

মিজানুর রহমান রানা :
চাঁদপুরের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি এক গভীর ঐতিহ্যের ধারক, যা নদী, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নিচে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:
চাঁদপুরের লোকসাহিত্য: ধারা ও বৈশিষ্ট্য
এক. পুঁথিপাঠ ও কবিগান
– পুঁথিপাঠ: গ্রামীণ জনজীবনে পুঁথিপাঠ ছিল এক সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন ও শিক্ষার মাধ্যম। এখনো চরাঞ্চলে এর আসর বসে।
– কবিগান: ১৮শ শতকে চাঁদপুরে কবিগানের প্রচলন ঘটে। উল্লেখযোগ্য কবিয়ালরা হলেন হরকুমার শীল, প্যারী মোহন আচার্য, জগবন্ধু দত্ত প্রমুখ।

প্যারী মোহন আচার্যর কবিগানের ধারা
চাঁদপুর অঞ্চলে ১৯শ’ ও ২০শ’ শতকে কবিগান ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি ছিল একধরনের তর্কমূলক সংগীত, যেখানে দুই পক্ষ গানের মাধ্যমে যুক্তি-তর্ক করতেন।
প্যারী মোহন আচার্য ছিলেন এমন একজন কবিয়াল, যিনি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক বিষয় নিয়ে কবিগান পরিবেশন করতেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
বিষয়বস্তু
তার কবিগানে উঠে আসত:
– মানবিকতা ও নৈতিকতা
– ধর্মীয় সহনশীলতা
– সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিবাদ
– তিনি লোকজ ছন্দ ও উপমা ব্যবহার করে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন।
গানের ধরন
তার গানে ব্যবহৃত হতো:
– দোতারা, ঢোল, করতাল
– আঞ্চলিক ভাষা ও ছড়া
– প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক ছন্দ (যেমন: “তুমি বলো ধর্ম কী, আমি বলি কর্ম কী”)
দুই. নদীকেন্দ্রিক লোকগান
– নদী ও মাছজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত গান যেমন:
– “আমার কাংখের কলসি গিয়াছে ভাসি/মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারে।”
– “আমি বইসা রইলাম নদীর কূলে/আমায় কেবা পার করে।”
তিন. লোকসংগীতের ধারা
– বন্দনাগীত, জারিগান, মারফতি, বেহুলার গীত, গজল, বিয়ের গান ইত্যাদি প্রচলিত।
– লোকগবেষক প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেনের মতে, এসব গান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনোপাখ্যানের প্রতিফলন।
চার. লোককাহিনি ও মিথ
মাছ ও পিশাচ
– ডালাশিকারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গল্প, যেখানে মাছ শিকারের সময় পিশাচের উপস্থিতি অনুভব করা হয়।
পাঁচ. জমিদার ‘লৌহ ও গহড়’
– ফরিদগঞ্জের জমিদারদের নিয়ে প্রচলিত কাহিনি, যারা প্রজাদের ওপর অত্যাচার করতেন এবং মায়ের অভিশাপে পতনের শিকার হন।
ছয়. মনসা মুড়ার বাঁশ
– বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনির অংশ হিসেবে কচুয়ার ভুইয়ারা গ্রামে মনসা মুড়া নামে একটি বাঁশঝাড়কে ঘিরে নানা অলৌকিক বিশ্বাস প্রচলিত।
সাত. লোকশিল্প ও সংস্কৃতি
নকশিকাঁথা
– বর্ষাকালে নারীরা পুরনো কাপড় দিয়ে নকশিকাঁথা তৈরি করেন। এটি এখন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হস্তশিল্পে পরিণত হয়েছে।
আট. শীতলপাটি ও বাঁশ-বেত শিল্প
– মোস্তাগ গাছ থেকে তৈরি শীতলপাটি ও বাঁশ-বেতের সামগ্রী চাঁদপুরের লোকজ জীবনের অংশ।
নয়. লোকবিশ্বাস ও সংস্কার
– ভূত-প্রেত থেকে রক্ষা পেতে শিশুকে সোনা-রুপার পানিতে গোসল করানো হয়।
– চরের ধান কাটার সময় নিরবতা পালন, তাবিজ-কবচ, “ইল বিল, কুত্তার দাঁত খিল” মন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি লোকবিশ্বাস প্রচলিত।
চাঁদপুরের সংগীতাঙ্গনে বেশ কিছু প্রতিভাবান শিল্পী রয়েছেন, যারা লোকসংগীত, ধ্রুপদি, গণসংগীত ও আধুনিক ধারায় কাজ করে চলেছেন। নিচে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সংগীতশিল্পীর নাম ও তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো:
চাঁদপুরের বর্তমান লোক সংগীতশিল্পীদের কিছু অংশ :
চাঁদপুরের বর্তমান লোকসংগীতশিল্পীদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিভাবান ও সক্রিয় শিল্পীর নাম নিচে তুলে ধরা হলো, যাঁরা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে লোকসংগীত চর্চা ও পরিবেশনায় অবদান রাখছেন।
নন্দিতা দাস :
লোকসংগীতশিল্পী। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে তালিকাভুক্ত। ‘নিশীতা সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠাতা। হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তী শিল্পকলা একাডেমিতে গান শেখান।
মনোজ আচার্যী :
প্রখ্যাত গণসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত। ৯০-এর গণআন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে গান লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।
স্বপন সেনগুপ্ত :
যন্ত্র ও ধ্রুপদি সংগীতে পারদর্শী। চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা প্রাপ্ত।
কৃষ্ণা সাহা :
কণ্ঠসংগীতে বিশেষ অবদান রাখায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে সম্মাননা পেয়েছেন।
তনুশ্রী পাল :
উদীয়মান লোকসংগীতশিল্পী। চাঁদপুর সংগীত নিকেতনের শিক্ষার্থী। ‘সেরা কণ্ঠ শিল্পী’ প্রতিযোগিতায় লোকগানের মাধ্যমে সেরা দশে স্থান পেয়েছেন।
সিরাজুম মুনির পান্থ :
চাঁদপুর সুরধ্বনী একাডেমির শিক্ষার্থী। লোকগান ও পল্লীগীতিতে পারদর্শী।
দিপা রায় চৈতী:
চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী। লোকগানে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশগ্রহণ করছেন।
এ ছাড়ারও চাঁদপুরে বর্তমানে আরও অনেক সংগীত শিল্পী রয়েছেন যা পরবর্তী কোনো লেখা প্রকাশ করা হবে।
চাঁদপুরের লোকগানের থিম বিশ্লেষণ
চাঁদপুরের লোকগান মূলত নদী, প্রেম, শ্রমজীবন, আধ্যাত্মিকতা ও প্রতিবাদের সুরে গাঁথা। এর প্রধান থিমগুলো হলো:
নদী ও জীবিকা :
– মেঘনা, পদ্মা ও ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা গান।
– মাঝি, জেলে ও চরবাসীর জীবনসংগ্রাম ফুটে ওঠে।
– উদাহরণ: “আমার কাংখের কলসি গিয়াছে ভাসি / মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারে।”
প্রেম ও বিরহ
– গ্রামীণ প্রেম, বিয়ের গান, প্রণয় ও বিচ্ছেদের বেদনা।
– নারীস্বরে গাওয়া গানগুলোতে থাকে অপেক্ষা, আকুতি ও আত্মসমর্পণ।
প্রতিবাদ ও সামাজিক ব্যঙ্গ :
– জমিদারী শোষণ, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গান।
– কবিগান ও পালাগানে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রতিবাদ।
আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদ
– মাইজভাণ্ডারী প্রভাব, গাউছুল আজমের বন্দনা, আত্মশুদ্ধির আহ্বান।
– মারফতি ও বাউল ধারার প্রভাব লক্ষণীয়।
সূত্র : রাইজিং বিডি, প্রথম আলো, চাঁদপুর কণ্ঠ, জাগে নিউজ, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, চাঁদপুর টাইমস, প্রিয় সময়।
বৃহস্পতি বার, ০৩ জুলাই ২০২৫
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন











