৫ আগস্ট-পরবর্তী উচ্ছৃঙ্খলতা—রাষ্ট্র কতদিন নীরব দর্শক?

৫ আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেখানে আইনের শাসন হবে সর্বজনীন—এটাই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু গত ১০ মাসের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ‘মব’ অর্থাৎ উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রায় নিয়মিত দৃশ্য। প্রশ্ন জাগে: এই উচ্ছৃঙ্খলতার জন্ম যে ৫ আগস্টের পর, তা থামবে কতদিন পর?

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অন্তত ১৭৯ জন মানুষ মব হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। মাসে গড়ে ১৭.৯ জন—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো বছরেই মাসিক গড় ১২ ছাড়ায়নি। সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, সমস্যাটি এখন আর ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ নয়, বরং ‘বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট’।

কী ঘটছে মাঠে?
১. ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা: ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৪০টি মাজারে হামলা হয়েছে।
২. ব্যক্তিগত আক্রোশকে ‘বিচার’ বানানো: গুলশানে সাবেক উপদেষ্টার ছেলের ফ্ল্যাট ভাঙচুর, হাক্কানী পাবলিশার্সের মালিকের বাসায় ঢোকার চেষ্টা—সবই হয়েছে ‘অভিযোগ আছে’ এই অজুহাতে, পুলিশের উপস্থিতিতেই।
৩. নারীর প্রতি সহিংসতা ও নৈতিক পুলিশিং: মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে দুই নারীকে প্রকাশ্যে বেল্ট দিয়ে পেটানো, রংপুর-দিনাজপুরে ‘ধর্মীয় মূল্যবোধের দোহাই’ দিয়ে নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া—এগুলো প্রমাণ করে, মব এখন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
৪. বিচারহীনতার সংস্কৃতি: নিহাল আহমেদ জিহাদ তিন সপ্তাহ পর জামিনে মুক্তি পেয়ে জেলগেটে ‘মালা’ পাচ্ছেন, আর ‘মুচলেকা’ দিয়ে ছাড়া পাচ্ছেন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। বার্তাটা স্পষ্ট—মব হলে পার পাওয়া যায়।

কেন থামছে না?
‘মব জাস্টিস’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার’ শব্দটিই এখন আলোচনায়। এর পেছনে তিনটি কারণ প্রধান:
– ক্ষমতার শূন্যতা ও জবাবদিহির অভাব: ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের সময়টাতে অনেকেই ধরে নিয়েছে ‘এখন যা খুশি করা যায়’।
– দায়মুক্তি: গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিন, মুচলেকায় মুক্তি—অপরাধীর মনে ভয় তৈরি হচ্ছে না।
– রাজনৈতিক ছত্রছায়া: অনেক ঘটনায় ছাত্র-রাজনৈতিক সংগঠনের সাবেক/বর্তমান নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। ফলে মবকে ‘আন্দোলনের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

থামাতে হলে কী করতে হবে?
১. জিরো টলারেন্স নীতি: মব হামলার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। ‘মুচলেকা’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
২. পুলিশের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা: পুলিশের সামনেই দরজা ভাঙা হয়েছে—এমন দৃশ্য আইনের শাসনের জন্য লজ্জাজনক। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর দায়: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শক্তিকে ‘মব’-এ পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। সব পক্ষকে প্রকাশ্যে মব সহিংসতার নিন্দা ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. নাগরিক সচেতনতা: ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া’ যে বিচার নয়, বরং অপরাধ—এই বার্তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মসজিদ-মন্দির পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।

৫ আগস্ট আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু রুখে দাঁড়ানো আর উচ্ছৃঙ্খল হওয়া এক নয়। আজকের মব কালকের ফ্যাসিবাদকে ডেকে আনে। রাষ্ট্র যদি এখনই শক্ত হাতে লাগাম না টানে, তবে ৫ আগস্টের অর্জন ‘মবতন্ত্রে’র অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

উচ্ছৃঙ্খলতা থামবে সেদিনই, যেদিন রাষ্ট্র প্রমাণ করবে—বাংলাদেশে বিচার হয় আদালতে, রাজপথে নয়। আর সেই দিনটি আসতে দেরি হলে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়।

প্রকাশিত : শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy