
প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে তর্ক থেকে পিটিয়ে হত্যা – এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আইনের শাসনের ভয়াবহ পতনের প্রতিচ্ছবি
সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা হাউজিং এলাকা। একটি গেঞ্জি কারখানার সামনে প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে কথা কাটাকাটি। আর তার জেরে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন উপ-পরিদর্শককে পিটিয়ে হত্যা। ঘটনাটি শুনতে যতটা অবিশ্বাস্য লাগছে, বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেন (৫৮)। তিনি কোনো সাধারণ নাগরিক নন, তিনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একজন সদস্য। তিনি মালিবাগ জোনে কর্মরত ছিলেন। শনিবার রাতে ছোট ছেলে আরিফুল ইসলামকে (২৬) সঙ্গে নিয়ে তিনি যখন নিজের এলাকায় আক্রান্ত হলেন, তখন তার সঙ্গে ছিল ১০-১৫ জনের একটি দল। গুরুতর আহত অবস্থায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। র্যাব-১০ মুন্সিগঞ্জে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে, এটা আশার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গ্রেপ্তারই কি শেষ কথা? এখনও পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করা হয়, এটা কিসের লক্ষণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আমিনবাজারের পুরনো ক্ষতের দিকে তাকাতে হবে। ২০১১ সালে এই আমিনবাজারেই ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। পনেরো বছর পর একই জায়গায়, একই কায়দায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হলো। ইতিহাসের এই নির্মম পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, আমরা গণপিটুনি বা মব জাস্টিস নামক ব্যাধি থেকে একচুলও সরে আসতে পারিনি।
এটা কিসের লক্ষণ?
১. রাষ্ট্র ও পুলিশের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধার চরম অবক্ষয়: একটা সময় ছিল যখন পুলিশের পোশাক দেখলেই মানুষ সমীহ করত। ভয় পেত, শ্রদ্ধা করত, বা অন্তত এড়িয়ে চলত। আজ সেই পোশাক আর কোনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। যখন একজন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, পুলিশকে মেরে ফেললেও পার পাওয়া যাবে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের মনোপলি অন ভায়োলেন্স বা বৈধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার ভেঙে পড়েছে। এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষণ। পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ, অনাস্থা এবং বিগত বছরগুলোতে পুলিশের কিছু সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকা জনমনে যে ঘৃণা তৈরি করেছে, তার প্রতিফলন আজকের এই ঘটনা। মানুষ পুলিশকে আর বন্ধু ভাবছে না, শত্রু ভাবছে।
২. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা: আমাদের সমাজে একটি ভয়ংকর ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে – “আইনে কিছু হবে না, নিজেরাই শাস্তি দিই”। মামলা করলে বছরের পর বছর ঘুরতে হবে, পুলিশ টাকা খাবে, বিচার হবে না। এই অনাস্থা থেকে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। ১০-১৫ জন মিলে দুজন মানুষকে পেটানোর যে উল্লাস, তা এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা। এরা মনে করে, সংখ্যায় বেশি হলেই যে কোনো অন্যায়কে ন্যায় বানানো যায়। এই মব তৈরির মানসিকতা করোনা ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়াচ্ছে।
৩. সামাজিক সহনশীলতার মৃত্যু: একটি প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে বাকবিতণ্ডা। একটি অতি তুচ্ছ, নগণ্য ঘটনা। সভ্য সমাজে যা আলোচনা বা দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে মিটে যাওয়ার কথা, সেখানে আমরা হত্যা পর্যন্ত চলে যাচ্ছি। আমাদের সহ্য করার ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সামান্য কথায় আমরা খুন করতে প্রস্তুত। পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন – সবকিছুই যেন ব্যর্থ হচ্ছে।
৪. কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় সন্ত্রাসের বিস্তার: আমিনবাজার, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর – এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী, কারখানার মালিকের লাঠিয়াল বাহিনী এবং কিশোর গ্যাং। এরা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে রাখে। এদের কাছে জীবনের কোনো মূল্য নেই। এসআই আলতাফ হোসেনের হত্যাকারীরা এই ধরনের কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য কিনা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
উত্তরণের উপায় কী?
এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের জন্য শুধু চারজনকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। প্রয়োজন সামগ্রিক এবং কঠোর ব্যবস্থা।
প্রথমত, দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এই মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত ও বিচার শেষ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমিনবাজারের ছয় ছাত্র হত্যার বিচার হতে এক যুগের বেশি লেগেছে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস বাড়ায়। যখন মানুষ দেখবে, পিটিয়ে মারার ৩ মাসের মধ্যে ফাঁসি হয়েছে, তখনই এই প্রবণতা কমবে। বিচারহীনতা বন্ধ না হলে কোনো কিছুই থামবে না।
দ্বিতীয়ত, পুলিশকে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পুলিশকে মনে রাখতে হবে, তাদের বেতন হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। পুলিশি সেবাকে আরও মানবিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। থানায় গেলে যেন মানুষ হয়রানির শিকার না হয়। পুলিশের মধ্যে যে দুর্নীতিবাজ ও দলবাজ চক্র আছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। একজন পুলিশ সদস্যের গায়ে হাত তোলা মানে রাষ্ট্রের গায়ে হাত তোলা – এই বার্তা স্পষ্ট করতে হবে।
তৃতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিং ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি মহল্লায়, প্রতিটি হাউজিংয়ে পুলিশ ও জনগণের সমন্বয়ে কমিটি করতে হবে। মাদক, কিশোর গ্যাং, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের তথ্য পুলিশকে দিতে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গণপিটুনির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ” – এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক ছত্রছায়া বন্ধ করতে হবে। বেশিরভাগ গণপিটুনি ও স্থানীয় সন্ত্রাসের পেছনে থাকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যথায় এই সংস্কৃতি চলতেই থাকবে।
পঞ্চমত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা। কোনো ঘটনা ঘটলেই যাচাই না করে “ডাকাত”, “ছেলেধরা”, “চোর” বলে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে জনতাকে উসকে দেওয়া এখন একটি বড় সমস্যা। গুজব প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
এসআই আলতাফ হোসেন কোনো দলের ছিলেন না, তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের কর্মচারী। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের সাধুপাড়া গ্রামে। তিনি তার পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকতেন আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। আজ তার লাশ সিরাজগঞ্জে যাচ্ছে। এই লাশ শুধু একটি পরিবারের নয়, এই লাশ পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার ব্যর্থতার।
আমরা যদি এখনই না থামি, তাহলে কাল হয়তো আপনার বা আমার গাড়ি রাখা নিয়ে, বাড়ির সামনে ময়লা ফেলা নিয়ে, কিংবা ফেসবুকে একটি কমেন্ট নিয়ে আমাদেরও পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে। এবং ১০-১৫ জনের ভিড়ে আমাদের হত্যাকারী হারিয়ে যাবে।
আমিনবাজার থেকে রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে – আমরা কি মবের শাসনে চলব, নাকি আইনের শাসনে ফিরব? আলতাফ হোসেনের রক্ত সেই প্রশ্নের উত্তর চায়।
প্রকাশিত : সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬








