এক বিভীষিকাময় মৃত্যুর আলেখ্য: ‘শুটার মান্নান’ ও সমাজ-বিক্ষত মেঘনা

সম্পাদকীয়

মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীর বুকে এক সকালের গোলাগুলি আবারও প্রমাণ করে দিল যে, আমাদের সমাজের গভীরের ক্ষত কতটুকু বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ‘চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের’ মতো তুচ্ছ কারণে একজন ব্যক্তি, যার পরিচয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ এবং ‘শুটার মান্নান’, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ বা ব্যক্তি কারা, তা হয়তো পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসবে; কিন্তু যা স্পষ্ট, তা হলো- আমাদের সমাজে আইনের শাসন আজ কতটা দুর্বল এবং অপরাধের জাল কতটা সুদূরপ্রসারী। প্রিয় সময়ে প্রকাশিত ‘মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে ‘চাঁদাবাজি নিয়ে’ গোলাগুলি, ‘শুটার মান্নান’ নিহত’ শিরোনামে সংবাদটি পাঠে পাঠকমাত্র মনোদুঃখ পেয়েছেন।

খবর অনুযায়ী, নিহত মান্নান নামের এ ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তার নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলার কথা উল্লেখ করে পুলিশ তাকে ‘কুখ্যাত সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘শুটার মান্নান’ নামে পরিচিত ছিলেন, যা’ তার পেশার এবং প্রকৃতির এক ভয়ঙ্কর দিক তুলে ধরে। তার মতো একজন ব্যক্তি, যিনি হয়তো দীর্ঘকাল ধরে অপরাধের জগতে বিচরণ করেছেন, তার এমন আকস্মিক মৃত্যু আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এ মৃত্যু কি কেবল একজন অপরাধীর জীবনের শেষ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরো বড় কোনো অপরাধ চক্রের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব?

একজন মানুষ, যিনি নিজে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তিনি যখন আরেক অপরাধী দলের হাতে নিহত হন, তখন তা’ সমাজের জন্যে কোনো স্বস্তির বার্তা বহন করে না। বরং এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে একদল অপরাধীর বিরুদ্ধে আরেক দল অপরাধীর লড়াই চলছে, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের জালের বাইরে থেকেও প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। এ গোলাগুলির ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি সেই অন্ধকার জগতের একটি চিত্র, যেখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। সেখানে ক্ষমতার লড়াই, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ কার্যকলাপই একমাত্র চালিকাশক্তি।

প্রশ্ন হলো, এ চাঁদাবাজি, এ আধিপত্য বিস্তার কিসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে? মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদী একটি বাণিজ্যিক জলপথ। সেখানে যদি চাঁদাবাজির মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে, তবে তার পেছনে কারা রয়েছে? এটি কি কেবল কিছু ছোটখাটো গ্যাংয়ের কাজ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা? যারা এ নদীকে কেন্দ্র করে অবৈধ বালুমহাল পরিচালনা করে বা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে, তাদের এ সাহস কোথা থেকে আসে? কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী তাদের থামিয়ে দিতে পারে না? নিহত মান্নানের স্ত্রী বলছেন, তার স্বামীকে লালু-জুয়েল গ্রুপ মেরে ফেলতে চেয়েছিলো এবং এর জন্যে তারা পেশাদার খুনি ভাড়া করেছিলো। তিনি গুয়াগাছিয়ার কুখ্যাত সন্ত্রাসী নয়ন-পিয়াস বাহিনীরও নাম উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের সুসংগঠিত অপরাধী দলগুলোর অস্তিত্ব এবং তাদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। যখন একটি সমাজের অপরাধীরা এতোটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে তারা দিনে-দুপুরে একটি জনবহুল জায়গায় গোলাগুলি চালাতে পারে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

এ মৃত্যুর ঘটনা হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। একটি ‘শুটার মান্নান’ মারা গেলে তার জায়গা অন্য কেউ দখল করবে, যদি না সেই সিস্টেমকে ভেঙে ফেলা হয়, যা’ এমন অপরাধীদের জন্ম দেয়। সেই সিস্টেম যেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অপরাধীরা নিজেদের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। আমাদের সমাজ ততোক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ হবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের অন্ধকার জগতের মূল হোতাদের ধরা না হয়।

আমরা প্রায়ই দেখি, এ ধরনের ঘটনাগুলো কিছু সময়ের জন্যে আলোচনায় থাকে, তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু সমাজের এ ক্ষতগুলো থেকেই যায়। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। যারা এ অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীকেও আরো কঠোর হতে হবে। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

শুধু একজন ‘শুটার মান্নান’কে হত্যা করে এ সমস্যার সমাধান হবে না; বরং পুরো অপরাধ চক্রকে নির্ম‚ল করতে হবে। এ ঘটনা একটি অশনি সংকেত। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজ কতোটা ভঙ্গুর। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা সকলে মিলে একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্যে কাজ করবো, ততক্ষণ পর্যন্ত এমন ‘শুটার মান্নান’-দের জন্ম হতেই থাকবে, এবং মেঘনার মতো পবিত্র জলরাশি তাদের রক্তের দাগে কলঙ্কিত হতেই থাকবে।

শেয়ার করুন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy