ্তির অনেক গুণের বণনা করে শেষ করা যায় না। দীপ্তি কোনো কিছু থেকে বিকীর্ণ আলো বা তেজ উৎপন্ন করে। কোনো কিছুতে প্রতিফলিত হয়ে তা’ উজ্জ্বলতা স্পষ্ট দেখা যায়। সেই দীপ্তি কোনো কিছু আলোকিত করে। আবার কোনো ব্যক্তির জীবন আলোকিত করার গুণ বিদ্যমান রাখে। উপরন্তু দীপ্তি প্রতিফলিত হয়ে কোনো কিছুর উজ্জ্বলতা বা চাকচিক্য প্রকাশ করে।

পবিত্রশাস্ত্র মতে, ২ করিন্থীয় ৪:৬ পদে আমরা স্পষ্ট আত্মীক দীপ্তির ব্যাখ্যা পেতে পারি। সেখানে লেখা আছে, ‘কারণ যে ঈশ্বর বলিয়াছিলেন, ‘অন্ধকারের মধ্য হইতে দীপ্তি প্রকাশিত হইবে,’ তিনিই আমাদের হৃদয়ে দীপ্তি প্রকাশ করিলেন, যেন যীশু খ্রীষ্টের মুখমÐলে ঈশ্বরের গৌরবের জ্ঞান- দীপ্তি প্রকাশ পায়।’ ঈশ্বরের বাক্যেই দীপ্তির সৃষ্টি হয়েছে (আদিপুস্তক ১:৩)। দীপ্তি অন্ধকার দূর করে, অন্ধকার নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আর সেই দীপ্তি ঈশ্বর আমাদের হৃদয়ে প্রকাশ করেছেন। খ্রীষ্টকে আমাদের জীবনের জন্যে দিয়েছেন। যেন আমরা পাপের অন্ধকার হতে বাঁচতে পারি। খ্রীষ্টের মধ্যদিয়ে জ্ঞান ঈশ্বর আমাদের দিয়েছেন। সেই জ্ঞান দীপ্তিস্বরূপ আমাদের মাঝে প্রকাশিত হয়েছে; যেন আমরা আলোকিত পবিত্র জীবনযাপন করতে পারি।

সাধারণভাবে আমরা অন্ধকারে চলতে পারি না; আমাদের দীপ্তি দরকার। আত্মীকভাবে আমরা পাপে জীবনযাপন করে প্রকৃত সুখ ও শান্তি পাই না; তাই আমাদের পবিত্র দীপ্তি দরকার। যেন আমরা পথ চলতে গিয়ে সবকিছু দেখতে পাই। তাই আমাদের সবসময় গীত রচকের মতো প্রাথনা করা উচিত, ‘তোমার দীপ্তি ও তোমার সত্য প্রেরণ কর; তাহারাই আমার পথপ্রদর্শক হউক (গীতসংহিতা ৪৩:৩)। তাছাড়া জীবনের পথে আমাদের পথ চলতে গিয়ে সদাপ্রভুকে প্রয়োজন। পূবের আকাশে যখন সূর্য ধীরে ধীরে উঁকি দিতে থাকে, তখন একজন পথিক আশেপাশের সবকিছু দেখতে পান। ঈশ্বরের দেয়া আধ্যাত্মিক দীপ্তি আমাদের জীবনে প্রয়োজন; যা আমরা ঈশ্বর হতে অজন করতে পারি। ঈশ্বর আমাদেরকে সববিষয় একবারে বুঝতে না দিয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে দেন। আমরা জানি, ঈশ্বরের পুত্র যীশুখ্রীষ্টও তাঁর মতো করে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দীপ্তি ধীরে ধীরে জুগিয়েছিলেন। সদাপ্রভু তাঁর ভক্তদের জ্ঞানের দীপ্তি জ্বালিয়ে দেন; যেন তারা পথ চলতে অসুবিধা না হয়। সদাপ্রভুই হেেলন আমাদের মহান শিক্ষক; আর জ্ঞানের জন্যে তাঁর দিকেই আমাদের তাকাতে হবে। কেননা তিনিই সমস্ত জ্ঞানের আধার (মালাখি ২:৭; যিশাইয় ৩০:২০)। ঈশ্বরের পুত্র যীশু খ্রীষ্ট মানুষ হয়ে যখন পৃথিবীতে এসেছিলেন তখন তিনি ‘জগতের জ্যোতি’ ছিলেন। আর যীশু ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া দীপ্তি প্রকাশ করেছিলেন। অনেক লোকই ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা আধ্যাত্মিক দীপ্তি ও সত্যকে গ্রহণ না করে মানুষের তৈরি রীতিনীতি মেনে চলাকে বেছে নিয়েছিল (যোহন ১২:৪২, ৪৩)। আমরা বিশ্বাস করি, যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের পর, ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা দীপ্তি আগের চেয়ে আরও উজ্জ্বল হয়েছিলো।

আমরা যতক্ষণ পযন্ত ঈশ্বর হতে বিছিন্ন থাকি; ততক্ষণই আমরা অন্ধকারে অবস্থান করি। আমাদের জীবনের উনুই ঈশ্বরেরই হাতে। একমাত্র ঈশ্বর হতেই আমরা দীপ্তি গ্রহণ করতে পারি; তাহলে আমরা দীপ্তিমতি হতে পারি। আমরা আমাদের দীপ্তি ঈশ্বরের কাছ থেকেই গ্রহণ করতে পারি (গীত ৩৬:৯)। কেননা ঈশ্বরই দীপ্তি সৃষ্টি করলেন (আদিপুস্তক ১:৪)। আর তিনি অন্ধকার হতে দীপ্তি পৃথক করেন। এই ঘটনাটি কেবল আলো এবং অন্ধকারের শারীরিক বিভাজন নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী অর্থও বহন করে। এখানে আলো ধার্মিকতা, সত্য ও ঈশ্বরের উপস্থিতি এবং অন্ধকার মিথ্যা, পাপ ও শয়তানের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সুতরাং, এই উক্তিটি ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তা এবং পৃথকীকরণ করার ক্ষমতা নির্দেশ করে, যা কেবল বস্তুগত আলো-অন্ধকারের বিভাজন নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিভাজনকেও বোঝায়। আর এটা সত্য যে, যারা দীপ্তিতে থাকে তারা জগতে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে। কিন্তু যারা অন্ধকারে থাকে তারা পাক করে। অন্যের গৃহের সিঁধ কাটতে তাদের বিবেকে বাধে না। অন্যের ক্ষতি করতে তাদের মানবতায় বাধে না। আর তারা নিজেদের দীপ্তি থেকে লুকিয়ে রাখে; কেননা তারা দীপ্তির মহত্ব বুঝে না (ইয়োব ২৪:১৬)। তারা নিজেদের পাপ যতেœ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সব সৃষ্টির ওপর মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তিনি। মানুষই সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য সৃষ্টি ও মানুষের মাঝে পার্থক্য হলো বিবেক, বুদ্ধি, বিবেচনার ক্ষমতা। এসব অন্ধকারে থাকা মানুষই-যারা জ্ঞান, পথনির্দেশ ও উজ্জ্বল ঈশ্বরের বাক্য ছাড়াই ঈশ্বর সম্পর্কে বাগিবতÐা করে। অন্যান্য প্রাণীরও জীবন আছে, খাবার, জৈবিক চাহিদা আছে। তবে মানুষের মতো তাদের বিবেচনাবোধ নেই, ভালো মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই। ঈশ্বর মানুষকে বিশেষভাবে বিবেবচনাবোধ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যার মাধ্যমে মানুষের সমাজে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট হয় এবং মানুষের শান্তিময় জীবন-যাত্রা ব্যাহত হয়। প্রতিফল হিসেবে তাদের কর্মপ্রবণতা মন্দের দিকে ফিরে যায় এবং তার ফলে পৃথিবী নানা বিপর্যয়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সুখ-শান্তি বিলীন হয় এবং তার পরিবর্তে ভয়-ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, ছিনতাই-ডাকাতি, লড়াই ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। অতএব, আমাদের সময় এসেছে দীপ্তিতে আসার। কেননা ঈশ্বরই আমাদের দীপ্তি দিয়েছেন (গীত ১১৮:২৭)। আর ঈশ্বর কারো দীপ্তি কমাতে বা বাড়াতে বা শেষ করতে পারেন। কেননা ঈশ্বর সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী (যিশাইয় ৩০:২৬)। অতএব, আমাদের দীপ্তি পরিধান করা উচিত (গীত ১০৪:২)।

ঈশ্বর পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, যা’ কিছু ঈশ্বর সৃষ্টি কররেন। ঈশ্বর চন্দ্র ও সূর্যের সৃষ্টি করেছেন; আর তাও তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন (যিশাইয় ৩০:২৬)। মানুষ যদি ঈশ্বরের ভালোবাসা অবলোকন করতে চায়, তবে তারা অবশ্যই বাস্তব জীবনে সত্যকে অনুশীলন করবে, কষ্ট সহ্য করতে রাজী থাকবে, আর ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য যা তারা প্রিয় জ্ঞান করে তাকে পরিত্যাগ করতে সম্মত থাকবে, এবং তাদের চোখে জল আসা সত্তে¡ও তারা তখনো ঈশ্বরের হৃদয়কে পরিতুষ্ট করতে সমর্থ হবে। বাস্তব জীবনের মধ্য দিয়ে ও ঈশ্বরের বাক্য উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের মাধুর্য অবলোকন করতে পারে, আর যদি তারা ঈশ্বরের ভালোবাসা আস্বাদন করে থাকে শুধু তাহলেই তারা তাঁকে প্রকৃত ভালোবাসতে পারে। ঈশ্বরের আদেশে মহাবিশ্বের সবকিছু পরিচালিত হয় এবং নিজ নিজ কাজ করতে পারে (আদিপুস্তক ১:১৫)। আর ঈশ্বরই পৃথিবীর সবকিছুতে ক্ষমতা যুক্ত করেছেন এবং তার আদেশে সবকিছু চলছে (আদিপুস্তক ১:১৭)। ঈশ্বর যখন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, মানুষ তখন তাঁর প্রকৃত কাজ ও মাধুর্য অবলোকন করতে পারে, তাঁর সকল ব্যবহারিক ও স্বাভাবিক স্বভাবকে দেখতে পায়, আর এই সবকিছুই স্বর্গের ঈশ্বর সম্বন্ধে তাদের জ্ঞানের অপেক্ষা হাজার গুণ বেশি বাস্তব। স্বর্গের ঈশ্বরকে মানুষ যতই ভালোবাসুক না কেন, এই ভালবাসায় বাস্তব কিছু নেই, আর এই ভালোবাসা মানবীয় ধারণায় পরিপূর্ণ। পার্থিব ঈশ্বরের প্রতি তাদের ভালোবাসা যত কমই হোক না কেন, এই প্রেম বাস্তব; এমনকি এই প্রেম যদি যৎসামান্যও হয়, তবুও তা বাস্তব। ঈশ্বর তাঁর প্রকৃত কার্যের মাধ্যমে মানুষকে তাঁর সম্বন্ধে অবহিত করেন, আর এই অবগতির মাধ্যমেই তিনি তাদের ভালোবাসা লাভ করেন। ব্যাপারটা পিতরের মতো: যদি তিনি যীশুর সঙ্গে বসবাস না করতেন, তাহলে যীশুকে অর্চনা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হতো। তাই যীশুর প্রতি তাঁর আনুগত্যও যীশুর সাথে তাঁর সংসর্গের উপর নির্মিত। মানুষ যাতে তাঁকে ভালোবাসতে পারে তাই ঈশ্বর মানুষদের মধ্যে এসেছেন, তাদের সঙ্গে বাস করেছেন, আর যা-কিছু তিনি মানুষকে দেখান ও অনুভব করান তা-ই হল ঈশ্বরের বাস্তবতা।

ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সবকিছুতে তাঁর ক্ষমতা যুক্ত করেছেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বরই মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ইচ্ছাতেই সবকিছু চলে। ঈশ্বরকে কেবল একজন সৃষ্টিকর্তা হিসাবে দেখা হয় না, বরং যিনি সবকিছু পরিচালনা করেন এবং যা কিছু ঘটে তার পেছনে তাঁর হাত রয়েছে। ঈশ্বরকে এমন এক সত্তা হিসাবে দেখা হয় যার ক্ষমতা সীমাহীন এবং যাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না। তাঁর সৃষ্টি ঈশ্বরের পরিকল্পনায় স্থাপন করা হয়েছে (আদিপুস্তক ১:১৮)। আর আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বরের সবকিছুতে ঈশ্বরের দীপ্তি বিকাশ হয় (ইয়োব ৪১:১৮)। আমরা চিন্তা করতে পারি যে, ঈশ্বর কীভাবে ই¯্রায়েল জাতিকে পরিচালা করেছিলেন। সবই ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও আদেশে হয়েছে। ছায়া দেবার জন্যে মেঘস্তম্ভ এবং রাতে দীপ্তির জন্যে ব্যবস্থা করেছিলেন (যাত্রাপুস্তক ১৩:২১; নহিমিয় ৯:১২,১৯)। ঈশ্বর মানুষের কল্যানার্থে নিদারুণ মূল্য চুকিয়েছেন, তিনি ধৈর্য্য-সহকারে ও সদয়চিত্তে অনেক বাক্য বলেছেন আর সবসময় তিনি মানুষকে উদ্ধার করেন। এর চেয়েও মহৎ উপভোগÑসত্যিকারের উপভোগÑতখনই হয় যখন মানুষ তাদের বাস্তব জীবনে সত্যকে অনুশীলন করে, যার পরে তারা তাদের হৃদয়ে প্রশান্ত ও নির্মল হয়ে ওঠে। ভিতরে ভিতরে তারা প্রবলভাবে আলোড়িত বোধ করে, এবং অনুভব করে যে ঈশ্বর সবচেয়ে প্রীতিপ্রদ। পিতর ঈশ্বরকে জানতে পেরেছিলেন: পিতর বলেছিলেন, ঈশ্বরের শুধু যে আকাশ ও পৃথিবী এবং সমস্ত কিছু সৃজনের প্রজ্ঞা আছে তা-ই নয়, এছাড়াও তাঁর মানুষদের মধ্যে বাস্তব কার্য করার প্রজ্ঞাও আছে। পিতর বলেছিলেন, শুধু যে আকাশ ও পৃথিবী এবং সমস্ত কিছু সৃজনের জন্যই তিনি মানুষের ভালোবাসার যোগ্য তা নয়, উপরন্তু, মানুষকে সৃষ্টি করা, রক্ষা করা, তাদের নিখুঁত করে তোলা এবং তাদের প্রতি প্রেম বিতরণের জন্যেও তিনি মানুষের প্রেমার্হ। পিতর এ-ও বলেছিলেন যে, তাঁর মধ্যে অনেক কিছু আছে যা মানুষের ভালোবাসার যোগ্য। পিতর যীশুকে বলেছিলেন: “আকাশ ও পৃথিবী এবং সমস্ত কিছুর সৃজনই কি একমাত্র কারণ যার জন্য আপনি মানুষের প্রেমের উপযুক্ত? আপনার মধ্যে আরো অনেক কিছু আছে যা প্রীতিপ্রদ। আপনি বাস্তব জীবনে কাজ ও চলাফেরা করেন, আপনার আত্মা আমার অন্তঃকরণকে স্পর্শ করে, আপনি আমাকে অনুশাসন করেন, আপনি আমাকে ভর্ৎসনা করেনÑএই বিষয়গুলি মানুষের ভালোবাসার অধিকতর যোগ্য”। যারা যথার্থই ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্য দেয় তারা তাঁর আলোড়ন-সৃষ্টিকারী সাক্ষ্য দিতে পারে কারণ তা তাদের সাক্ষ্য যথার্থ জ্ঞান ও যথার্থ ঈশ্বর-আকাক্সক্ষার ভিত্তিভ‚মির উপর প্রতিষ্ঠিত। কোনো আবেগের বশে এধরণের সাক্ষ্য নিবেদন করা হয় না, নিবেদন করা হয় ঈশ্বর ও তাঁর স্বভাব সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান অনুসারে। যেহেতু তারা ঈশ্বরকে জানতে পেরেছে, তারা অনুভব করে যে তারা অবশ্যই নিশ্চিতভাবে ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্য দেবে আর যারা ঈশ্বরকে আকাক্সক্ষা করে তাদের সকলকে ঈশ্বর সম্বন্ধে অবগত করবে, এবং ঈশ্বরের মাধুর্য ও তাঁর বাস্তবতা বিষয়ে অবগত হবে। ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালোবাসার মতই তাদের সাক্ষ্যও স্বতঃস্ফূর্ত; এই সাক্ষ্য বাস্তব আর এর বাস্তব তাৎপর্য ও মূল্য আছে। এটা নিষ্ক্রিয় বা অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন নয়। ঈশ্বর মানুষের ভালোবাসার নিমিত্ত, এবং তিনি সকল মানুষের ভালোবাসার যোগ্য, কিন্তু সকল মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসতে সক্ষম নয়, আর সকল মানুষ ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্য দিতে ও তাঁর সাথে শক্তি ধারণ করতে পারে না। যেহেতু তারা ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্য-দানে ও ঈশ্বরের কার্যে তাদের সকল প্রয়াস উৎসর্গ করতে সক্ষম, তাই প্রকৃত ঈশ্বর-প্রেমী মানুষেরা আকাশের নীচে যে-কোনো স্থানে চলা-ফেরা করতে পারে, কিন্তু কেউ তাদের বিরোধিতা করার সাহস করে না, এবং তারা পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে ও ঈশ্বরের সকল সন্তানকে শাসন করতে পারে। সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে এই মানুষগুলি একত্রিত হয়েছে। আর সদাপ্রভুই প্রত্যেকের হৃদয়ে দীপ্তি ও সিদ্ধতা প্রদান করেন এবং তারা সদাপ্রভুর সম্মুখে প্রবেশ করতে পারে (যাত্রাপুস্তক ২৮:৩০)। সত্যিকারে যারা সদাপ্রভুতে থাকে তারা (ইষ্টের ৮:১৬) দীপ্তি, আনন্দ, আমোদ ও সম্মানপ্রাপ্ত হয়।

অপরদিকে ঈশ্বর দুষ্টদের দীপ্তি নিভিয়ে দেন। তাদের পরিকল্পনা ও ইচ্ছা শেষ করে দেন, তারা একসময় শেষ হয়ে যায় (ইয়োব ১৮:৫)। কিন্তু ঈশ্বর উপযুক্ত ব্যক্তিকে দীপ্তি দিয়ে থাকেন; তিনি তিক্তপ্রাণকে জীবন দিয়ে থাকেন (ইয়োব ৩:২০)। আর এ দীপ্তি হৃদয়ে রাখতে হয় এবং বিশ্বাসে স্থির থেকে ধারণ করতে হয়। অন্যথায় দীপ্তি বিভক্ত হয়ে যায় (ইয়োব ৩৮:২৪)। কেননা দুষ্টরা দীপ্তি দেখতে পাবে না (ইয়োব ৩৭:২১)। ওরা ঈশ্বরকে ভালোবাসতে অক্ষম, কেবল যন্ত্রমানবের মতো ঈশ্বরকে অনুসরণ করতে পারে, আন্তরিকভাবে তাঁকে আকাক্সক্ষা করতে বা তাঁর অর্চনা করতে অক্ষম। ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভের জন্য ঈশ্বরকে আন্তরিকভাবে মান্যও করে না। সমস্ত মানুষের ঈশ্বর-বিশ্বাসের জীবন অর্থহীন, এর কোনো মূল্য নেই, আর এর মধ্যেই নিহিত আছে ওদের ব্যক্তিগত বিবেচনা ও অভিলাষ; এরা ঈশ্বরকে ভালোবাসার জন্যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, করে আশির্বাদধন্য হওয়ার জন্য। অনেক লোক নিজেদের খুশি মতো কাজ করে; তারা যা মন চায় তা-ই করে, কখনো ঈশ্বরের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না, বা তারা যা করে তা ঈশ্বরের ইচ্ছার অনুবর্তী কিনা তাও ভেবে দেখে না। এই মানুষগুলো, ঈশ্বর-প্রীতি তো দূরের কথা, এমনকি প্রকৃত বিশ্বাসও অর্জন করতে পারে না। তাদের দুষ্টতার কারণেই দীপ্তি অন্ধকারের সমান হবে (ইয়োব ১০:২২)। আর যারা মনেপ্রাণে ঈশ্বরের পক্ষে থাকে তারা আলোকিত জীবন পাবে এবং দীপ্তিতে থেকে আলো প্রদান করবে (ইয়োব ২২:২৮)। মানুষের ঈশ্বর-প্রেম উপভোগ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়: দুঃখকষ্ট ভোগের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ও সত্যানুশীলনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে। তাঁর পরিমার্জন ক্রিয়ার উদ্দেশ্য হল মানুষকে পরিশুদ্ধ করা, আর ঈশ্বর মানুষকে পরখ করেন এটা যাচাই করা যে তারা তাঁকে যথার্থই ভালোবাসে কিনা। ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করেন যাদের অলোকদৃষ্টি আছে, সত্যনিষ্ঠা আছে, প্রজ্ঞা আছে, আর যারা যথার্থই তাঁকে ভালোবাসে। ঈশ্বরপ্রেমী হল তারা যারা সত্যকে ভালোবাসে, এবং যারা সত্যকে ভালোবাসে তারা সত্যের যত অনুশীলন করে, ততই তাতে তাদের অধিকার হয়; তারা যত তার চর্চা করে, তত তারা ঈশ্বরের ভালোবাসা পায়; আর যত তারা সত্যের অভ্যাস করে, তত তারা ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য হয়। যারা প্রকৃতই ঈশ্বরকে ভালোবাসে শুধু তাদেরই জীবনের যে সর্বাপেক্ষা বেশি মূল্য ও অর্থ আছে, কেবল তারাই যে ঈশ্বরে প্রকৃত বিশ্বাস পোষণ করে, কারণএই মানুষগুলি ঈশ্বরের আলোকে বসবাস করতে এবং ঈশ্বরের কার্য ও ব্যবস্থাপনার খাতিরে জীবনধারণে সক্ষম। এর কারণ হলো এরা অন্ধকারে নয়, আলোকে বাস করে; এরা নিরর্থক জীবন যাপন করে না, ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য জীবন যাপন করে। যারা ঈশ্বরকে ভালোবাসে কেবল তারাই ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্যদানে সক্ষম, কেবল তারাই ঈশ্বরের সাক্ষী, কেবল তারাই ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য, আর কেবল তারাই ঈশ্বরের প্রতিশ্রæতি গ্রহণে সমর্থ। যারা ঈশ্বরকে ভালোবাসে তারা ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ; তারা ঈশ্বরের প্রিয়জন, আর তারা ঈশ্বরের সাথে একত্রে আশীর্বাদ উপভোগ করতে পারে। শুধু এই ধরণের মানুষগুলিই অনন্তজীবি হবে, আর কেবল এরাই চিরকাল ঈশ্বরের তত্ত¡াবধান ও আশ্রয়ে জীবনযাপন করবে। ঈশ্বরকে যারা ভালোবাসে তারা সারা পৃথিবী জুড়ে অবাধে চলা-ফেরা করতে পারে, আর যারা ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্যদান করে তারা সারা বিশ্বসংসার ব্যাপী ভ্রমণ করতে পারে। এই মানুষগুলি ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র, এরা ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য, এবং এরা চিরদিন তাঁর আলোকে জীবনযাপন করবে।

ঈশ্বরের আশীবাদ সকলেরই উপরে থকে (ইয়োব ২৫:৩)। কেননা তিনি সবক্ষেত্রে বিরাজমান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখেন (ইয়োব ৩৭:১৫)। যদি মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এবং ঈশ্বরের বাক্যকে ঈশ্বরের প্রতি সম্মানপূর্ণ হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তাহলে এই মানুষগুলির মধ্যে ঈশ্বরের পরিত্রাণ ও ঈশ্বর-প্রেম দৃষ্ট হবে। এই মানুষগুলি ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্যদানে সক্ষম; এরা সত্যকে যাপন করে, আর এরা যে সাক্ষ্য দেয় তা-ও সত্য, ঈশ্বর ও ঈশ্বরের স্বভাবে যে সত্যতা আছে এ হল সেই সত্য। এরা ঈশ্বর-প্রেমের মধ্যে বাস করে এবং ঈশ্বর-প্রেম প্রত্যক্ষ করেছে। যদি মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসতে চায়, তবে তারা অবশ্যই ঈশ্বরের মাধুর্য আস্বাদন করবে ও ঈশ্বরের মাধুর্য প্রত্যক্ষ করবে; কেবল তখনই তাদের মধ্যে এমন এক হৃদয় জাগ্রত হবে যা ঈশ্বরকে ভালোবাসে, এমন এক হৃদয় যা মানুষদের উদ্বুদ্ধ করবে নিজেদেরকে অনুগতভাবে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করতে। ঈশ্বর মানুষকে বাক্য ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে বা তাদের কল্পনার মাধ্যমে তাঁকে ভালোবাসতে বাধ্য করান না, তিনি মানুষকে জোর করেন না তাঁকে ভালোবাসতে। পরিবর্তে, তিনি তাদের নিজেদের ইচ্ছানুসারে তাঁকে ভালোবাসতে দেন, আর তিনি তাঁর কার্য ও কথনের মধ্য দিয়ে তাঁর মাধুর্য অবলোকন করতে দেন, তার পর তাদের মধ্যে ঈশ্বর-প্রেম বাহিত হয়। কেবল এই ভাবেই মানুষ প্রকৃতই ঈশ্বরের সাক্ষ্য বহন করতে পারে। অন্যেরা ভালোবাসতে তাড়না করেছে বলেই মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসে না, তাৎক্ষণিক আবেগের ঝোঁকে যে ভালোবেসে ফেলেÑতাও নয়। তারা ঈশ্বরকে ভালোবাসে কারণ তারা তাঁর মাধুর্য প্রত্যক্ষ করেছে, তারা দেখেছে যে তাঁর প্রচুর কিছু আছে যা মানুষের ভালোবাসার যোগ্য, কারণ তারা ঈশ্বরের পরিত্রাণ, জ্ঞান ও বিস্ময়কর কার্যসমূহ প্রত্যক্ষ করেছেÑএবং ফলস্বরূপ, তারা প্রকৃতই ঈশ্বরের স্তুতি করে, প্রকৃতই তাঁকে আকাক্সক্ষা করে, আর তাদের মধ্যে এমন এক প্রবল আবেগ জাগ্রত হয় যে ঈশ্বরকে লাভ না করে তারা জীবনধারণও করতে পারে না। কিন্তু যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তারা অন্ধকারে জীবনযাপন করে এবং তারা ঈশ্বরের দীপ্তির অপেক্ষায় থাকলেও দীপ্তি পেতে পারে না (ইয়োব ৩:৯)। আর ঈশ্বরের দীপ্তি যারা গ্রহণ করে তারা ভাগ্যবান; কেননা ঈশ্বর সবকিছু পরিচালনা দিয়ে থাকেন (ইয়োব ৩৬:৩০)। কিন্তু যারা অন্ধকারের যাত্রী ও পাপের মধ্যে জীবনযাপন করে তারা ঈশ্বরের দীপ্তির অন্বেষণ পায় না (ইয়োব ২৯:২৪, ইয়োব ৩:৪)। কিন্তু ধামিকমাত্রই ঈশ্বরের দীপ্তিতে বসবাস করবে। আমেন।

শুক্রবার, ০১ আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy