
বাংলাদেশের কবিতায় ফারুক আফিনদীর উত্থান শূন্য দশকের গোড়া দিকে। ঠিক সেই সময়েই আফিনদীর লেখা একটি পঙ্ক্তি আমাকে দারুণভাবে চমকে দিয়েছিল। পঙ্ক্তিখানি এরকম: ‘গুরু ভীষণ অসুবিধে/বারে বারে বারে বিঁধে’। কে এই ‘গুরু’ এবং যিনি বলছেন তার পরিচয় কী। আর যে অসুবিধের কথা বলা হলো কী সেই অসুবিধে? আফিনদী তার প্রথম কবিতার বই ‘হিম নাকি তাপিত রে মন’-এর মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। উত্তর সাজাতে গিয়ে আফিনদী বসে গেছেন ছুরি-কাচি নিয়ে। অর্থাৎ বলতে চাইছি, এই ছুরিকাচি দিয়ে তিনি নির্মমভাবে কেটে ফেলেছেন ছাঁটাই করেছেন বাহুল্য বা কবিতার মেদ। সুতরাং তার কবিতা হয়ে উঠেছে মেদশূন্য দোহারা এবং গতিশীল।
যেমন : ‘জলে জীবন ভাসে/হাওয়ায় ওড়ে প্রাণ/এ কেমন পাঠ!/জলে জীবন ডোবে/ হাওয়ায় ঝরে প্রাণ

একটা জলচ্ছাপ শুধু পড়ে/ শূন্যস্থানের কোলে’ [শূন্যস্থান]
আলোচ্যমান কাব্যের কবিতার শব্দ, বিষয়, নির্মাণ পদ্ধতি, দর্শন, ছন্দ, উপমা অলংকার কথনভঙিমা ও চিত্রকল্পে কবি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন কতটুকু তা একটু পরখ করে নেয়া যাক :
‘ঘর’ কবিতায় লিখেছেন: ‘আর ষড়পদি লালিম বাতাস, টেনে টেনে নিচ্ছে, স্যাঁতস্যাঁতে মমতার ভেতর।/ এখানে ‘ষড়পদি’ ও ‘লালিম’ শব্দদ্বয় কবির স্বাতন্ত্রকে প্রকাশ করতে যথার্থই পারঙ্গম।’
মানোত্তীর্ণ কবিতার জন্য কবিতার বিষয় একটি অনিবার্য বিষয় বটে। একটি কাব্যে একাধিক বিষয় থাকবে, থাকতেই পারে তবে তার সুর-স্বর ও আঙ্গিক হতে হবে অভিন্ন। যেমন : শামসুর রাহমানের ‘বন্দি শিবির থেকে’, আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’, বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো, চাকা’, ফাল্গুনী রায়ের ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিশন’ ইত্যাদি কাব্যের আঙ্গিক, সুর ও স্বর কিন্তু অভিন্ন। আফিনদীর কাব্যেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। হিম নাকি তাপিত রে মন-এ একাধিক বিষয় সন্নিবেশিত হলেও এর সুর ও স্বর যে অভিন্ন তা উদাহরণ টেনে বুঝে নিতে পারি। ‘দৃষ্টিভঙ্গি বলে কিছু নেই’ কবিতায় লিখেছেন-
রেখা ও জলের প্রশ্নটা থাক, পৃথিবীতে কাঁপাটাই প্রধান’ আর ‘হেঁটে যাচ্ছে খয়েরি শামুক কবিতায়- ‘এবং এই কক্ষপথে একা পৃথিবী ঘূর্ণিত অনুর নিয়মে’।
আফিনদীর কবিতা নির্মাণ পদ্ধতি প্রসঙ্গে বললে প্রথমে বলতে হবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও বিনয় মজুমদার জীবনানন্দ দাশ থেকে জারিত হলেও উল্লেখ্য কবিদের নির্মাণ পদ্ধতি ছিল নিজস্ব এবং এ কারণেই ওঁরা দুজন স্বতন্ত্র কবির মর্যাদা পেয়েছেন, নইলে হয়ে থাকতেন জীবন বাবুর ফটোকপি। অতএব বলা যায়, নির্মাণ পদ্ধতি একান্তই নিজস্ব হওয়া অনিবার্য অনুষঙ্গ। আফিনদীর নির্মাণ পদ্ধতিতে কবিতার গন্তব্যে পৌঁছে যেতে কবি নিজেই পাঠককে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
যেমন : ‘আজ আলে বসে রাজকুমারের রয়ান করছে চাকর/ মনিব তা শুনছে।’
কবিতার মধ্যে দর্শন থাকতে পারে তবে সেই দশনকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দর্শন খোঁজার উদ্দেশ্যে কবিতা পড়ার কোনো মানে নেই। মজার ব্যাপার হলো আফিনদী তার কবিতায় দর্শন দ্বারা খুব কমই তাড়িত হয়েছেন এবং এ কারণেই তার কবিতা ঝুঁকি থেকে বেঁচে গেছে। কেননা দশর্নকে কবিতা করে তুলবার ঝুঁকি নিয়ে নিলে প্রায়শ কবিতা জোলো হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়।
বাংলাদেশের কবিতায় আশির দশক থেকে শুরু হলো টানা গদ্যে লেখার প্রবণতা। তবে তা নব্বই শূন্য ও প্রথম দশকে তীব্রতম আকার ধারণ করেছে। এ সময়ে মুক্ত ছন্দ ও টানা গদ্যে লিখতেই কবিরা হয়তো অধিক স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন। আলোচ্য গ্রন্থে আফিনদী প্রায় ত্রিশ ভাগ কবিতাই লিখেছেন টানা গদ্যে। যেমন : হেমন্ত, ঘর, পাড় ভাঙনের শব্দ, লাতুর ক্যান্টিন, দৃষ্টিভঙ্গি বলে কিছু নেই, ভূগোল সূত্র, লোকটা ইত্যাদি কবিতায় কবি টানা গদ্যেই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
এই সময়ের কবিতায় অর্থাৎ শূন্য ও দ্বিতীয় দশকের কবিতায় দেখতে পাই কবিরা যে উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করছেন তা অনেক সময় ভীষণ আরোপিত হয়ে যায়। জোর করে উপমা চাপিয়ে দিলে কবিতার স্মোথনেস (smoothness) ব্যাহত হয়। এক্ষেত্রে আফিনদী অনেকাংশ সফল। কবিতায় তার উপমা উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার অকৃত্রিম অনারোপিত।
উদাহরণ : ‘যদি আচমকা পেয়ে যাই নারীকাশ / অথবা কাশনারী-পাকা নীল প্রাচীন / শারদ শাড়ি।’
জীবনানন্দ বলেছিলেন- ‘চিত্রকল্পই কবিতা’। খানিক পরে আবার বললেন, ‘কবিতা অনেক রকমের’। কবিতা অনেক রকমের হলেও চিত্রকল্পের ব্যবহার কবিতার বুননকে কমপ্যাক্ট (ঈড়সঢ়ধপঃ) করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। আফিনদীর চিত্রকল্পগুলো অধিকাংশ গ্রামীণ প্রাকৃতিক ও লোকজ অনুষদে গাঁথা হয়েছে যা এই সময়ের কবিতায় প্রায়শ বিরল।
উদাহরণ :
১. সবিতার চুল খেতে পিঁপড়ার স্পর্শের মতো জলবায়ু বিলি কাটে।
২. বঙ্গদেশের নদীদের পাড় ভাঙনের শব্দ রেখায় রেখায় ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রথম বইয়ে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাভাবিক, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কবিতা উত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। আফিনদীর বেলায়ও তাই ঘটেছে। তিনিও উত্তীর্ণ হয়ে উঠবার প্রয়াস দেখিয়েছেন। তবে পরবর্তী বইয়ে আফিনদী কবিতার শৈলী নির্মাণে নতুনত্বের ছাপ মুদ্রিত করে নেবেন- প্রত্যাশা রইলো। কবিকে অভিনন্দন।
হিম নাকি তাপিত রে মন ॥ প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা, ২০১৫ ॥ প্রকাশক: সাউন্ডবাংলা ॥ প্রচ্ছদ: সঞ্জয় দে রিপন ॥ মূল্য: ১২০ টাকা।









