

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, কুমিল্লা ব্যুরো: ১৬ মার্চ ২০২৪
শুক্রবার রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় তার কুমিল্লার উত্তর বাঁগিচাগাওয়ের বাসা থেকে। তারই এক সহপাঠী ও সহকারী প্রক্টরের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার আনুমানিক এক ঘন্টা পরই শুক্রবার রাত ১০টার দিকে মরদেহ উদ্ধার হয় অবন্তিকার ঝুলন্ত মরদেহ। অবন্তিকার মায়ের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বার বার জানিয়েও হয়রানির বিচার পাননি তারা। যে কারনেই এই আত্মহনন। অবন্তিকার মৃত্যুতে দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছেন অবন্তিকার মা’সহ সহপাঠী ও স্বজনেরা।

মৃত্যুর আগে এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে যান শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। ওই স্যাটাসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও তার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকিকে তার মৃত্যুর জন্যে দায়ি বলে অভিযুক্ত করে যান।
অবন্তিকার ভাই জারিফ জাওয়াদ অপূর্ব জানায়, রাতে অবন্তিকার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে নেয়ার পরে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
এব্যাপারে কুমিল্লা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক এএনএম জোবায়ের বলেন, যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো, তখন আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পাই। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়রানির বিচার দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার অফিযোগ অবন্তিকার মা’র
অবন্তিকা কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের (চতুর্থ বর্ষের) ছাত্রী ছিলেন। তিনি কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাও ফায়ার সার্ভিস পুকুর সংলগ্ন একটি বাসায় পরিবারের সাথে ভাড়া থাকতেন।
অবন্তিকার বাবা জামাল উদ্দিন কুমিল্লার সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। দুবছর আগে তিনি মতারা যান। তিনিও তাঁর মৃত্যুর আগে মেয়ে অবন্তিকার হয়রানি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ করেও প্রতিকার পান নি, এমনটাই অভিযোগ অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনমের। তার অভিযোগ, মানসিক ভাবে হয়রানি করে অবন্তিকাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছে।
অবন্তিকার কুমিল্লার বন্ধুরা জানান, মেধাবী অবন্তিকা মানসিক ভাবে শক্ত ছিলেন। তার এই আত্মহত্যার ঘটনা অনাকাঙ্খিত। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তিও দাবি করেন তারা।
অবনন্তিকার অত্মহত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবীতে উত্তাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। জানাজার আগে কুমিল্লায় আসা তার সহপাঠীরাও এই মৃত্যুতে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবী করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে যা লিখেছেন অবন্তিকা
মারা যাওয়ার পূর্বে শুক্রবার রাত দশটার দিকে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন অবন্তিকা। সেখানে তিনি লিখেন – “আমি যদি কখনো সুইসাইড করে মারা যাই তবে আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী থাকবে আমার ক্লাসমেট আম্মান সিদ্দিকী, আর তার সহকারী হিসেবে তার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে সাপোর্টকারী জগন্নাথের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম “
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফিরোজ হোসেন জানান, বাগিচাগাঁও এলাকার ভাড়া বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে আত্মীয়-স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে । এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও তার মৃত্যুর বিষয় যদি কারো কোন প্ররোচনা থাকে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা প্রক্টর ও সহপাটিকে দায়ী করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার ঘটনায় দোষীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে কুমিল্লায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর পূবালী চত্বরে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জোটের আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের দাবি জানান। না হয় আরো কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তারা।
মানববন্ধনে কুমিল্লার বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। এসময় বক্তব্য দেন বাংলা সংস্কৃতি বলয় এর মহাসচিব কাজী মাহাতাব সুমন, যুগ্ম মহাসচিব এস এ এম আল মামুন, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল আমিন, বাংলাদেশ ইয়ুথ ক্যাডেট ফোরাম এর সভাপতি শাহ মুজিবুল হকসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
এদিকে শনিবার দুপুরে অবন্তিকার মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। বেলা ৩ টায় কুমিল্লা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজা শেষে শাসনগাছা এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
কুমিল্লায় বাবার পাশেই শায়িত হলেন অবন্তিকা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার জানাজার নামাজ শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার বিকেল তিনটায় কুমিল্লা সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তারা জানাজা নামাজ। পরে বিকাল চারটার দিকে নগরীর শাসনগাছায় তার বাবার কবরের পাশে অবন্তিকাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে বেলা ১১ টা অবন্তিকার পরিবারের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
অবন্তিকাকে শেষবারের মতো দেখতে তার কুমিল্লার বাসায় আসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টররিয়াল বডির কয়েকজন সদস্য ও তার সহপাঠিরা। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মুনিরা জাহান সুমি জানান, তদন্ত কমিটি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
ঢাকা থেকে আসা অবন্তিকার সহপাঠীরা জানান, তার এমন মৃত্যুর খবরের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। সবাই তার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
এর আগে দুপুর একটার দিকে অবন্তিকার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়ে কুমিল্লার কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জোট।

অবন্তিকার আত্মহত্যা: শিক্ষক দ্বীন ইসলাম ও সহপাঠী আম্মান আটক
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলটিমেটামের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় তার সহপাঠী রায়হান সিদ্দিকী আম্মান ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৬ মার্চ) রাতে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে এই দুজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তারা পুলিশের হেফাজত রয়েছেন।
এর আগে গতকাল শুক্রবার রাতে শিক্ষক-সহপাঠীকে অভিযুক্ত করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা আত্মহত্যা করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এ ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার (১৬ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর ভিক্টোরিয়া পার্ক ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ ঘুরে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে এসে শেষ হয়।
এরপর সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বরে দাঁড়িয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেন। এসব দাবি বাস্তবায়নে ১২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন তারা।
তবে, এ ঘটনায় একপাক্ষিক চিন্তা না করে পুরো বিষয় চিন্তা করে একটা মতামতে উপনীত হওয়ার আহ্বান জানান অভিযুক্ত সহপাঠী রায়হান সিদ্দিকী আম্মান। শুক্রবার রাতে আম্মান ফেসবুকে নিজস্ব আইডিতে এ বিষয়ে পোস্ট করেন। ওই পোস্টে আম্মান লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওনার (অবন্তিকা) সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করিনি। এমনকি ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা কোনো জায়গাতেই কানেকটেড না আমি। আমাকে দোষী প্রমাণের জন্য এভিডেন্স লাগবে। এভিডেন্স ছাড়া এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’










