
যুবক অনার্য :
অবিনাশ আর তিথির বিষয়টা আমার
জানা ছিলো শুরু থেকেই।অবিনাশ মধ্যবিত্ত, তিথিরা নিম্নমধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত হয়েও
তিথির হয়ে উঠবার পেছনে অবিনাশ সাধ্যমতো ক’রে গেছে।তিথির খুব ইচ্ছে ছিলো
অভিনয় শিল্পী হবার।তাও আবার বড়ো পর্দার এবং তাও আবার কমার্শিয়াল ছবি!
ইচ্ছে পূরণ করতে হলে তিথিকে স্লিম হতে হবে- ফিগার জিরো করে ফেলতে হবে।
তিথি একটু মোটাটে।অবিনাশ ওকে
জিমে ভর্তি করে দিয়েছে।
যেহেতু কমার্শিয়াল মুভি,ড্যান্স তো লাগবেই।
ভর্তি করে দিয়েছে ড্যান্স স্কুলে।
তিথির যেখানে ভাঁজ পড়ার কথা পড়েছে- পড়েছে খাঁজ যেখানে পড়ার কথা,যেখানে মাংসল
হবার কথা- হয়েছে।এসব কিছুই বস্তুত
অবিনাশের অবদান।তারপর এলো
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ – অভিনয় জগতে প্রবেশের দরোজা।তাও খুজেঁ দিয়েছে অই অবিনাশই।
ঢুকার পর যা হয় – হলো তাই।-
শরীর বানিয়ে দিয়েছে,না এভাবে বোল্লে
নোংরা শোনায়- শরীর শিল্পিত করেছে অবিনাশ,এখন সেই শরীরই বখরা হিশেবে
দিতে হবে দু’ জন প্রধান ব্যক্তিকে।
বখরা যে দিতে হবে – এরকম কোনো কথা মিডিয়ার সাথে অবিনাশের হয় নি কারণ
মিডিয়া মানে যার মাধ্যমে দরোজায় প্রবেশাধিকার- সেই ভদ্রলোক অবিনাশের খুব বিশ্বস্ত।তবে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না
অই মিডিয়াবাজ লম্পটটাকে কিন্তু অবিনাশের বিশ্বস্ত হলে সেখানে আমার বোলবার থাকে না কিছু সঙ্গত কারণেই,কারণ স্বপ্নের ঘোরে মানূষ
বিশ্বাস -এর কাছে খুব দুর্বল হয়ে পড়ে- সম্ভবত এটাই স্বাভাবিক,তাই আমি কিছু বলতে গেলে অবিনাশ যে আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিতো-
এ বিষয়ে ছিলাম আমি নিশ্চিত ,তাই ওসব কিছু নিয়ে কিছুই বলা হয় নি আমার।
তিথি বখরা দিতে রাজি হয়ে গেলো মুহুর্তকালও না ভেবেই! দু’দিন পর তিথি আমাকে বোল্লো : ‘ নিখিলদা,আমি নষ্ট হয়ে গেছি,আমি আর অবিনাশের যোগ্য নই কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিলো না।অবি-কে বোলে দিও- আমি ওর জীবন থেকে সরে যেতে চাই।আমি যে নষ্ট সেই কথাও বোলে দিও।
বোল্লাম: তোমার ভাবতে হবে না তিথি,আমি সামলে নেবো যদিও বিষয়টি আসলে
সামলে নেবার মতো নয়।অবিনাশ তোমাকে কতোটা ভালোবাসে সে তুমি নিজেও জানো।
তিথির চোখে জল জমে উঠেছিলো,
আমি মুছে দিয়ে বোল্লাম: পাখি উড়ে যাবার সময় বাতাসে যে ছাপ রেখে যায়
আমরা তা দেখতে পাই না,তবে বাতাস কিন্তু তা ঠিক ঠিক টের পেয়ে যায়।সে যাইহোক,এখন থেকে তোমার পথ তোমাকেই সাজিয়ে নিতে হবে।
ভালো থেকো।
তিথিকে বিদায় দিয়ে আমি সোজা ‘মিছিল’- এ মানে অবিনাশের বাড়িতে।কী বোলতে গিয়ে
কী খেয়ে ফেলবো ভেবে আমার বুক ধড়ফড় করছে কিন্তু বোলতে তো হবেই।
বোল্লাম: যে-দেবীকে মানুষ অতো সুন্দর করে বানিয়ে পুজো দেয়,সেই দেবীকেই কিন্তু মানুষ বিসর্জন দিয়ে আসে জলে।এসব তুই আমার চেয়ে ভালো জানিস আর কবি বোলে এসব তুই
ভালোই বুঝিস।তোকে কিছু বোঝানো
আমার শোভা পায় না।ভূমিকা না দিয়েই বোলছি- তুই তিথিকে বিসর্জন দিয়ে দে।
অবিনাশ হা হয়ে গেলো।হয়ে যাবারই কথা।
বোল্লো: কেনো?
বোল্লাম: তিথি ওর জীবনকে অন্যভাবে
সাজাতে চাইছে।এখন আর পেছন ফিরে তাকাবার সময় নেই।
এসব তুই কী বোলছিস!
যা সত্য তা-ই বোলছি।
আমি বিশ্বাস করি না।
তোর বিশ্বাস অবিশ্বাসের উপর
বাস্তবতা নির্ভর করছে না।
অবিনাশ কাচের টি-টেবিলটা বারংবার আঘাত করে ভেঙে ফেললো।ওর হাতে রক্ত ঝরছে।
আমি কোনোরকম চাপাচাপি করে
হাত ব্যান্ডেজ করে ওকে শুইয়ে দিলাম।
অবি’র মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুচ্ছে না।
শুধু ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে
হা করে।এরপর অবিনাশের ভবিষ্যৎ কী –
আমি জানি না।স্কিৎজোফ্রেনিক হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি যদি সামলে উঠতে না পারে!
আমি অবি’র মতো কবিটবি নই তাই ভাষাজ্ঞান সীমিত।’মিছিল’থেকে ফেরার সময় ওর কপালে হাত রেখে বোল্লাম: অবিনাশ,
তোকে কী বোলতে হবে আমি জানি না।এই মুহুর্তে শুধু বোলতে পারি, না পারার মতো, যে- তিথির স্বপ্নের কাছে তোর ভালোবাসা হয়তো হেরে গেছে কিন্তু তোর ভালোবাসার কাছে হেরে যাবে তিথির সমগ্র জীবন – হিরকখচিত জৌলুশ।
তারপর পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ওর ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে ম্যাচ লাইট ধরালাম।
অবিনাশ ধোঁয়া ওড়াচ্ছে সিগ্রেটের।
তিথির দেয়া কষ্টকে অবিনাশ কখনোই পারবেনা ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিতে।অবিনাশ বরং
জ্বলে যাবে, জ্বলতে থাকবে সিগ্রেটের
শলাকার মতো! আমি জানি- শরীর বখরা দেয়ার পরেও অবিনাশ তিথিকে অনায়াসে মেনে নিতো- এমনকি অজস্রবার বখরা দেবার পরেও কিন্তু তা বোলে কি অবিনাশকে আমি ওসব বখরাটখ্রা বলতে পারি! ফিরে আসার সময় দরোজায় দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে অবিনাশের দিকে তাকালাম।মনে হলো- কে যেনো অবিনাশকে সিগ্রেট বানিয়ে সেবন করছে,বাতাসে
উড়িয়ে দিচ্ছে ধোঁয়া! আর অবিনাশ? কেবল পুড়ছে।শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দিলে যে পুড়ে যাওয়াই নিয়ম।কবি হয়েও অবিনাশের এই নিয়মটি সম্ভবত জানা ছিলো না।তবে এইটুকু অবিনাশ খুব ভালো করেই জেনে গেছে:
তিথিদের স্বপ্নের কাছে অবিনাশদের ভালোবাসা ব্যবহৃত ন্যাপকিনের মতোই মূল্যহীন –
ফেলে দিতে হয় কাক আর কুকুরের ভিড়ে-
হলুদ কন্টেইনারে- শিল্পাচার্য জয়নুলের সেই বিখ্যাত ডাস্টবিনে!








