কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টিকে থাকার মহামন্ত্র

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। কেউ বলছেন এই প্রযুক্তি লাখ লাখ মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, আবার কেউ বলছেন এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে। সত্যিটা আসলে মাঝখানে। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে, আবার একই সঙ্গে এমন সব নতুন পেশা তৈরি হবে যার নামও আমরা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে শুনিনি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত অনুভব করা যাচ্ছে। ব্যাংক, বৈদ্যুতিন বাণিজ্য, সংবাদমাধ্যম, নতুন উদ্যোগ, তৈরি পোশাকের বিপণন, এমনকি গ্রামের কৃষি তথ্য সেবাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তাই শুধু চাকরির জন্য নয়, নিজের অস্তিত্বকে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্যই এখন থেকে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সহজ ভাষায় বললে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা যা বিপুল তথ্য থেকে শিখে মানুষের মতো লেখা, ছবি আঁকা, কথা বলা, ভাষা অনুবাদ করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা বা কম্পিউটার কর্মসূচি লেখার মতো কাজ করতে পারে। এটি কোনো জাদু নয়। এটি মানুষের তৈরি তথ্য, মানুষের লেখা নির্দেশনা এবং মানুষের দেওয়া প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে কাজ করে।

এই প্রযুক্তিকে একটি অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু অনভিজ্ঞ সহকারীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। আপনি যদি তাকে সঠিকভাবে নির্দেশ দিতে পারেন, সে ঘণ্টার কাজ মিনিটে করে দেবে। কিন্তু নির্দেশ যদি ভুল হয়, তথ্য যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে তার ফলাফলও ভুল হবে। তাই এই যুগে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং যে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে জানে, সে অন্য মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে। চূড়ান্ত বিচার, নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্ব গ্রহণের জায়গায় মানুষের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কোন কাজগুলো সবচেয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে
গবেষণা বলছে, যে কাজগুলোতে একই ধরনের নিয়ম বারবার অনুসরণ করতে হয়, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

প্রথমত, তথ্য প্রবেশ এবং নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি। প্রতিদিন একই ছকে বিক্রয়ের হিসাব সাজানো বা হাজিরা থেকে প্রতিবেদন বানানোর মতো কাজ এখন একটি নির্দেশনাতেই হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক গ্রাহক সেবা। সাধারণ প্রশ্ন যেমন পণ্য কোথায় আছে, টাকা ফেরতের নিয়ম কী, এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর এখন স্বয়ংক্রিয় কথোপকথন ব্যবস্থা দিয়েই দেওয়া হচ্ছে।

তৃতীয়ত, সাধারণ অনুবাদ এবং প্রাথমিক বিষয়বস্তু লেখা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য দশটি সাধারণ শিরোনাম লেখা বা একটি সভার কার্যবিবরণী থেকে সারসংক্ষেপ তৈরি করার মতো কাজ এখন কয়েক সেকেন্ডের কাজ।

চতুর্থত, প্রাথমিক নকশা। একটি পোস্টারের জন্য প্রাথমিক খসড়া বা একটি পণ্যের জন্য সাদামাটা পটভূমি সরানোর কাজ এখন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে করতে হয় না।

তবে এর মানে এই নয় যে এই পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বরং কাজের সংজ্ঞা বদলে যাবে। আগে একজন গ্রাহক সেবা কর্মী দিনে একশোটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতেন, এখন তাকে দশটি জটিল এবং আবেগঘন অভিযোগ সামলাতে হবে যেখানে সহানুভূতি এবং বুদ্ধিমত্তা লাগে। আগে একজন বিপণন কর্মী দিনে দুটি নকশা করতেন, এখন তাকে একই সময়ে বিশটি ধারণা পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনটি মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, কাজ কমবে না, কাজের গভীরতা বাড়বে।

যে দক্ষতাগুলোতে এখনো মানুষের কোনো বিকল্প নেই
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, কয়েকটি জায়গায় মানুষ এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

এক, নেতৃত্ব এবং দল পরিচালনা। একটি দলকে অনুপ্রাণিত করা, তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা এবং কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়।

দুই, জটিল সমস্যা সমাধান এবং কৌশল নির্ধারণ। যখন তথ্য অসম্পূর্ণ, যখন বাজারে অনিশ্চয়তা থাকে, তখন অভিজ্ঞতা এবং দূরদর্শিতা থেকে যে কৌশল আসে, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিতে পারে না।

তিন, মৌলিক এবং অনুসন্ধানী কাজ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, আদালতে একজন মানুষের পরিস্থিতি বুঝে মানবিক রায় দেওয়া, একজন রোগীর শুধু উপসর্গ নয়, তার ভয় এবং পারিবারিক প্রেক্ষাপট বুঝে চিকিৎসা দেওয়া, এই কাজগুলোতে মানবিক বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য।

চার, গভীর সৃজনশীলতা এবং আবেগজড়িত যোগাযোগ। একটি গল্প যা মানুষকে কাঁদাবে, একটি ব্র্যান্ডের এমন একটি বার্তা যা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করবে, একটি শিক্ষকের সেই বোঝানোর ক্ষমতা যা একজন পিছিয়ে পড়া ছাত্রকে আবার আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, এগুলো মানুষের হৃদয় থেকেই আসে।

আগামী দশ বছরে এগিয়ে থাকতে যে সমন্বিত দক্ষতা অর্জন করতেই হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে একটিমাত্র দক্ষতা দিয়ে টিকে থাকা যাবে না। আপনাকে হতে হবে টি আকৃতির মানুষ, অর্থাৎ একটি বিষয়ে গভীর জ্ঞান এবং তার সঙ্গে আরও অনেক বিষয়ে মোটামুটি কাজ চালানোর ক্ষমতা। এই সমন্বয়কে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।

১. প্রযুক্তি ও তথ্য সংক্রান্ত দক্ষতা, যা আপনার ভিত্তি তৈরি করবে
এটি সবচেয়ে জরুরি অংশ। আপনাকে প্রকৌশলী হতে হবে না, কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তির পরিচালক হতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ব্যবহারে দক্ষতা: শুধু প্রশ্ন করা নয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় তা জানা। জনপ্রিয় কথোপকথনমূলক সরঞ্জাম, লেখালেখি ও গবেষণার সহকারী, ছবি ও ভিডিও তৈরির সরঞ্জামগুলো প্রতিদিন ব্যবহার করুন।

নির্দেশনা প্রকৌশল: এটিই নতুন যুগের সবচেয়ে বড় দক্ষতা। যন্ত্রকে কীভাবে স্পষ্ট, ধাপে ধাপে এবং প্রেক্ষাপটসহ নির্দেশ দিতে হয়, যাতে সে আপনার মনের মতো ফলাফল দেয়, তা শেখা। ভালো নির্দেশনা দিতে পারলে ফলাফলের মান দশগুণ বেড়ে যায়।

কর্মসূচি লেখার প্রাথমিক ধারণা: পাইথন নামক ভাষাটি এখন এই যুগের ইংরেজির মতো। তথ্য পরিষ্কার করা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাইল গোছানো বা ছোটখাটো বিশ্লেষণের জন্য এর প্রাথমিক জ্ঞান আপনাকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখবে।

তথ্য ব্যবস্থাপনা: এসকিউএল দিয়ে তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য বের করা, উন্নত এক্সেল দিয়ে তথ্য সাজানো এবং পাওয়ার বিআই বা ট্যাবলোর মতো সরঞ্জাম দিয়ে সেই তথ্যকে সুন্দর চিত্র ও ড্যাশবোর্ডে উপস্থাপন করা। একজন ব্যবস্থাপক যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন তিনি আর অনুমানের ওপর নির্ভর করবেন না, তিনি তথ্যভিত্তিক চিত্র দেখতে চাইবেন।

স্বয়ংক্রিয়করণ ও সংযোগ: গিট ও গিটহাবের মাধ্যমে নিজের কাজের সংস্করণ সংরক্ষণ করা, ক্লাউড পরিষেবা যেমন আমাজন ওয়েব সার্ভিস, আজুর, গুগল ক্লাউড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা এবং এপিআই সংযোগ ও কোডবিহীন সরঞ্জাম দিয়ে বিভিন্ন অ্যাপকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে কাজ স্বয়ংক্রিয় করা। যেমন, আপনার দোকানে নতুন অর্ডার এলেই যেন ক্রেতা বার্তা পান এবং আপনার হিসাব খাতায় তা যোগ হয়ে যায়।

২. সৃজনশীল ও ডিজিটাল পেশার দক্ষতা, যা আপনাকে আয় করার সুযোগ দেবে
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল ব্যবসার জন্য এই দক্ষতাগুলোর চাহিদা আকাশছোঁয়া।

ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতা নকশা: ফিগমা সরঞ্জাম দিয়ে ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ কীভাবে ব্যবহারকারীর জন্য সহজ ও সুন্দর করা যায়, তা শেখা।

দৃশ্যমান নকশা ও সম্পাদনা: ফটোশপ, ক্যানভা দিয়ে আকর্ষণীয় পোস্টার, প্রিমিয়ার প্রো, ডাভিঞ্চি রিজলভ, ক্যাপকাট দিয়ে ছোট ভিডিও সম্পাদনা। এখন প্রতিটি ব্যবসারই ভিডিও প্রয়োজন।

ডিজিটাল বিপণন: কীভাবে সার্চ ইঞ্জিনে নিজের ওয়েবসাইটকে ওপরে আনা যায়, কীভাবে বিষয়বস্তুর কৌশল তৈরি করতে হয় এবং কীভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে সঠিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনাকে লেখা তৈরিতে সাহায্য করবে, কিন্তু কৌশল আপনাকেই ঠিক করতে হবে।

৩. নিরাপত্তা ও নৈতিকতার জ্ঞান, যা আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য করবে
যখন সবকিছুই ডিজিটালে হচ্ছে, তখন নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক ধারণা, যেমন শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, তথ্য ফাঁস রোধ, প্রতারণা শনাক্তকরণ, এই জ্ঞান প্রতিটি কর্মীর জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিশাস্ত্র জানা জরুরি। কোন তথ্য ব্যবহার করা উচিত আর কোনটি নয়, কীভাবে পক্ষপাত এড়ানো যায়, কীভাবে মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়, এই বোধসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি হবে।

৪. কোমল দক্ষতা, যা আপনাকে যন্ত্র থেকে আলাদা করবে
প্রযুক্তিগত দক্ষতা আপনাকে চাকরির পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেবে, কিন্তু কোমল দক্ষতা আপনাকে পদোন্নতি দেবে।

সমালোচনামূলক চিন্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা বলছে, তা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করার ক্ষমতা। তথ্যের উৎস কী, এতে কোনো ভুল আছে কি না, তা বিচার করা।

যোগাযোগ ও গল্প বলার ক্ষমতা: আপনার জটিল বিশ্লেষণকে সহজ গল্পে উপস্থাপন করে অন্যদের বোঝানোর ক্ষমতা।

দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং মানসিক বুদ্ধিমত্তা: অন্যের আবেগ বোঝা, দ্বন্দ্ব নিরসন করা এবং সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা।

নিরন্তর শেখার মানসিকতা: আজ যা শিখছেন, তা দুই বছর পর পুরনো হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিন একটু একটু করে শেখার অভ্যাসই সবচেয়ে বড় দক্ষতা।

বাংলাদেশে কেন এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জীবন-মরণ প্রশ্ন
বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যাগত সুবিধার শ্রেষ্ঠ সময়ে আছে। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক, বীমা, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাত দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই অবস্থায় শুধু একটি সনদ আপনাকে আর চাকরি দেবে না। নিয়োগকর্তারা এখন এমন মানুষ খুঁজছেন যারা তিনটি প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বলতে পারবেন। আপনি কি নতুন সরঞ্জাম দ্রুত শিখতে পারেন, আপনি কি তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আপনি কি যন্ত্রের সঙ্গে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য সমাধান তৈরি করতে পারেন।

তাই ভয় না পেয়ে আজ থেকেই শুরু করুন। প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট একটি নতুন সরঞ্জাম নিয়ে পরীক্ষা করুন। নিজের পড়ার বিষয়ের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করুন। আপনি যদি হিসাববিজ্ঞান পড়েন, তবে কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরীক্ষা করা যায় তা শিখুন। আপনি যদি সাহিত্য পড়েন, তবে কীভাবে গল্পের জন্য গবেষণায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় তা দেখুন।

মনে রাখবেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, এটি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার। যে হাতুড়ি ব্যবহার করতে জানে, সে দ্রুত ঘর বানাতে পারে। একইভাবে, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের দৈনন্দিন কাজের সহকারী বানাতে পারবে, সে আগামী দশ বছরে শুধু টিকেই থাকবে না, নেতৃত্বও দেবে।

অ/ প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ :
.

You might like

About the Author: priyoshomoy