

অশোক কুমার রায়
চারিদিকে মেঘনা বেস্টিত সবুজে সুশোভিত নারকেল, সুপারি, আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, মেহগনি কড়াই, রেইনট্রি, বয়রা, কেওড়াসহ চিরহরিৎ কত নাম না জানা গাছ গাছালি দ্বারা সৌর্ন্দযে মন্ডিত একটা দ্বীপ বলা যায় শুধু দ্বীপ নয় দ্বীপের রানী মনপুরা।
এই মনপুরার আরো অনেক ছোট ছোট চর রয়েছে যার একটি বঙ্গোপসাগরের প্রায় কাছাকাছি চরনিজাম যা একেবারে দক্ষিণে, উত্তরে রয়েছে চর কলাতলী ও চরঢাল নামক চর এছাড়া পশ্চিমে রয়েছে চর ইসলাম পূর্বে বলাবাহুল্য নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা। এই উপজেলার দক্ষিণে যা মনপুরারও দক্ষিণে রয়েছে সৌন্দর্যের আরো এক রানী নিঝুম দ্বীপ।

এই মহা সৌন্দর্যের মধ্যে এসে পড়েছে আর এক অপরুপ সুন্দরী সামিয়া পুরা নাম সামিয় জামান। একটা এনজিও এর প্রকল্প ম্যানেজার হিসাবে তার এই সৌন্দর্যের মধ্যে এসে পড়া। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই চাকরীতে তার যোগদান। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা হতে তাসরিফ-২ নামক লঞ্চে চেপে কাক ডাকা এক ভোরে সূর্য্য ওঠার পূর্বেই সামিয়ার রঙ্গিন স্বপ্ন চোখে নিয়ে মনপুরায় পা রাখা।
মনপুরা আসার পূর্বেই গুগলের কল্যানে মনপুরা সর্ম্পকে অনেক অজানা বিষয় জানা গেলেও এখানকার মানুষের জীবন যাত্রা ও চালচলন সর্ম্পকে তেমন জানা হয়ে ওঠেনি। এ তটের ঐতিহ্যগত মহিলাদের চলাফেরা সর্ম্পকে কেউ তাকে কিছু বলেওনি। সামিয়া র্স্মাট, সুন্দরী সদ্য বিশ^বিদ্যালয় পাঠ শেষ করা এক যুবতী একটা বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই প্রকল্পের ম্যানেজার হিসাবে কাজ করতে এসেছে। এখানকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে একটু এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং মূলধারার জনগণের সাথে কিভাবে যোগ করা যায় এটাই হলো তার মূল কাজ। এছাড়া উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য আরো কিছু এসাইনমেন্ট সাথে রয়েছে।
দু একদিন কাটতে না কাটতেই এই মফস্বলে হিড়িক পড়ে গেল সামিয়াকে দেখার জন্য। জিন্স ও টপস পরে কিভাবে একটি মেয়ে চলতে পারে তা এ তটের মানুষের জানা ছিল না। সামিয়া যেন একটা এলিয়েন হয়ে ধরা দিয়েছে সবার কাছে। বড়ই অস্বত্বি নিয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। দিন দিন রঙ্গিন স্বপ্ন গুলো ফিকে হয়ে আসছে।
অফিসে হতে কাজের জন্য যতটুকু বাইরে যাওয়া যায় তার বেশি এতটুকু সে বাইরে যেতে পারেনা। প্রয়োজনে বাইরে গেলে জুনিয়র কোন কলিগ নিয়ে যেতে হয়। এ এক বন্দি দশায় বসবাস। কোন বন্ধু নেই, বান্ধবহীন অফিস শেষে বদ্ধ কুঠিরে বন্দি জীবন। একাকীত্ব কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে যেন প্রতিদিন। তার চেয়ে বড় সমস্যা আবাসনের। শহরে মানুষ হওয়া একজন নারী কোন আধুনিক সুবিধা না থাকা এই মফস্বলে কাজ করতে এসে জীবনের সসব রঙ ফিকে হয়ে আসছে যেন।
স্থানীয় সবার ঘর আছে, বাড়ী আছে ভাই আছে, বোন আছে আরো রয়েছে কত আত্বীয় স্বজন। তারা তো দিব্যি কাটাচ্ছে তাদের জীবন। ওমা আমার কি রয়েছে! এভাবে হঠাৎ ই একাকীত্ব নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে সামিয়ার জীবন।
মন বিদ্রোহ করে ওঠে। ফিরে যেতে চায় আপন ভুবনে কিন্তু ফেরার উপায় নেই। ঘরে রয়েছে অসুস্থ্য মা, অবসরে থাকা বাবা, ছোট ভাই যার লেখাপড়া চলছিল ধুঁকে ধুঁকে। সামিয়ার চাকরীতে যেন সংসারের পালে একটু হাওয়া লেগেছে। সামিয়ার ফেরা মানে সংসারে ভাটা পড়া। অভাব নিত্য দিন জানালাই শুধু নয় দরজা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করা। এই ভেবে এই মফস্বলে মানিয়ে নেওয়ার এক চেস্টায় নিজের মনের অজান্তে এই তটের বাসিন্দাদের মত করে জিন্স ও টপস ছেড়ে অতি আধুনিক মেয়েটি কালো কাপড়ে মুড়িয়ে নেয় নিজেকে।
প্রয়োজন অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ কম থাকা কন্যাটি কিছুদিন বাদে হঠাৎ করে পরিচিত হয় শুভ নামক এক সরকারি কর্মকর্তার সাথে ল্যান্ডিং স্টেশনে। পরিচয়ের পর তার সাথে দু‘ একটি কথাবার্তায় প্রাণ খুঁজে পায়। ভাল লাগে অন্ততঃ দুটো মনের কথা বলার বন্ধু তো একজন জুটলো এই ভেবে। কয়েকদিনে বোঝা গেল শুভর সরকারি চাকরি চেস্টা তদবীরে কয়েকদিন বাদে হয়তো চলে যাবে পছন্দের কোথায় বদলী হয়ে। মনপুরার ব্যাপারটিই এমন। কোন কর্মকর্তা বেশী দিন থাকতে চায়না দু‘একজন বাদে। যাদের সুযোগ রয়েছে তারা দ্রæত চেস্টা তদবীর করে চলে যায়।
এছাড়া শুভ ধনী পরিবারের সন্তান, অভাব নেই। সে বিসিএস এর জন্য পুরা প্রস্তুতি নেওয়ার এক অপার সুযোগ নিতে এখানে এসেছে। দিনে অফিস শেষে চুটিয়ে লেখাপড়া নিয়ে সেরকম ব্যস্ত। এরকম ধরা বাধা রুটিনের মধ্যে একদিন ল্যান্ডিং স্টেশনে বেড়াতে গিয়ে বিকেলে তাদের পরিচয় এবং নিয়ম করে এখন তাদের বিকেল বেলা চলা।
সামিয়া ও শুভর মধ্যে একটু ভাল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেছে বলেই এখন সামিয়ার বোরিং জীবনটা কিছুটা ভাল লাগতে শুরু করেছে। বদ্ধ কুঠিরে আর বিকেলটা কাটাতে হয় না। প্রাকৃতিক পরিবেশে শ^াস নিতে পেরে স্বস্তিবোধ করে। তারচেয়েও মজা লাগে শুভর সাথে পড়ন্ত বিকেলে মেঘনার পাড়ে ঘুরে বেড়াতে। মাঝে মাঝে মন চায় শুভর হাত ধরে যদি একটু চাঁদনী রাত হেঁটে বেড়াতে পারত। না বাস্তবতায় তা আর হয়ে ওঠে না এমন ভাবনা নিয়ে সন্ধ্যার পূর্বেই ঘরে ফেরা তার।
এভাবেই চলছিল ওদের জীবন। বন্ধুত্বটুকু সমান্তরাল চলছে। কখনও কখনও সামিয়া একটু শুভর দিকে মানসিক ভাবে হেলে পড়লেও নারী তো প্রেমের কথা বলতে যত দ্বিধা। তাছাড়া সংসারের দায়িত্ব ও কতব্যের জালে বাঁধা তার জীবন। ঘরে অসুস্থ্য মা, অবসরে বসে থাকা বাবা, ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার চিন্তায় এক নিমিষে সে নিজের কথা ভাবতেই পারে না।
অন্যদিকে শুভর ভাবনা তার ক্যারিয়ার। উচ্চ অবস্থানে ওঠার বাসনার মাঝেও মাঝে মাঝে সামিয়াকে নিয়ে ভাবে বটে তবে বন্ধুত্বের বাইরেও কিছু একটা উঁকি মারে কিন্তু এগোতে পারে না যদি সামিয়া তাকে ভুল বোঝে। একটা বন্ধুত্বের মৃত্যু সে ঘটাতে চায় না। বিষয়টি এমন “ প্রেমে পড়া বারন কারণে অকারণ, আঙ্গুলে আঙ্গুল রাখলেও হাত ধরা বারন।”
এভাবে দু‘জন বুকে ধরে রাখা ভালবাসা কে মুখে প্রকাশ না করে এগোতে থাকে। ভালবাসা প্রেমে রুপ নেওয়ার পূর্বেই শুভ বিসিএস এর জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হয়। মহাখুশিতে চলতে থাকে ওদের চলাফেরা। বন্ধুত্বের বন্ধন যেন আরো গাঢ় হয় বটে কিন্তু প্রেম যেন না ফোঁটা ফুলের কুড়ি এই ফুঁটবে ফুঁটবে করে আর ফুঁটছেই না। মালি যেন অপেক্ষা করছে কখন ফুঁটবে ফুল! এভাবে কেটে গেল কয়েকটা মাস।
শুভর চাকরী হয়ে গেল। দূর শহরে তার যোগদান। মনপুরার পাঠ চুকিয়ে সে এখন দূর শহরের বাসিন্দা হবার অপেক্ষা মাত্র, কাল চলে যাবে। ল্যান্ডিং এ আজ দুজনে শেষ বসা বসেছে মুখোমুখি। শুভ চায় নাবলা কথা বলতে। সামিয়াও চায় আজ তোমায় ভালবাসি শুভ কথাটি বলতে কিন্তু নারী তো শেষ পর্যন্ত আর বলতে পারেনি। ওদিকে শুভ চেস্টা করছে বার বার ইনিয়ে ইনিয়ে বোঝাতে কিন্তু পারছে না। যদি ভাল বন্ধুত্বটুকু হারিয়ে যায়। শুধু বলল সামিয়া আপনি কি কাল আমার সাথে লঞ্চঘাট পর্যন্ত যাবেন? সামিয়া বলল হ্যাঁ।
সন্ধ্যায় ফিরে এল দু‘জন আপন ভুবনে। সামিয়া ভাবছে আমার জীবন আবার বদ্ধ খাঁচায় বন্দি। অসহ্য যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে রাতটা কাটল। নির্ঘুম রাতের সাক্ষী হয়ে রইল আকাশের তারা গুলো। চোখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। অন্যদিকে, শুভ ভাবছে একি হলো সামিয়াকে ছাড়া আমার জীবন তো অসহায়। দূর শহরে ওকে ছাড়া বাস করা আমার জন্য অসহ্য হয়ে যাবে। এ জীবন সামিয়াকে ছাড়া সত্যিই আজ অসর্ম্পূন লাগছে। কিভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি সেটা যেন অজানা মনে হচ্ছে।
পরদিন লঞ্চঘাট পর্যন্ত শুভর সাথে সামিয়া এক রিকসায়ই গেল বটে। দু‘জনের মধ্যে কোন কথা নেই। শুধু একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে আর বুকভরা দীর্ঘশ^াস নিয়ে এগোচ্ছে। লঞ্চঘাটের পথও শেষ। আজ যেন অতিদ্রæত দুস্ট ফারহান-১ লঞ্চ ঘাটে এসেছে নির্দ্ধারিত সময়ের পূর্বেই। বিদায় জানন হলো। লঞ্চে ওঠার মুর্হুত্বে হঠাৎই শুভ সামিয়ার হাতটি ধরে বলল “ সামিয়া মেরী মি!”










