দরিদ্র দেশগুলোর অর্থ সহায়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে শুরু হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন : ভালো খবরের অপেক্ষায় আমরা!

সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হৈচৈ এর শেষ নেই। বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। বিশেষ করে কোন দেশ এর জন্যে দায়ী; কারা ক্ষতিগ্রস্ত- এরকম আলোচনা যেমন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে; তেমনি আলোচনা সমালোচনামূলক লেখারও কমতি নেই। আমরা সকলেই জানি যে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশেও অস্থায়ী কিংবা স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের এ বিপর্যয়কে বাংলাদেশ সরকারের বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশনপ্ল্যান-এ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কি না, তা’ চারটি মানদন্ডে বিবেচনা করা হয়। যেমন-১. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২. কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে ৩. সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ৪. ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

প্রাকৃতিকভাবে আবহমানকাল থেকে এ দেশে ঋতুবৈচিত্র বর্তমান। ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। এটা আমরা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় পেয়েছি। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়; যা’ অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগ মুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এ স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসব পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত স্থূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। এর জন্যে কারা দায়ী? তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে।

ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপক‚লীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরীগাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এভাবে বহু সমস্যার বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানা রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে বাংলাদেশে।

অনেক প্রজাতিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গাছ, মাছ, পাখি, ফুল, ফল সবকিছুতেই এই প্রভাব পড়ছে। ইউনেসকোর ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসে পরিবেশের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতের ওপরও পড়ছে বড় প্রভাব। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক আচরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য প্রতিক‚ল অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। মৌসুমি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাছের প্রজননে নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে, যেমন প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এবং তাপমাত্রা বেশি থাকায় মাছ কৃত্রিম প্রজননে সাড়া না দেওয়ায় প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ডিম শরীরে শোষিত হয়ে যাচ্ছে।

গত ১১ নভেম্বর ২০২৪ জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘দরিদ্র দেশগুলোর অর্থ সহায়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে শুরু হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন‘ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঐ সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন। সোমবার থেকে শুরু হয়ে এ সম্মেলন; চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সমাধানের লক্ষ্যে এ সময়টাতে প্রায় ২০০ দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা একত্র হবেন।

এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য জলবায়ু সংকটের ভুক্তভোগী দরিদ্র দেশগুলোকে আরো অর্থসহায়তা দেয়ার পথ খুঁজে বের করা। জাতিসংঘের বার্ষিক এই জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ’ নামে পরিচিত। এর পূর্ণ রূপ ‘কনফারেন্স অব পার্টিস’। এবার বাকুতে কপের ২৯তম আসর বসেছে। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রায় ২০০ দেশ কপের সদস্য। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে প্রতিবছর সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিরা একত্র হন। জলবায়ু সংকট সমাধানে উৎসাহ দিতে কপের শুরুতে সাধারণত সদস্যদেশগুলোর প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীরা যোগ দেন। তবে এবার কয়েকটি বড় অর্থনীতি এবং সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকছেন না। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কেনো? সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে যোগ দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার প্রথমবারের মতো সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছে। জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও নেতাদের আলোচনার টেবিলে উঠবে।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিস্থিতি যখন প্রতিবছরই আরো তীব্র আকার ধারণ করছে, তখন কপ সম্মেলন সফল করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি আমরা। কেননা প্রতিবছর আমাদের পৃথিবী একটু একটু করে উষ্ণ হচ্ছে, তা’ থামাতে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়; অন্যথায় আমরা বসবাসের সুন্দর পৃথিবী হারাবো। তবে আমরা হারাতে চাই না সুন্দর পৃথিবীকে।

সোমবার, ১১ নভেম্বর ২০২৪, ২৬ কার্তিক ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শ্বেতীর সাদা দাগ দূর করার উপায় কি?

You might like