

মিজানুর রহমান রানা :
চাঁদপুর শহরের রেলগেট মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালা করিম মিয়া এখন আর যাত্রীর ভাড়া নিয়ে দরদাম করেন না। তার স্মার্টফোনে ‘পথিক’ অ্যাপে গন্তব্য লিখলেই ভাড়া চলে আসে। অন্যদিকে হাজীগঞ্জের কৃষক রহিমা বেগম জমিতে সার দেওয়ার আগে মোবাইলে ‘কৃষি বাতায়ন’ খুলে দেখে নেন আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের পূর্বাভাস। এটাই বদলে যাওয়া চাঁদপুর — যেখানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে শুরু করে স্কুলের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পর্যন্ত প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে।
১. ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার: গ্রামের প্রাণকেন্দ্র
২০১০ সালে শুরু হওয়া ইউডিসি এখন চাঁদপুরের ৮৯টি ইউনিয়নে সক্রিয়। জন্মনিবন্ধন, পর্চা তোলা, পাসপোর্ট ফি জমা, এমনকি বিদেশে থাকা ছেলের সাথে ভিডিও কল — সবই হচ্ছে ইউডিসিতে। মতলব দক্ষিণের বালুচর ইউডিসির উদ্যোক্তা সুমনা জানালেন, মাসে গড়ে ১২০০ মানুষ সেবা নেন। আয় করেন ৪০-৫০ হাজার টাকা। সরকার ২০২৬ সালে ইউডিসিকে ‘স্মার্ট সার্ভিস পয়েন্ট’ হিসেবে আপগ্রেড করছে। ফলে এখন ই-নামজারি, ই-মিউটেশনও গ্রামে বসেই হচ্ছে।

২. স্মার্ট কৃষি: চাঁদপুরের ইলিশ থেকে ধানক্ষেত
চাঁদপুরের ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র IoT সেন্সর বসিয়েছে মেঘনায়। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন ও লবণাক্ততা মেপে জেলেদের অ্যাপে জানানো হয় কখন জাল ফেললে ইলিশ বেশি পাওয়া যাবে। ফরিদগঞ্জের কৃষক মোস্তফা ড্রোন দিয়ে জমিতে কীটনাশক ছিটান। খরচ কমেছে ৩০%। ‘খামারি’ অ্যাপে গরুর রোগের ছবি তুলে দিলে AI বলে দেয় চিকিৎসা।
৩. স্মার্ট শিক্ষা: হাওর থেকে হাইস্পিড
চাঁদপুর সরকারি কলেজে এখন ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’। শিক্ষক বোর্ডে লিখলেই সেটা অটো পিডিএফ হয়ে ছাত্রদের ট্যাবলেটে চলে যায়। হাইমচরের চরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে ‘স্টারলিংক’ পাইলট চলছে। আগে যেখানে নেট ছিল না, এখন সেখানে দশম শ্রেণির মীম অনলাইনে কোডিং শিখছে। ২০২৫ সালের এসএসসিতে চাঁদপুর জেলার পাসের হার ৯২.৩%, যার পেছনে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের বড় ভূমিকা।
৪. স্মার্ট স্বাস্থ্য: টেলিমেডিসিনে বাঁচছে জীবন
২৫০ শয্যা চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে এখন ভিডিও কলে ঢাকা মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রোগী দেখেন। কচুয়ার গৃহবধূ সালমা প্রসব জটিলতায় পড়লে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পান। ‘মায়ের ব্যাংক’ অ্যাপ গর্ভবতীদের নিয়মিত চেকআপ মনে করিয়ে দেয়। ফলে মাতৃমৃত্যু হার ২০২০ সালের ১৬৫ থেকে ২০২৫ সালে ৯৮-এ নেমেছে প্রতি লাখে।
৫. চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ
সবই কি ঠিকঠাক? না। গ্রামে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নেই। সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা কম। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে হাজীগঞ্জে গত মাসে সংঘাত হয়েছিল। তাই ডিজিটাল লিটারেসি এখন সবচেয়ে জরুরি। জেলা প্রশাসন ‘স্মার্ট চাঁদপুর ২০৩১’ রোডম্যাপ করেছে — ফাইভ-জি, ফ্রি ওয়াইফাই জোন, আর প্রতি স্কুলে রোবোটিক্স ল্যাব।
প্রযুক্তি এখন আর ঢাকার বিষয় না। চাঁদপুরের আলু ব্যবসায়ী এখন হোয়াটসঅ্যাপে কোল্ড স্টোরেজের রেট দেখেন, ইলিশের আড়তদার লাইভ ফেসবুকে নিলাম করেন। এই বদলটা ধরে রাখতে পারলেই ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর রোল মডেল হবে চাঁদপুর।
বিভাগীয় সম্পাদকের কথা
প্রিয় পাঠক,
‘তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ’ পাতায় আপনাকে স্বাগত। প্রযুক্তি এখন আর শুধু ঢাকার অফিসপাড়ার গল্প নয়; চাঁদপুরের ঘাটে, মাঠে, স্কুলে, বাজারেও এর পদচারণা। সেই বদলের ছবিটাই আমরা তুলে ধরছি এই সংখ্যার ৫টি ফিচারে।
‘স্মার্ট চাঁদপুর’ ফিচারটিতে দেখবেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে শুরু করে ইলিশ গবেষণায় IoT কীভাবে গ্রামকে বদলে দিচ্ছে। AI নিয়ে ভয় না পেয়ে চাঁদপুরের তরুণরা কীভাবে আয় করছে, সেই পথও বাতলে দিয়েছি দ্বিতীয় ফিচারে। পাশাপাশি বাড়তে থাকা সাইবার প্রতারণার ফাঁদ ও বাঁচার ১০টি ‘ডিজিটাল টিকা’ নিয়ে সতর্ক করেছি তৃতীয় লেখায়।
ঘরে বসে ডলার আনার স্বপ্ন যারা দেখেন, চতুর্থ ফিচারে আছে তাদের জন্য রোডম্যাপ — শূন্য থেকে ফ্রিল্যান্সার হওয়ার গল্প ও গাইড। আর সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় — সন্তানের হাতে স্মার্টফোন। পঞ্চম ফিচারে ‘স্মার্টফোন বনাম সন্তান: জিতবেন কে?’ শিরোনামে অভিভাবকদের জন্য দিয়েছি বাস্তবসম্মত ডিজিটাল প্যারেন্টিং পরামর্শ।
আমাদের লক্ষ্য একটাই: প্রযুক্তির সুবিধা নিন, কিন্তু ফাঁদে পড়বেন না। চাঁদপুরকে আমরা দেখতে চাই ‘স্মার্ট জেলা’ হিসেবে, যেখানে কৃষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী সবাই প্রযুক্তির সৈনিক। আপনাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও প্রশ্ন পাঠান mizanranabd@gmail.com এ। আগামী সংখ্যায় আমরা তা তুলে ধরব।
প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হোক চাঁদপুর।
মিজানুর রহমান রানা
বিভাগীয় সম্পাদক, তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ
দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ

















